kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

সরকারি কর্মচারীদের ডেপুটেশন লিয়েন ও ছুটি

এ কে এম আতিকুর রহমান

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সরকারি কর্মচারীদের ডেপুটেশন লিয়েন ও ছুটি

গত ৯ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠ’র সম্পাদকীয়তে ‘লিয়েনের নামে হরিলুট!’ শিরোনামের লেখাটি পড়লাম। ওই পত্রিকায় এর আগে এবিষয়ক প্রকাশিত যে খবরটির উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিও আমি পড়েছি। লেখায় বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রগ্রাম (এসইডিপি) নামের একটি কার্যক্রমে জনবল নিয়োগের ব্যাপারে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী যেখানে ডেপুটেশনেই সরকারি কর্মচারীদের যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে লিয়েনে নিয়োগের বিষয়টি কিভাবে যে এলো—প্রশ্নটি আমাদের মনে আসা খুবই স্বাভাবিক। ‘লিয়েন’ নামের খেলাটি নতুন কিছু নয়, যদিও আগে এ প্রকৃতির লিয়েনের কথা শোনা যায়নি।

প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মচারীদের চাকরিবিধিতে লিয়েন, ডেপুটেশন এবং ছুটি সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত স্বার্থে ওই সব নিয়ম-নীতির বাইরে যাওয়ার ফন্দি-ফিকির এ দেশে বহুদিন থেকেই এক শ্রেণির সুবিধাভোগী সরকারি কর্মচারী অনুশীলন করে আসছেন। যাঁদের তদবির করার শক্ত খুঁটি রয়েছে এবং নিজস্ব ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করার জন্য কাঠামোতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রয়েছে তাঁদের জন্য আইন আর বিধি-বিধানের তোয়াক্কা করার প্রয়োজন আছে বলে দেখা যায়নি। এ দেশে দুর্বলদের জন্য নিয়ম-কানুন মানার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সবলদের জন্য বিধি-বিধানের ব্যতিক্রম ঘটানোই স্বাভাবিক হিসেবে সবাইকে মেনে নিতে হয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে যখন ব্যক্তির স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয় তখন তো এমনটি হতেই পারে। এ ক্ষেত্রে অবাক হওয়ার কিছুই নেই!

ডেপুটেশন, লিয়েন এবং ছুটি—এ তিনটির যে যথেচ্ছ অপব্যবহার করা হয় তার অনেক উদাহরণই আমরা খুঁজে পাব। আর এ কারণে এক শ্রেণির সরকারি কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে যদিও লাভবান হচ্ছেন, তাতে প্রজাতন্ত্রের ক্ষতি হওয়া ছাড়াও অন্য কর্মচারীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সর্বোপরি এসব করতে গিয়ে সরকারি বিধি-বিধানের যে ব্যত্যয় ঘটানোর প্রয়োজন পড়ে, তা চিরস্থায়ীভাবে একটি দুষ্ট ক্ষত হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং তার জের চলে বহুকাল পর্যন্ত, যত দিন না প্রশাসন একটি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল শাসনব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

একজন সরকারি কর্মচারী একমাত্র প্রজাতন্ত্রের সুবিধার্থে সরকারের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে বা এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে ডেপুটেশনে যেতে পারেন। অনেকে আবার ব্যক্তিগত স্বার্থকে লক্ষ্য করে বিশেষ উপায়ে ডেপুটেশনে গিয়ে থাকেন। আমি এ রকম হতে দেখেছি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, যেখানে ডেপুটেশনে আসার উদ্দেশ্যই থাকে দূতাবাসে পোস্টিং পাওয়ার জন্য। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও সুবিধাজনক বা লাভবান হওয়া যায় এমন দপ্তরে ডেপুটেশনে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। তবে যেভাবেই ডেপুটেশনে যাওয়া হোক না কেন, সব কিছুই সরকারের নিয়ম-নীতি মেনেই হয়ে থাকে। এ ছাড়া এর ফলে একজন কর্মচারী যেখানেই কর্মরত থাকুন না কেন, তা সরকারের কোনো না কোনো দপ্তরেই হয়ে থাকে। অর্থাৎ তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মেই নিয়োজিত থাকেন। তাঁর কোনো ছুটি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

কিন্তু লিয়েনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ভিন্নতর। বৈদেশিক চাকরির কারণে লিয়েনে থাকাকালীন একজন কর্মচারী প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মে নিয়োজিত থাকেন না। এ ক্ষেত্রে যে উদ্দেশ্যে তাঁকে প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সে উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। ওই পদটি খালি থাকার কারণে দেশ তথা জনগণ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। নতুন করে কাউকেও নিয়োগ দেওয়া হয় না। কারণ ওই সময় তিনি অনুমোদনকৃত ছুটিতে থাকেন। তবে বিনা বেতনে। কিন্তু এই বিনা বেতনে যে অসাধারণ ছুটি দেওয়া হয় তার সীমাবদ্ধতা থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অন্তত দেশ ও দশের কল্যাণে।

একজন সরকারি কর্মচারীকে বৈদেশিক চাকরিতে যেতে হয় চাকরি ছেড়ে বা লিয়েনে। লিয়েনে গেলে ছুটি নিতে হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর সরকারি চাকরির নিয়ম-নীতি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের জন্য প্রণীত নিয়ম-নীতিতেই চলা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে নিজস্ব চাহিদার বাস্তবতায় বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নীতিমালা প্রণয়ন করে। সময় সময় এসব নীতিমালায় প্রয়োজনে পরিবর্তন আনা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে লিয়েনের মেয়াদও বিভিন্ন রকম হতে থাকে। সরকার ১৯৯২ সালে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য লিয়েন দেওয়ার যে বিধানটি জারি করে তাতে বলা হয়, ‘লিয়েনের মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর হইতে পারে। এই পাঁচ বছর শুধু চাকরির জ্যেষ্ঠতা, বেতন বৃদ্ধি ও অবসরগ্রহণের (পেনশনের) জন্য গণনাযোগ্য হইবে।’ তবে শর্ত থাকে যে মোট লিয়েনকাল পাঁচ বছর অতিক্রম করলে বিশেষ বিবেচনায় সরকার অন্যরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।

পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে জারীকৃত এসংক্রান্ত পরিপত্রে লিয়েনের বিদ্যমান শর্তাবলির একটিতে (চাকরি থেকে পদত্যাগ বা স্বেচ্ছায় অবসরসংক্রান্ত) সামান্য পরিবর্তন আনা হয়। এ সময় ১৯৯২ সালের মতোই ‘এই পাঁচ বছর শুধু চাকরির জ্যেষ্ঠতা, বেতন বৃদ্ধি ও অবসরগ্রহণের (পেনশনের) জন্য গণনাযোগ্য হইবে’ প্রথম শর্তটি (ক) অবিকল রয়ে যায়। তবে দ্বিতীয় শর্ত (খ)-তে একটি ‘ব্যাখ্যা’ সংযুক্ত করা হয়, যা মূল শর্তের অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছুই নয়। ব্যাখ্যায় ‘এক দফায়’, ‘নিরবচ্ছিন্ন একনাগাড়ে’ প্রভৃতি বিভ্রান্তিকর শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের সুবিধাভোগের ব্যবস্থা করেছে। এমনকি একজন সরকারি কর্মচারী প্রায় সারা কর্মজীবনটাই লিয়েনে থাকতে পারেন সেই ইঙ্গিতই দিয়েছে ওই ‘ব্যাখ্যা’র মাধ্যমে একান্তই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে। তবে ১৯৯২ সালের পরিপত্রে একই শর্ত ছিল এবং সেখানে কোনো ব্যাখ্যা ‘সংযুক্ত’ ছিল না। ২০০৭ সালে এসে এমন কী প্রয়োজন পড়েছিল যে ওই ‘ব্যাখ্যা’ অংশটুকু যোগ করে সুবিধা আদায় করতে হলো? এভাবে দেশ ও জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়া কি সরকারের সুশীল সেবকদের যথাযথ হয়েছে? যাঁরা ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, তাঁদের থেকে এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করা যায় না। এ ক্ষেত্রে অবশ্য সরকারের দায়টা রয়েই যায়।

দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট শর্তের (পাঁচ বছরের) ব্যত্যয় ঘটিয়ে ১৮ থেকে ২০ বছর লিয়েনে (একনাগাড়ে বা সামান্য বিরতি দিয়ে) থাকার পর ফিরে এসে আগের কর্মস্থলে পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধিসহ সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে তাঁদের কোনো সমস্যাই হচ্ছে না। এমনকি এত দিনের অনুপস্থিতির ফলে ওই কর্মে অভিজ্ঞতা অর্জন না করলেও তাঁকে অন্য যাঁরা নিয়মিত কর্মরত ছিলেন তাঁদের মতোই সমভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্মের অভিজ্ঞতা ছাড়াই অধিক দায়িত্বসম্পন্ন উচ্চতর পদে বসানো হচ্ছে। এমনকি অন্যদের চেয়ে বেশি ভালো অবস্থানে থেকে সব সুবিধাসহ অবসরে যাচ্ছেন। এ দেশে খুঁটির জোর নিয়ম-নীতির তোয়াক্কাই করে না। কথায় বলে, জোর যার মুল্লুক তার—তেমনটাই আর কি! সত্যি বলতে, বছরের পর বছর লিয়েনে থাকা এসব ব্যক্তি কি প্রজাতন্ত্রের জন্য খুবই আবশ্যক? 

একজন কর্মচারী লিয়েনে যাওয়ার আগে যদি ১০ বছর কাজ করে থাকেন এবং যদি ১৫ থেকে ২০ বছর লিয়েনে কাজ করে পুনরায় চাকরিতে যোগ দেন, তাহলে তিনি বছর পাঁচেক কাজ করার পর পূর্ণ সুযোগ-সুবিধাসহ অন্যদের মতোই অবসরে যেতে পারেন। লিয়েনে উচ্চ বেতনে চাকরি করে আর্থিকভাবে যেমন তিনি লাভবান হলেন, তেমনি ফিরে এসেও কোনো সুবিধা থেকেই বঞ্চিত হলেন না। দীর্ঘ সময় প্রজাতন্ত্রের কোনো সেবা প্রদান না করেই নিরলস কর্মরতদের সমান যোগ্যতার অধিকারী হিসেবে মূল্যায়নের কি কোনো যুক্তি আছে? যে সেবা থেকে দেশ বঞ্চিত হলো তার খেসারত কে দেবে? যে কাজের জন্য তাঁকে নেওয়া হলো সে কাজ থেকে তিনি যদি অনুপস্থিতই থাকলেন, তবে সে কর্মে তাঁকে দীর্ঘ সময় ছুটি দিয়ে রাখা হয় কার স্বার্থে? বরং তাঁকে বিদায় দিয়ে অন্য একজন নিয়ে নিলেই হয়। দেশে জনবলের কি এতটাই সংকট রয়েছে? জানি না, এর ফলে অন্যদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে কি না বা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না। দেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হলে লিয়েনে ছুটি দেওয়ার নিয়মটা বিলুপ্ত করা যায়। এ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে।       

বাংলাদেশের সব সরকারি অফিস সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির কারণে দুই দিন বন্ধ থাকে। অর্থাৎ বছরে ১০৪ দিন ছুটি। এ ছাড়া জাতীয় ও ধর্মীয় নানা উপলক্ষে বছরে গড়ে ছুটি থাকে আরো ২২ দিন। এককথায় বলতে গেলে একজন সরকারি চাকরিজীবীকে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১২৬ দিন তাঁর কর্মস্থলে কাজ করতে যেতেই হয় না। এরপর রয়েছে বছরে ২০ দিন পর্যন্ত নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়ার সুবিধা। প্রতি তিন বছর পর নেওয়া যায় ১৫ দিনের চিত্তবিনোদন ছুটি। বছরের ছুটির হিসাবে আরো যোগ হয় ৩০ দিনের পূর্ণ বেতনে অর্জিত ছুটি এবং ১৫ দিনের অর্ধগড় বেতনে ছুটি। কেউ বছরে সব ছুটি ভোগ করতে চাইলে তিনি বছরের অর্ধেকটা সময়ই অফিসে না গিয়ে চাকরিকে নিরাপদ রাখতে পারেন। তার পরও ছুটি কাটানোর অবকাশ রয়েছে—বেতনসহ ছাড়াও বিনা বেতনে বিভিন্ন ছুটির বদৌলতে।

উপরোল্লিখিত ছুটিগুলোর মধ্যে ১২৬ দিনের ছুটি সবাই কাটিয়ে থাকেন। নৈমিত্তিক ছুটির হাঁড়ি থেকে প্রয়োজনে অনেককেই দু-চার দিন ছুটি নিতে দেখা যায়। তবে জরুরি জনসেবামূলক কর্মে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের অনেক সময় সাপ্তাহিক বা সরকারি ছুটি ভোগ করার সুযোগও থাকে না। তাই সার্বিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার নিরিখে এত সব ছুটির বিষয়টাও পুনর্বিবেচনা করা দরকার বলে মনে করি।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা