kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরে কী পেল ভারত

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরে কী পেল ভারত

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৩৬ ঘণ্টার ভারত সফর সফল, না ব্যর্থ? এ প্রশ্নে সারা বিশ্বের মিডিয়া অতিথি ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির মধ্যে ৭২ বার কোলাকুলি হয়েছে। নিট ফল কী হয়েছে? নিট ফল হয়েছে, ট্রাম্প ভারত থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকার সওদা করে নিয়েছেন এবং তিনি যেসব দ্রব্য ভারতে বিক্রি করবেন, তা সবই সামরিক মারণাস্ত্র। এই মারণাস্ত্রের মধ্যে আছে, ২৪টি এমএইচ ৬০ ‘রোমিও’ মাল্টি রোল হেলিকপ্টার, সেনাবাহিনীর জন্য ছয়টি এএইচ ৬৪ই অ্যাপাচে অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং ইন্ডিয়ান অয়েল ও মার্কিন সংস্থা এক্সন মোবিলের মধ্যে ভারতের শহরে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির চুক্তি। তাঁর আসার তিন দিন আগে ওয়াশিংটন থেকে জানানো হয়েছিল, সিএএ, এনআরসি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ নয়াদিল্লিকে জানাবেন, জনসভায়ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা নিয়ে কথা বলবেন। উল্টা দেখা গেল, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে মোদির ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, সিএএ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে কোনো আলোচনাই হয়নি।

মোদির রাজ্য গুজরাটে তিনি এক জনসভা করেছেন। সেখানে ট্রাম্প বলেছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি নিয়ে মোদি অসাধারণ কাজ করছেন। তিনি এ ব্যাপারে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেন। অন্য অনেক জায়গা থেকে ভারতের পরিস্থিতি এ ব্যাপারে ভালো। কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার নিয়েও তিনি মোদির সঙ্গে কথা বলবেন বলে ওয়াশিংটন থেকে জানিয়েছিলেন। কার্যত তা করেননি। কিন্তু তিনি ফিরতি বিমানে উঠার আগে সাউথ ব্লক থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রচার করা হয়। এই বিবৃতি দেখে ভারতের কূটনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, ট্রাম্পের সফরে উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি বলতে প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে কয়েকটি চুক্তি, সেটিও ৩৫৩ কোটি ডলারের বিনিময়ে কিনতে হয়েছে ভারতকে, বড়মাপের বাণিজ্যচুক্তি করার আশ্বাস ট্রাম্প দিলেও তা নিয়ে কোনো সময়সীমা নেই। বাকি পুরোটাই বন্ধুত্বের ছবি তুলে ধরা হয়েছে সাউথ ব্লকের তরফে। এ বছরেই আমেরিকায় নির্বাচন। মোদির তৈরি করা মঞ্চ থেকে ট্রাম্প ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন ভোটারদের মন জয়ের জন্য প্রচার চালিয়েছেন। এমনই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আহমেদাবাদে মোদি যেভাবে ভিড় জড়ো করেছেন, তা নিয়ে হায়দরাবাদ হাউসে এবং সাংবাদিক বৈঠকে বারবার প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। একাধিকবার বলেছেন, ‘ভারতের জনসংখ্যা বেশি। কিন্তু আমি শুনলাম, যে ভিড় হয়েছে তা এর আগে কোনো রাষ্ট্রনেতার জন্য হয়নি।’ মোদিও তাঁর বক্তৃতায় ট্রাম্পের সফরকে ঐতিহাসিক দাবি করে বলেন, ‘গত আট মাসে আমি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পাঁচবার বৈঠক করলাম। মোতেরা স্টেডিয়ামে ট্রাম্পের জন্য অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক স্বাগতসভা চিরকাল মানুষ মনে রাখবে।’

সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, কাজের কাজ বিশেষ কিছু হয়নি, বরং দেখাদারিই বেশি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরকে বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যম এভাবেই দেখেছে।

সিএএ ঘিরে গোষ্ঠী সংঘর্ষে দিল্লিতে নিহতের সংখ্যা ১৩ হয়ে গেলেও ট্রাম্প ওই আইন নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। কিছুটা সমালোচনার সুরেই ট্রাম্পের সফরের শেষ দিনের প্রতিবেদন করেছে ওয়াশিংটন পোস্টের অনলাইন সংস্করণ। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, কাজে নয়, বরং দুই নেতার দেখাদারিতেই তাঁদের বন্ধুত্বের প্রতিফলন ঘটেছে। দিল্লির ভয়ংকর পরিস্থিতি সত্ত্বেও মোদিকে অস্বস্তিতে ফেলার মতো প্রায় কিছুই বলেননি ট্রাম্প।

মোতেরা স্টেডিয়ামে ট্রাম্পকে ঘিরে উচ্ছ্বাস ও অকুণ্ঠ প্রশংসার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। আবার দ্য টাইমসের মতে, মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে, ‘নমস্তে ট্রাম্প’-এর অনুষ্ঠানে তা বোঝা যাচ্ছে। অনুষ্ঠানে পরস্পরকে স্তুতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছে তারাও। ট্রাম্প শচীনসহ যেসব ভারতীয়র নামের ভুল উচ্চারণ করেছেন, সে কথা প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান, আবার ব্লুমবার্গের বক্তব্য চীনকে মোকবেলা করতেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে দৃঢ় করছে আমেরিকা। ওয়াশিংটন পোস্টের মত তেমনই।

পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলো অবশ্য গুরুত্ব দিয়েছে তাদের দেশ সম্পর্কে ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে। মোতেরা স্টেডিয়ামে ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ভালো। ভারতে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই মন্তব্যকেই বিরাটভাবে তুলে ধরেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো। পাকিস্তানি চ্যানেল ২৪ নিউজ বলেছে, ট্রাম্প যা বলেছেন, ভারতীয়রা তা হজম করতে পারেনি।

ট্রাম্পের ভারত সফরকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ৩৬ ঘণ্টার সফরে ট্রাম্প আগামী নভেম্বর মাসে তাঁর দেশের নির্বাচনকে হাতিয়ার করে নিয়েছিলেন। ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বোয়িং, লকহিড সংস্থার সম্পদ বাড়াতে ভারতে ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি না করে ট্রাম্প সরকারের উচিত জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলায় ভারতের শরিক হওয়া।’

লন্ডন টাইমস বলেছে, ট্রাম্পের ভারত সফর নিজের আত্মপ্রচারের জন্য। দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা লিখেছে, 'NEROS DINE',  ট্রাম্প যখন দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে ওয়াইনে চুমুক দিচ্ছিলেন তখন উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলছিল। ট্রাম্পকে এ ব্যাপারে পরদিন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি একটু গম্ভীর হয়ে উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ, আমি শুনেছি।’ দ্য টেলিগ্রাফ লিখেছে, ‘...AS GUJRAT MODEL REACHES DELHI.’ টেলিগ্রাফের বক্তব্য, গুজরাটে ২০০২ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মোদি ছিলেন তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর আমেরিকার একাধিক প্রেসিডেন্ট ছলেবলে-কৌশলে ভারতকে খপ্পরে ফেলার চেষ্টার ত্রুটি করেননি। প্রথমে ভারতে সফরে আসেন ১৯৫৯ সালে DWIGHT D EISENHOWER.. তিনি জওয়াহেরলাল নেহরুকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ভারত যদি সোভিয়েতের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছেড়ে দেয় এবং নির্জোট আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে আমেরিকা ভারতের পুনর্নির্মাণে প্রচুর সাহায্য করবে। নেহরু আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, ভারত বিশ্বের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্জোট আন্দোলন গড়ে তুলেছে। তার থেকে সরে আসার প্রশ্নই নেই। আপনাকে ধন্যবাদ। ১০ বছর পর আসেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন, তখন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। নিক্সন ইন্দিরাকে একই কথা বলেছিলেন, আপনারা নির্জোট আন্দোলন ছেড়ে আমেরিকার পক্ষে আসুন। ইন্দিরা তাঁকে ভদ্রভাবে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। এই নিক্সন দুই বছর পর পাকিস্তান-বাংলাদেশ যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নেন এবং ভারতের বিরোধিতা করেন। আর ৯ বছর পর আসেন জিমি কার্টার অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে। তখন জনতা দলের নেতা মোরারজি দেশাই। তিনি পরমাণু চুক্তিতে সই করার জন্য মোরারজিকে অনুরোধ করলে গান্ধীবাদী নেতা মোরারজি দেশাই কার্টারকেও ওয়াশিংটনে পাঠিয়ে দেন। বাংলাদেশ যুদ্ধের পর থেকে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল। আর ২০০০ সালে বিল ক্লিনটন অর্থাৎ ২২ বছর পর যখন ভারতে আসেন তখন প্রধানমন্ত্রী বিজেপির অটল বিহারি বাজপেয়ি। বিল ক্লিনটন ভারতে আসার আগে পাকিস্তানের কার্গিল যুদ্ধের সময় নওয়াজ শরিফকে বলে পাকিস্তানি সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। ক্লিনটন এ দেশে এসে হরিয়ানার একটি গ্রামে গিয়ে সেখানকার স্কুলছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে নেচেছিলেন—একটুও বাড়াবাড়ি করেননি। ২০০৫ সালে ড. মনমোহন সিং হোয়াইট হাউসে গেলে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা জানানো হয়। ড. সিংয়ের আমন্ত্রণে ২০০৬ সালে বুশ জুনিয়র দিল্লি সফরে আসেন, সেই সময় দুই নেতার মধ্যে বেসামরিক পরমাণু চুক্তি নিয়ে কথাবার্তার সূত্রপাত। আর ২০১০ সালে বারাক ওবামা মনমোহন সিংয়ের আমন্ত্রণে দিল্লি এসেছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ভারতকে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে রাখার জন্য চেষ্টা করবেন।

কিন্তু এবারের মতো উচ্ছৃঙ্খল সফর দেখেনি ভারত, আমেরিকা তথা বিশ্ব।

আর এবার ট্রাম্পের সফরকে কেন্দ্র করে ভারত ও আমেরিকা উভয় দেশের জনগণের মধ্যে এমন একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। ট্রাম্পের সফর নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, লক্ষ্য অথবা পথ কোনটিকে জ্ঞান করা শ্রেয়? চিন্তাশীল ব্যক্তির কাছে এটি একটি বড় প্রশ্ন বটে; কিন্তু আশু প্রয়োজন মেটাতে উদ্গ্রীব যে মানুষ তার কাছে এ প্রশ্ন অকিঞ্চিৎকর। প্রয়োজন এমনই বড় দায় যে তার চাপে অনেকে অতিষ্ঠ। সে ক্ষেত্রে ভারতের মতো অর্থনৈতিক দিক থেকে অতি দুর্বল একটি দেশে ধূর্ত ট্রাম্প ৩০০ কোটি ডলারের ব্যবসা করে গেলেন আর মোদি সেই ব্যাবসায়িক প্রস্তাব আনন্দের সঙ্গে মেনে নিলেন।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা