kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

‘ফুল ফুটুক না ফুটুক...’

ড. শফিক আশরাফ

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘ফুল ফুটুক না ফুটুক...’

শীতের আমেজ শেষ হওয়ার পথে। নাতিশীতোষ্ণ আরামদায়ক আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি যেটা কানে বাজবে ও দৃষ্টি জুড়াবে, সেটা হলো পাখির প্রচুর কোলাহল এবং নানা রঙের ফুলের সমাহার। পাখির কলকাকলি ও দৃষ্টিনন্দন ফুলের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে প্রকৃতিতে একটা পরিবর্তন আসছে। গাছে গাছে আম-লিচুর বোল, ফুলে ফুলে মৌমাছির গুঞ্জরন বাঙালির দেহ ও মনে এক ধরনের আনন্দ নিয়ে ছড়িয়ে বলছে, বসন্ত এসে গেছে। কিংবা কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বেশ গলা উঁচু করে বলেন, ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত, শান বাঁধানো ফুটপাতে পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে হাসছে।’ এমনকি খনার বচনের খনাও ফাল্গুনের গুণগান করতে পিছপা হননি। তিনি বলেছেন, ‘চৈতে গিমা তিতা, বৈশাখে নালিতা মিঠা, জ্যৈষ্ঠে অমৃতফল আষাঢ়ে খৈ, শায়নে দই। ভাদরে তালের পিঠা, আশ্বিনে শসা মিঠা, কার্তিকে খৈলসার ঝোল, অঘ্রানে ওল। পৌষে কাঞ্ছি, মাঘে তেল, ফাল্গুনে পাকা বেল।’

সাধারণ মানুষ ফাল্গুনের আনন্দ শুধু উপলব্ধি করতে পারে, তাড়িত হতে পারে; কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না। প্রকৃতির এই রূপবৈচিত্র্যকে প্রকাশ করেন কবি ও গায়করা। সাধারণ মানুষ কবিদের কবিতা মুখে নিয়ে, গানের সুরকে কণ্ঠে নিয়ে প্রকৃতির দিকে তাকায়, আনমনে গুনগুন করে—আহা আজি এ বসন্তে, এত ফুল ফোটে, এত পাখি গায়...। বসন্ত নিয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এমনকি শান্তিনিকেতনে তিনিই সর্বপ্রথম বসন্ত উৎসব প্রথা চালু করেন। বসন্ত নিয়ে সবচেয়ে বেশি কবিতা ও গান তিনিই লিখেছেন। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই সর্বপ্রথম বাঙালিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখার রুচিবোধ তৈরি করে দেন। কবি জীবনানন্দ দাশকে প্রকৃতির কবি বলা হলেও তাঁর কবিতায় শরৎ ও হেমন্তকালের প্রকৃতির রূপ বেশি পরিমাণে উঠে এসেছে। বসন্ত নিয়ে জীবনানন্দ দাশের উচ্ছ্বাস কিছুটা কম ছিল। বসন্তের রংকে শত গুণে রঙিন করে মানুষের মনে ছড়িয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

যদিও বর্তমান এই ভার্চুয়াল পৃথিবীর মানুষ জীবন-জীবিকার অসীম প্রতিযোগিতায় অনেকটা প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। আমরা যদি আমাদের বর্তমান অবস্থা উপলব্ধি করতে চাই, তাহলে আমাদের সৃষ্টিলগ্নের এ রকম একটা কল্পকাহিনি হাজির করতে পারি, যেখানে মানুষের প্রকৃতিবিচ্ছিন্নতার স্বরূপটা ধরা পড়বে : আমাদের জন্মপূর্বে সৃষ্টিকর্তা আমাদের বলেছিলেন, শোনো, তোমাদেরকে আমি এমন একটা জায়গায় পাঠাতে চাই সেখানে আকাশ-সকাল, দুপুর, সন্ধ্যায় অনেক রূপ ধারণ করবে। নীল আকাশে যখন ধবধবে সাদা মেঘ সন্ধ্যার সময় সোনারূপ দেখাবে, আকাশের রং যখন পানিতে পড়বে সেটা দেখে তোমরা বিমোহিত হবে কিংবা এক ঝাঁক পাখি যখন আকাশে উড়ে উড়ে দিগন্তের দিকে যাবে তখন তোমার পাখির মতো উড়তে ইচ্ছা করবে। হেমন্তের সন্ধ্যায় বিস্তীর্ণ প্রান্তর থেকে হালকা কুয়াশা এসে যখন তোমাকে জড়িয়ে ধরবে কিংবা সোনারঙা ফসলের মাঠ থেকে এক আবেশি গন্ধে মন উচাটন হবে। কোনো এক রাতে থইথই জ্যোত্স্নায় যখন চারপাশ ভেসে যাবে, গাছের পাতা থেকে চুইয়ে পড়বে কোমল আলো তখন তোমাদের মনে হবে আহা রে জীবন, আহা জীবন। যখন কোনো এক গরমে নৈঋত থেকে হালকা লিলুয়া বাতাস তোমাদের শরীরে পরশ বোলাবে কিংবা লাল-নীল চুড়ি পরা একটি কোমল হাত ঠাণ্ডা এক গ্লাস জল নিয়ে পাশে দাঁড়াবে তখন তোমাদের মনে হবে, এই জীবন অনন্ত হয় না কেন! পাখিরা সারা দিনমান তোমাদের গান শোনাবে। সেখানে গাছে গাছে ফুল, ফল আর পানের জন্য বিশুদ্ধ পানির মজুদ রয়েছে। এসব শুনে আমরা হয়তো অতি আগ্রহে বলেছিলাম, সেই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আমরা সেখানে যেতে চাই, আমাদের এখনই পাঠাও। আমাদের অতি আগ্রহ দেখে স্রষ্টা মুচকি হেসে বলেছিলেন, ধীরে বৎসগণ! আমি তোমাদের অগে যাদের সেখানে পাঠিয়েছি, তারা আকাশ দেখে না, পাখির গান তাদের বিমোহিত করে না, জ্যোত্স্না রাতে তারা পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুমায়! জীবনের বড় একটা অংশ কাটিয়ে দেয় অন্যের ভুল খোঁজে। অনেকের গ্রাস কেড়ে নিয়ে নিজের জন্য খাদ্য মজুদ, বালু-পাথরের অনেক উঁচু একটা ঘর, সবাইকে পেছনে ফেলে সামনে দ্রুত ছুটে চলার জন্য একটা বাহনের জন্য তাদের নির্ঘুম রাত কাটে। এগুলো কল্পনা হলেও এটা ঠিক যে আমাদের জীবন বাস্তবতা থেকে হারাতে বসেছে প্রকৃতির রূপ-রস। ভয়াবহ প্রকৃতিদূষণ সৃষ্টি করে তার মধ্যে আমরা বসবাস করি। আমাদের খাল-বিল, নদী-নালাকে মাছশূন্য করে চাষের মাছ খাই। গাছের অভাবে অক্সিজেনের জন্য হাঁসফাঁস করি!

তবে এটাও ঠিক, আমাদের এই প্রকৃতিবিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও প্রকৃতি জেগে থাকে। প্রকৃতিঘেঁষা শিল্পী, সাহিত্যিক, গায়ক-কবিরা প্রকৃতির এই পরিবর্তনের জয়গানে পাখিদের মতো আমাদের মুখরিত করে রাখেন। আমরা ফাল্গুনকে বরণ করার উদ্যোগ নিই, তরুণ-তরুণীরা ভালোবাসা দিবস পালন করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তারা মনে মনে গুনগুনিয়ে গায়, ‘জল সুন্দর শরৎকালে, ফুলে বসন্ত এলে, প্রেমের খেলা জমে ভালো যৌবনে।’ ফাল্গুন হলো প্রকৃতির যৌবনকাল। পহেলা ফাল্গুনকে ঘিরে প্রকৃতির যৌবনের দরজায় প্রবেশের উৎসবে আমরা অতিথি হই। কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো রক্তে আগুন জ্বালানো বিদ্রোহী কবিও ফাল্গুন নিয়ে লিখেছেন, ‘এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে/খুনেরা ফাল্গুন।’ তিনি ফাল্গুনের রঙের ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছেন বিপ্লবের আগুনকে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ফাল্গুন মাসে। জহির রায়হানের ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক উপন্যাস আরেক ফাল্গুনে লিখেছিলেন—ফাল্গুন মাস এলে আমরা দ্বিগুণ হই। ফাল্গুন আমাদের ভাষার মাসও। বাংলা একাডেমির অমর একুশের গ্রন্থমেলাও অনেকটা ফাল্গুনেরই দান। গাছে গাছে কচি সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে শিমুল-পলাশের মতো আগুনরঙা ফুল আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিগত বিপ্লব-বিদ্রোহ, আনন্দ-ভালোবাসার কথা। আমাদের তরুণ প্রজন্ম হয়তো ইতিহাসের সবটা জানে না; কিন্তু তারা এই ফাল্গুনের ৮ তারিখে বুকের ভেতর দেশকে ধারণ করে প্রভাতফেরি করে ভাষা মিছিলে যোগ দেয়। প্রকৃতির সমস্ত রং নিয়ে আমাদের এই তরুণ প্রজন্ম এই ফাল্গুনে রঙিন হয়ে উঠুক। তাদের দেখানো ভালোবাসার হাত ধরেই হয়তো আমরা পাব ভবিষ্যতের নির্মল বাংলাদেশ, যেটা আমরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা