kalerkantho

বুধবার । ২৫ চৈত্র ১৪২৬। ৮ এপ্রিল ২০২০। ১৩ শাবান ১৪৪১

শিক্ষাব্যবস্থায় যেমন পরিবর্তন দরকার

মাছুম বিল্লাহ

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিক্ষাব্যবস্থায় যেমন পরিবর্তন দরকার

প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসছে। বিভিন্ন দেশে শিক্ষাক্রম পরিমার্জন ও বাস্তবায়ন সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছর পর পর করা হয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে সেটি করা হচ্ছিল অনেক বিলম্বে, তবে এবার যেন করা হচ্ছে একটু বেশি আগে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি ১৯৮১ সালে প্রথম বাস্তবায়ন শুরু হয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এর ১৫ বছর পর দ্বিতীয়বার বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। তৃতীয় আবর্তনের শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয় ২০১১-২০১২ সালে, যা বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০১৩ সালে। দ্বিতীয়টি থেকে তৃতীয়টির মধ্যে সময়ের পার্থক্য ছিল ১৭ বছর। কিন্তু এবার যেটি করা হচ্ছে, তা সাত-আট বছর পর।

শিক্ষাব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আসছে তাতে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, না অন্য কোনো শাখায় পড়বে, তা ঠিক হবে একাদশ শ্রেণিতে। এর আগে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সবাইকে অভিন্ন ১০টি বিষয় পড়তে হবে। বইয়ের সংখ্যাও এখনকার চেয়ে কমবে। বিষয়বস্তু বদলাবে। আর এসএসসি পরীক্ষা হবে শুধু দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষা হবে, যার ভিত্তিতে এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হবে। একাদশে দুটি পরীক্ষা হবে—এটি একটি ভালো প্রস্তাব বলে মনে হচ্ছে। কারণ প্রথম বর্ষে ঐচ্ছিক সব বিষয়ের প্রথম পত্র পড়ানো হয়, সেগুলোর ওপরে পরীক্ষা নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা সেগুলো ভালোভাবে পড়বে। দ্বিতীয় বছরে দ্বিতীয় পত্র পড়ানো হবে, সেগুলোর ওপর আলাদা পরীক্ষা হবে।

পৃথিবীর অনেক দেশে স্কুল পর্যায়ে পাঠ্যসূচিতে প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলা, বিরূপ পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে বাস্তব জ্ঞান অর্জনে বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়, পাঠ্যসূচির ব্যাবহারিক অংশে সেগুলো সমাধানের উপায় সংযোজিত হতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত ঘটছে। এটি শুধু যে চালকের অদক্ষতা ও যানবাহনের ত্রুটির কারণেই সংঘটিত হচ্ছে তা নয়, পথচারীদের অসাবধানতা ও আইন না মানাও এর একটি বড় কারণ। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুকে রাস্তায় চলাচল ও পারাপার, ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার পদ্ধতি রাস্তায় নিয়ে সরেজমিনে শেখানোর বিষয়টি প্রাথমিক ও জুনিয়র স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ইদানীং বজ্রপাতে মৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে বেড়ে চলেছে। গ্রাম-শহর সব জায়গায়ই বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে আসছে। বৃষ্টির দিনে বৈরী আবহাওয়ায় একটু সতর্কতা অবলম্বন করলে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে সারা দেশে ব্যাপক হারে মানুষ মারা যাচ্ছে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির নিরাপদ ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করা যেতে পারে পাঠ্যসূচির মাধ্যমে।

পাঠ্যসূচি প্রণয়ন ও পরীক্ষাপদ্ধতি সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অবশ্যই দেশের কনটেক্সটকে, প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ আমাদের ছেলে-মেয়েরা কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, সেটি একটি বিবেচ্য বিষয়। তা না হলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। দেশীয় ও বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। সেই পরিবর্তনের কাজটি গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে হওয়ার কথা। মালয়েশিয়া তাদের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কিউএস র্যাংকিংয়ে ৩০০-এর মধ্যে আনতে পেরেছে, যেখানে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চার কাজটি কতটুকু করতে পেরেছে, সেটি ভাবার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা আসে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পার হয়ে। এগুলোর সঙ্গে শিক্ষাক্রমের একটি সামঞ্জস্য থাকা উচিত।

আমরা যদি ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাই গড় পাসের হার ৮৪.৬৮ শতাংশ। এটি দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফসল। কেননা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশই তরুণ। তাদের যদি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়, দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা না যায়, তাহলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে যে উন্নত দেশে পরিণত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী গতবার বলেছিলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ এ শিক্ষাব্যবস্থা টেকনোলজি বেইসড নয়। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, আমরা যে ডিজিটাল বিপ্লব বা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা ভাবছি, সেটি বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পঠন ও পাঠনে পরিবর্তন আনতে হবে, টেকনোলজির সংযোগ ঘটাতে হবে। আমাদের দেশে যেমন শিক্ষিত বেকার আছে, তেমনি আবার দক্ষ জনবলেরও অভাব রয়েছে। কাজেই শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, প্রযুক্তিভিত্তিক করতে হবে, যাতে বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়। আবার শুধু প্রযুক্তিনির্ভর করলেই হবে না, শিক্ষিতদের মানবিক হতে হবে, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগাতে হবে। কাজেই কারিকুলাম তৈরি করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। এটি হুট করে বা কয়েকজন মিলে তৈরি করলেই হবে না। এখানে সব স্টকহোল্ডারের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা, পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদির মাধ্যমে করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে ফরমাল, ইনফরমাল ও নন-ফরমাল—এই তিন ধরনের শিক্ষাই শিক্ষা হিসেবে স্বীকৃত। শুধু বিদ্যালয়ে যাতায়াত করলে ও পড়লে পুরো বা আদর্শ শিক্ষা অর্জিত হয় না। মানুষ বিভিন্নভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। শিক্ষা ও দক্ষতা একটি অপরটির পরিপূরক। একটি ছাড়া অন্যটি পঙ্গু। ‘লার্নিং বাই ডুয়িং’ পদ্ধতির প্রবর্তন এ ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনবে বলে আমাদের বিশ্বাস। 

বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফর অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। পাঠ্যসূচি মোতাবেক আহরিত তত্ত্বীয় জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর জন্য সাধারণত ওই সব সফরের আয়োজন করা হয়। এতে তারা যা দেখল, বুঝল, শিখল ইত্যাদির ওপর কখনো এককভাবে, কখনো আবার গ্রুপ ভিত্তিতে সার্বিক মতামত, পর্যবেক্ষণসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়, উপস্থাপন করতে বলা হয়। এটি একটি বাস্তবধর্মী শিক্ষা। নতুন কারিকুলামে এ ধরনের বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে সংযোজন করা উচিত। খেলার ছলে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা গেলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও কর্মে মনোযোগী হবে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সব কাজ ও শিক্ষাকে উপভোগ্য হিসেবে গ্রহণ করবে।

 

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেল্টা) এবং সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা