kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

প্রেক্ষিত একুশ ও আমাদের স্বপ্ন

বাপ্পু সিদ্দিকী

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রেক্ষিত একুশ ও আমাদের স্বপ্ন

মানুষের স্বপ্ন কখনো নিভে যায় না বলেই স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। আমরা স্বপ্ন দেখি অনেক রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি একদিন সগৌরবে উঠে দাঁড়াবে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে স্বপ্ন আমাদের দেশের তরুণসমাজ একদিন দেখেছিল; সেই স্বপ্নই একাত্তরে স্বাধীনতাসংগ্রাম-পরবর্তী তরুণ প্রজন্মকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পথ দেখিয়েছে। বায়ান্নর একুশ সেদিনের রাজনীতির ধারাকে বদলে দিয়েছিল বলেই একে একে উন্মেষ ঘটে শাসনতন্ত্র আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভাবনীয় বিজয় এবং সর্বশেষ নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সঞ্জীবিত একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মহাপ্লাবন। তাই বায়ান্নর এই দিন বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস উন্মোচনের দিনও বটে। এই দিনে আত্মদান শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আজ এই দিবসটি অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিশ্বের প্রতিটি জনগোষ্ঠী তাদের মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশে এই দিবসটিকে তাদের রাজনৈতিক অধিকারের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বলে মনে করে। আমাদের দেশেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির নিজস্ব স্বকীয়তা প্রকাশে দিবসটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আজ বিশ্বচরাচরে বাংলা ভাষার যে গৌরব ও সম্মান উদ্ভাসিত হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। এই ইতিহাসই আমাদের স্বপ্ন দেখায় সাফল্যের সুবর্ণদ্বারে পৌঁছে যেতে। আমাদের দুর্ভাগ্য, স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও আমাদের দেশের একটা অংশ পাকিস্তানি ভাবধারা লালন-পালন করছে। তারা একুশের চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদকে নীরবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তারা চায় দেশকে আবার অন্ধকার যুগে নিয়ে যেতে। বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তা তাদের পছন্দ নয়। দ্য স্পেক্টেটর ইনডেক্সে প্রকাশিত বিশ্বের ২৬টি শীর্ষ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায় বাংলাদেশ জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন অর্জন করেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। আমরা স্বপ্ন দেখি ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বড় ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ যে ৪১তম স্থানে অবস্থান করছে সেখান থেকে ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে। ২০৩৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড আমাদের পেছনে থাকবে। আমাদের দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগামী ১৫ বছরে প্রবৃদ্ধি গড়ে ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। সর্বত্রই আমরা বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করছি। এই বাংলাদেশ ক্রমপরিবর্তনশীল অন্য এক বাংলাদেশ। দেশের মানুষ উন্নত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে এবং উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে।

একুশের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সুকৌশলে বিনষ্ট করে এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী জাতির জনককে হত্যার পর দীর্ঘদিন দাপটের সঙ্গেই দেশের পবিত্র ভূমি কলঙ্কিত করে আসছিল। তারা চেয়েছিল এ দেশকে একটি সাম্প্রদায়িক জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করে এ দেশ থেকে একুশের চেতনাকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে। প্রতিদিন নানা বাধা-বিপত্তি, যড়যন্ত্র আর চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে জাতিকে আবার নবোদ্যমে জাগিয়ে একুশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা তথা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার সুকঠিন কাজটি বর্তমান সরকারকে দৃঢ়তার সঙ্গে করে যেতে হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর বিচক্ষণতা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালির চেতনার মধ্যে যে নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে তা টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রভাষা বাংলা অত্যন্ত জরুরি। যারা ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করে দেখাতে চান, তাঁরা ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখবেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তাঁর উপস্থিতি জাজ্বল্যমান। বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও দক্ষতায় বিভিন্ন আন্দোলনে বাঙালির আত্মপরিচয় ও জাগরণের উন্মেষ ঘটেছিল বলেই তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে বাংলাদেশের স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তর করতে পেরেছিলেন।

রক্তের আলপনায় রাজকীয় আবহে সগৌরবে বাংলা ভাষা আজ আমাদের রাষ্ট্রভাষা। অথচ এখনো এই ভাষার প্রতি আমাদের তথাকথিত ‘এলিট’ শ্রেণির অনীহা এবং বেশির ভাগ শিক্ষিত সমাজে এর বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও শুদ্ধ প্রয়োগে দীনতা প্রকটভাবে লক্ষণীয়। এখনো আমাদের সৃজনশীল আলেখ্য জারি-সারি-ভাটিয়ালিকে আমরা বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারের অপরিহার্য উপাদানরূপে উপস্থাপন করতে পারিনি। ২০০০ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসরূপে সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে। আমাদের মৃত্যুঞ্জয়ী বীর শহীদ বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার ও শফিকদের শ্রদ্ধাভরে বিশ্ববাসী স্মরণ করছে। অথচ বিশ্বে বাংলা সাহিত্যের গৌরব ও সমৃদ্ধির ইতিহাস আমরা সেভাবে তুলে ধরতে পারিনি। একুশ যেভাবে তার সীমাহীন ঔদার্যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে তার জাতীয়তায় বিস্তীর্ণ মিলন মোহনায় সুসংঘবদ্ধ করে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, আমরা সেই ঐক্য ধরে রাখতে বারবার ব্যর্থ হয়েছি শুধু তা-ই নয়, আমরা হিংসা, বিদ্বেষ ও ধর্মান্ধতায় নিজেরাই নিজেদের ব্যর্থতার কানাগলিতে ঠেলে দিচ্ছি। অথচ আমাদের সমৃদ্ধি, সম্মান, উন্নতি, বিকাশ—সব কিছুই নির্ভর করছে ঐক্যের ওপর। অন্তরায়টা যেহেতু রাজনৈতিক, এর সমাধানটিও রাজনৈতিকভাবেই কাম্য।

লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা