kalerkantho

বুধবার । ২৫ চৈত্র ১৪২৬। ৮ এপ্রিল ২০২০। ১৩ শাবান ১৪৪১

ইসহাক খান

চেতনার বাতিঘর

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চেতনার বাতিঘর

ইতিহাসের অমোঘ অধ্যায় রচিত হয়েছে বাঙালির হাত ধরে। পৃথিবীর একমাত্র জাতি বাঙালি, যারা ভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছে। পাশাপাশি এ কথাও উল্লেখ করা দরকার যে ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে একটি জাতি স্বাধিকার আন্দোলনের পথে এগিয়ে গেছে এবং স্বাধীনতা লাভ করেছে। এমন অনন্য ইতিহাস শুধু বাঙালি জাতি সৃষ্টি করেছে।

পৃথিবীর অনেক সমৃদ্ধ জাতি আছে কিন্তু তাদের ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র নেই। আমরা যদি ভারত উপমহাদেশের দিকে তাকাই, সেখানে অনেক সমৃদ্ধ ভাষা এবং সমৃদ্ধ জাতি দেখতে পাই। কিন্তু তাদের নিজস্ব আবাসভূমি বা স্বাধীন দেশ নেই। একমাত্র বাঙালি জাতির নিজস্ব ভাষা এবং নিজস্ব স্বাধীন দেশ আছে। সেদিক থেকে বাঙালি অনন্য জাতি।

২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য আজ বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত। এটাও বাঙালির অনন্য কীর্তি।

এই অনন্য কৃতিত্ব অর্জনে বাঙালিরা যেমন অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছে, রাজপথে বুকের রক্ত দিয়েছে, ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে; তেমনি তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন, পীড়ন, নির্যাতনও এই অমোঘ ইতিহাস গড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তানে আমরা বাঙালিরা ছিলাম সংখ্যাগুরু। সেই সংখ্যাগুরুর দাবি উপেক্ষা করে শাসকগোষ্ঠী প্রথম আঘাত হানে আমাদের ভাষার ওপর। সমগ্র পাকিস্তানের মাত্র ১২ শতাংশ মানুষের ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়া হয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। আর তাতেই ফুঁসে ওঠে বাঙালিরা। শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন। এই আন্দোলন স্তব্ধ করতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী চেষ্টার কমতি করেনি। সব ধরনের নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েও তারা বাঙালিকে অবদমিত করতে না পেরে অবশেষে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক পার্লামেন্ট অধিবেশন অভিমুখে ভাষা আন্দোলন পরিষদের মিছিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সারা ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় [বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেট] ছাত্র-জনতা সমবেত হয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। প্রথম দিকে নেতৃস্থানীয়রা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু সাধারণ ছাত্র-জনতার দৃঢ়চাপে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য হন। সবাই এই মর্মে একমত পোষণ করেন যে ১০ জনের একেকটি ছোট দল মিছিল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। প্রথম যে দলটি মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় সেই দলটি ছিল মহিলাদের। আমাদের মহিলারাই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রথম সাহসী আলোকবর্তিকা। অনতিদূরে পাকিস্তানি পুলিশ রাইফেল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর আরো ১০ জনের দল। এভাবে একের পর এক ছোট ছোট দলের মিছিল এগিয়ে যেতে থাকলে পাকিস্তানি পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে। পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলে মারা যান রফিক, শফিক, বরকত, সালামসহ আরো অনেক নাম না জানা আমাদের বীর বাঙালি। এর মধ্যে অজিউল্লাহ নামের এক কিশোর শহীদ হয়। কিন্তু কোথাও এই অজিউল্লার কথা উল্লেখ নেই। সম্প্রতি একটি গবেষণায় এই অজিউল্লাহর কথা উঠে এসেছে। বশীর আলহেলালের ‘ভাষা আন্দোলন ইতিহাস’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

পুলিশের গুলিতে ছাত্র-জনতা শহীদ হওয়ার পর জনতা বাঁধভাঙা পানির মতো রাস্তায় নেমে আসে। মুহূর্তে ঢাকা শহর মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়।

বাধ্য হয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষা উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে দ্বৈত ভাষার মর্যাদা দেয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ববাংলার জনগণের তীব্র আস্থার সংকট তৈরি হয়। এই আস্থার সংকট ক্রমে ক্রমে প্রকট আকার ধারণ করে। বাঙালি এগিয়ে যেতে থাকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিব স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করলে বাঙালি এই দাবিকে তাদের মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করে। এই ছয় দফাকে কেন্দ্র করে বাঙালি আন্দোলন ধীরে ধীরে তুঙ্গে নিয়ে যেতে থাকে। ১৯৬৯ সালে দিশাহারা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবসহ ২০-২৫ জন বাঙালিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার করে সেনানিবাসে গোপনে বিচার করতে থাকে। এ সময় ছাত্ররা ছয় দফার সঙ্গে ১১ দফা ঘোষণা করে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ পুলিশের গুলিতে নিহত হলে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। সেই সময়কার পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা দিয়ে আইয়ুব বিদায় নিতেও বাধ্য হন।

ইয়াহিয়া খান সমগ্র পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা দেন। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তাস্তর করতে ইয়াহিয়া খান গড়িমসি শুরু করেন। একসময় ইয়াহিয়া খান সংসদ অধিবেশন স্থগিত করেন। তখন বাঙালিরা এক দফার আন্দোলন শুরু করে। সবার মুখে তখন একটি মাত্র স্লোগান ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’

৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই থেকে বাঙালি যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আসেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করতে। আলোচনা ব্যর্থ হলে ইয়াহিয়া বাঙালি নিধনের হুকুম দিয়ে পাকিস্তান চলে যান। ২৫ মার্চ রাতে শুরু হয় গণহত্যা। নির্বিচারে বাঙালি হত্যা করতে থাকে পাকিস্তানি মিলিটারি। ২৫ মার্চ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁকে পাকিস্তানি আর্মি গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের লায়ালপুর কারাগারে বন্দি করে রাখে।

তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকার গঠিত হলে বাঙালির প্রতিরোধযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অভ্যুদয় হয় পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের।

ভাষা আন্দোলনের রোপিত বীজটি ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়ে একসময় বটবৃক্ষে পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে বাঙালি পায় স্বাধীন মাতৃভূমি।

কিন্তু যে ভাষার জন্য বাঙালি প্রাণ দিল, যে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ হলো এবং স্বাধীন বাংলাদেশ হলো—সেই স্বাধীন দেশে ভাষা ক্রমেই উপেক্ষিত হতে শুরু করল। আজও সম্পূর্ণভাবে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না। রাস্তাঘাটে বা শপিং মলের সাইনবোর্ডের ভাষা বাংলা নয়, বিদেশি ভাষা। আমাদের আদালতগুলোতে এখনো পরিপূর্ণ বাংলা ভাষা ব্যবহার হচ্ছে না। বিশেষ করে আদালতের রায় বাংলায় লেখা হয় না। যে বিদেশি ভাষায় রায় লেখা হয় সেই ভাষা এই স্বাধীন দেশের বেশির ভাগ মানুষ বুঝতে অক্ষম। তাতে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। এক শ্রেণির টাউট আইনজীবী তাঁর অশিক্ষিত মক্কেলের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আমরা এই অব্যবস্থার অবসান চাই। আমরা বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবি জানাই। আইনের ভাষা জটিল এবং অনুবাদ করা কঠিন—এই খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে যাঁরা আদালতের রায় ইংরেজিতে লিখে থাকেন, তাঁদের এই খোঁড়া যুক্তির আমরা তীব্র নিন্দা জানাই এবং অবিলম্বে আদালতসহ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সব কাজে বাংলা ভাষা চালু করার জোর দাবি এবং বাস্তবায়নের আহ্বান জানাই।                             

লেখক :  মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার   

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা