kalerkantho

বুধবার । ১২ কার্তিক ১৪২৭। ২৮ অক্টোবর ২০২০। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দেশের নামি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কী ঘটছে?

সারওয়ার-উল-ইসলাম

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দেশের নামি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কী ঘটছে?

র‌্যাগিংয়ের অপরাধে ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

১৫ ফেব্রুয়ারি একটি শীর্ষ দৈনিকের খবর ছিল এটি।

র‌্যাগিং নিয়ে গত বছরের ভয়াবহ খবরটি ছিল বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যা। দেশ তোলপাড় করার মতো খবর ছিল সেটি। র‌্যাগিং চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। বিভিন্ন সময় তার ছিটেফোঁটা খবর পত্রিকায় এলেও আবরার হত্যার সেই ভিডিওটি যারাই দেখেছেন তাঁদের বিবেক নড়েচড়ে বসেছিল—এও সম্ভব বাংলাদেশে? এমনটাই সব বিবেকবান মানুষের প্রশ্ন ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনের টনক নড়েছিল ওই ঘটনার পর। সবাই বেশ সচেতন হয়েছিল। কিন্তু তারপর? তারপর সেই আগের মতোই। গোপনে চলছে সেই র‌্যাগিং প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোনোটির খবর পত্রিকায় আসছে, কোনোটির বা আসছেই না। কিন্তু অভিভাবকরাও ভয়ে সংবাদকর্মীদের কাছে সেটা প্রকাশ করছেন না। কারণ অনেক কষ্টে ভর্তি করিয়েছে সন্তানকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সন্তান মেধাবী। নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তো আর মুখের কথা না! তাই ভয়ে টেনশনে দিনযাপন করছেন অনেক মা-বাবাই।

আমাদের দেশে এটা নতুন কিছু না। যখন কোনো মৃত্যুর ঘটনা আমাদের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টির করে তখন সরকারসহ সংশ্লিষ্ট মহল একেবারে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ব্যাপক কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। কয়দিন বাদে আবার আগের অবস্থা।

যেমনটা হচ্ছে র‌্যাগিংয়ের ব্যাপারেও।

নানাভাবে অসমর্থিত সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছে দেশের অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো চলছে র‌্যাগিং। বিশেষ করে সম্প্রতি যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের ডেকে নিয়ে গিয়ে এক বছরের সিনিয়র ভাইয়েরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হলে দাঁড় করিয়ে রাখছেন। প্যান্ট খুলে আন্ডারওয়্যার পরিয়ে রাখছেন। মারধর করছেন। ক্রিকেট ব্যাটে তেল মেখে পেটাচ্ছেন। ভয় দেখাচ্ছেন নানাভাবে অশ্লীল ইঙ্গিত করে।

ফেসবুকের ইনবক্সে তেমন কিছু ঘটনা পাঠিয়েছেন জনৈক অভিভাবক। তাঁর ছেলেকে দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে নিয়ে গেছেন। অত্যন্ত মেধাবী তাঁর ছেলে। অবশেষে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন দিনাজপুরের হাজী দানেশ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেকানিক্যাল বিভাগে। কিন্তু প্রথম ক্লাসের দিন এক ব্যাচ সিনিয়র ভাইয়েরা ডেকে নিয়ে গেছেন তাঁদের ১৫-১৬ জনকে। তাঁরা থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিভিন্ন ম্যাচে। রাতভর অমানুষিক র‌্যাগিং করানো হয়েছে তাঁদের ওপর। এরপর থেকে প্রতিদিনই চলছে।

ঢাকা থেকে ভিসিকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। ভিসি প্রগতিশীল শিক্ষকদের প্রধানকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে র‌্যাগিংয়ের বিষয়টি স্বীকার করতে বলেছেন। কিন্তু মেকানিক্যালের ১৯ ব্যাচের কেউ স্বীকার করেননি। এর পরও কমেনি তাঁদের উৎপাত।

আবার ভিসিকে জানানো হলেও কোনো প্রকার ব্যত্যয় ঘটেনি ধারাবাহিক ঘটনার। যথারীতি ঘটে চলেছে র‌্যাগিং।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন—একজন ভিসির কী করা উচিত এমন অবস্থায়? তিনি কি পারেন না মেকানিক্যালের ১৯ ব্যাচের প্রত্যেক ছাত্রকে ডেকে নিয়ে সত্যি কথাটা বের করতে। যদি কেউ বলতে অস্বীকার করেন সে ব্যাপারে তাঁর ক্ষমতায় অনেক রকম শাস্তির ব্যবস্থা তো করতে পারেন।

নাকি আমাদের ভিসিদের অবস্থা একই রকম? মেরুদণ্ড বাসায় রেখে চাকরি করেন তাঁরা? যখন কোনো মায়ের বুক খালি হয় তখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বড় সিদ্ধান্ত নিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

হাজী দানেশ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একটি উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বাইরে থেকে অনেক ছাত্র এখানে এসে পড়াশোনা করেন। যদি র‌্যাগিংয়ের কারণে আবারও আবরার হত্যার মতো কোনো ঘটনা ঘটে, তখন এর দায়-দায়িত্ব কার ওপর বর্তাবে? তখন ভিসির অপসারণের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করবে। দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠবে। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি চলবে। অনেক আবেগ মাখানো কথা শিক্ষামন্ত্রীসহ অনেক সরকারদলীয় নেতা বলবেন। এই তো। তারপর কিছুদিন যাবে। সবাই ভুলে যাবে একসময়।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, আপনি এখনই এই হাজী দানেশ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখেন। ঘটনা কোন দিকে গড়াচ্ছে। ভিসিসহ অনেকেই বলেছেন র‌্যাগিংয়ের জন্য তাঁরা নানা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁরাও স্বীকার করেছেন বিচ্ছিন্নভাবে এগুলো ঘটছে। কিন্তু কেউ তাঁদের নির্দিষ্টভাবে কোনো ছাত্রের কথা বলছেন না বলে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। ভিসি সাহেব বলেছেন প্রক্টরের কাছেও যদি কোনো শিক্ষার্থী বা একাধিক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লিখে একটি অভিযোগপত্র গোপনে দিয়ে আসে তাহলে তাঁরা ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, আমাদের মেধাবী ছাত্ররাও জানেন এবং বোঝেন এই অভিযোগ দেওয়ার পরের ঘটনা কত ভয়াবহ হতে পারে। তাই তাঁরা এই কাজটি না করেই সহ্য করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। কারণ তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সিনিয়র শিক্ষার্থী বোঝাচ্ছেন মাত্র ছয়-সাত মাস এভাবে সহ্য করে যাও। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। নিজেদের আধিপত্য বোঝানোর জন্য নতুনদের ডেকে একটু-আধটু শায়েস্তা করেন।

একজন ভিসি কতটা অসহায়, সেটা দেখার সুযোগ হয়েছে অনেক অভিভাবকের। ভিসিকে জানানোর পরও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। দিনাজপুর হাজী দানেশ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয়, খোঁজ নিয়ে দেখুন দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে এই র‌্যাগিংয়ের ভয়াবহতা। কেউ মুখ ফুটে বলছে না। কারণ তারা জানে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বলি আর কর্তৃপক্ষই বলি, সবই মেরুদণ্ডহীনদের হাতে চলে গেছে। সরকারের তল্পিবাহক ছাড়া আর কিছু না। সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতাদের ভয়ে কোনো কথা বলার সাহস পান না তাঁরা। সাধারণ ছাত্রদের ন্যায্য অধিকারের কথাও এঁরা মুখ ফুটে বলতে সাহস পান না।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, অতিসত্বর হাজী দানেশ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই র‌্যাগিংয়ের ঘটনার তদন্ত করে দেখুন। ঘটনা কতটা ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। যেখানে একজন ভিসি নিরুপায়। তাঁর কিছু করার ক্ষমতা নেই।

আর একজন অভিভাবক ঢাকায় বসে প্রতি মুহূর্তে সন্তানের কথা চিন্তা করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আমরা চাই আর একজনও আবরারের মতো ঘটনার শিকার না হোক। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন মেকানিক্যালের ১৯ ব্যাচের (গত বছর ভর্তি হওয়া) কারা এবারের ভর্তি হওয়াদের ওপর টর্চার করছে অকথ্যভাবে। সেটা সভ্য সমাজে গর্হিত ঘটনা। একটু খোঁজ করলেই জানতে পারবেন নতুনদের ওপর কিভাবে তাঁরা নির্যাতন চালাচ্ছেন সন্ধ্যার পর ডেকে নিয়ে গিয়ে।

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এ রকম ঘটনা তো আইয়ামে জাহেলিয়াতের কথাই মনে করিয়ে দেয় আমাদের।

লেখক : সাংবাদিক, ছাড়াকার

মন্তব্য