kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও ভোক্তা অধিকার

এস এম নাজের হোসাইন

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও ভোক্তা অধিকার

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে জোরেশোরে প্রস্তুতি চলছে। প্রার্থীদের রাত-দিন ঘুম হারাম। নগরীর অলিগলিতে ভোটারদের দরজায় দরজায় ভোট প্রার্থনা চলছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ এই দুই সিটির বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সব প্রার্থী জনগণের জন্য নানা প্রতিশ্রুতি প্রদান করছেন। নির্বাচনী অঙ্গীকারনামা বা ম্যানিফেস্টো এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের ১৭ কোটি অসহায় ভোক্তার দাবি তুলে ধরার জন্য আমার এ প্রয়াস। আশা করছি, সম্মানিত প্রার্থী ও তাঁদের নীতিনির্ধারকরা সাধারণ জনগণের ভোক্তা অধিকার, হয়রানি ও মনোবেদনার কথাগুলো শুনবেন এবং তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে—এ প্রত্যাশা করি।

ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য ও পানীয় : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনগুলো খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে সেভাবে সক্রিয় হতে পারেনি। সিটি করপোরেশন আইনে নগরবাসীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ খাদ্য ও পানীয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে পুরো নগরই যেন ভেজালের স্বর্গরাজ্য। সিটি করপোরেশনের যেভাবে নজরদারি করা দরকার ছিল, তা পুরোপুরি অনুপস্থিত।

ভোগ্য পণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা : নগরজীবনে একটি বড় সমস্যা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ও মজুদদারি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে থাকেন। সিটি করপোরেশন এখানে একেবারেই নীরব। বাজারগুলোতে নিয়মিতভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর মনিটরিং, মূল্যতালিকা টাঙানো নিশ্চিত করা, বাজারে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সিটি করপোরেশনগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : জন-অংশগ্রহণমূলক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের সিটি করপোরেশনগুলো পিছিয়ে আছে; যদিও তাদের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ময়লা-আবর্জনা অপসারণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। কিন্তু এটি কোনো সময় যথাযথভাবে হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয় না। কারণ পুরো নগরকে অনেক সময় মনে হয় ডাস্টবিনের মতো। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে নগরবাসীর সেবায় তা কাজে লাগানো যেতে পারে।

আন্ত সংস্থা সমন্বয় : নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, নগরীতে ৫২টি সংস্থা বিভিন্ন সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। কিন্তু সেবা প্রদানকারী এসব সংস্থার মাঝে কার্যকর আন্ত সমন্বয় না থাকায় একেকটি সংস্থার একেকবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ধুলাবালির যন্ত্রণায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

জলাবদ্ধতা ও পয়োনিষ্কাশন : জলাবদ্ধতা সিটি করপোরেশনগুলোর একটি বৃহৎ সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নালা-নর্দমাগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার না করা। এগুলো অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ার কারণে পানি নিষ্কাশনের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে যায়। উন্নত রাষ্ট্রগুলো বৃষ্টি-বাদল হলেই পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। আমাদের এখানে সে ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

যানজট ও নিরাপদ সড়ক : যানজট সমস্যার কারণে ঢাকা বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে অচল নগরীর অন্যতম একটি শহরে পরিণত হয়েছে। নিরাপদ সড়ক মানে শুধু দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক চলাচল নয়, এখানে নারীসহ সবার জন্য সব সময় যাতায়াত নিশ্চিত ও নির্বিঘ্ন হতে হবে। ঢাকা নগরীতে যানজট এখন মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। যদি নগরে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হয়, তাহলে মানুষ নিজস্ব পরিবহন বাদ দিয়ে গণপরিবহনে ভ্রমণে আগ্রহী হবে।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ : নগরজীবনে বাড়িভাড়া মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা নির্বাহে একটি বড় সমস্যা। সরকার বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ করলেও আজ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি এই আইনের বিধিমালাও প্রণীত হয়নি। আইনটি কোন মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে তারও কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাড়িভাড়া নিয়ে ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকের মধ্যে কোনো জটিলতা হলে সালিস করতে পারে, এলাকা অনুযায়ী বাড়িভাড়ার একটি তালিকা তৈরি করে দিতে পারে।

ভর্তি বাণিজ্য ও সর্বজনীন শিক্ষা : মানুষ গ্রাম থেকে শহুরমুখী হয় দুটি কারণে—একটি কর্মসংস্থান, অন্যটি শিক্ষা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করলেও নগরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে নানা প্রকারের সাইনবোর্ডসবর্স্ব প্রতিষ্ঠান, যার বেশির ভাগই বাণিজ্যিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভর্তিতে সরকার নির্ধারিত ভর্তি ফির অতিরিক্ত ফি আদায়, ইচ্ছামতো টিউশন ফি আদায়, টিসিতে বছরের টিউশন ফি আদায়সহ কোচিং বাণিজ্যে নিয়োজিত থাকলেও তাদের কোনো পদক্ষেপ নেই।

হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ : সিটি করপোরেশনগুলোর বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ, অতিরিক্ত হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে নৈরাজ্য। নগরীর সব বাড়ি ও স্থাপনার তালিকা হালনাগাদ ও ডাটাবেইস করা এবং ভোগান্তি নিরসনে ত্রিপক্ষীয় গণশুনানির আয়োজন করা দরকার।

সচল ফুটপাত ও ওয়াকওয়ে : পৃথিবীর সব কটি নগরীতে যথেষ্ট হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে থাকলেও বাংলাদেশে তার বিপরীত। সকাল-বিকাল বা প্রয়োজনে নাগরিকরা যদি হাঁটতে পারে, তাহলে ডায়াবেটিসসহ নানা রোগমুক্তি সহজ হতো। সিটি করপোরেশন রাস্তা সংস্কার করলে এর পরই হকারদের দখলে চলে যায়। যদি কোনো অংশ খালি থাকে, তাহলে সেটি রিকশা, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে অথবা দোকান দিয়ে দখল হয়ে থাকে। রাস্তা বা মার্কেটগুলোর সামনে এভাবে হকারদের বসিয়ে পুরো নগরীর সৌন্দর্য বিঘ্নিত করা হচ্ছে।

ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব : নগরীতে সেবাদানকারী সংস্থায় ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব না থাকা একটি বড় নাগরিক সমস্যা। আমাদের দেশে আমরা প্রায়ই লক্ষ করে থাকি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আদলে সেবা সংস্থাগুলোতে ভোক্তা প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। সিটি করপোরেশনগুলোর বিভিন্ন উপকমিটিতে ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা বা ভোক্তা অধিকার খাতে কোনো উপকমিটি নেই। এ কারণে ভোক্তা ও নাগরিক সংশ্লিষ্ট কমিটি ও সেবাদানকারী সংস্থায় এখনো সত্যিকারের ভোক্তা প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি।

ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ : গত বছর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ঢাকাসহ পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। কমেনি আশঙ্কা, গড়ে ওঠেনি সমন্বিত নির্মূল ব্যবস্থাপনা। ডেঙ্গু ও মশা নিধনে বছরব্যাপী সমন্বিত পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। মশার উৎপত্তিস্থল ও পরিবেশ বিনষ্ট করতে হবে।

নদী, জলাভূমি, মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ : ঢাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত ১৯টি খাল ছিল। সেগুলো এখন মুমূর্ষু। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী, বংশী নদীর ধারায় গড়ে উঠা এই নগরে এখন নদীর গন্ধ নেই। ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে ঢাকার চারধারের নদী সুরক্ষায় সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। এখানে নতুন প্রজন্মের জন্য খেলা, বিনোদনের মাঠ ও নানামুখী সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্য উন্মুক্ত স্থান একেবারেই নেই। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে পর্যাপ্ত জলাভূমি, খাল, লেক, মাঠ ও উন্মুক্ত প্রান্তরগুলোকে পাবলিক প্লেস বা জনপরিসর হিসেবে সুরক্ষা করতে হবে।

বায়ু ও শব্দদূষণ রোধ : বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে এক নম্বর ঢাকা। শব্দদূষণেও কাহিল এই নগর। বায়ু ও শব্দদূষণের ব্যাপারে কঠোর আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যথাযথ পরিবেশ বিধি-বিধান মেনে না চলা, ইটভাটা এবং শিল্প-কলকারখানার কালো ধোঁয়ার কারণে বায়ু দূষিত হচ্ছে। আর যত্রতত্র গাড়ির হর্ন, অযথা কোলাহল ও নৈরাজ্যকারী শব্দদূষণ কঠোরভাবে থামাতে হবে।

পলিথিন ও প্লাস্টিকমুক্ত নগর : ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ পলিথিন ও প্লাস্টিক। পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার উভয় ক্ষেত্রে নজর দেওয়া না হলে এ অবস্থার পরিত্রাণ সম্ভব নয়। যত্রতত্র এ ধরনের কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন দরকার, তেমনি জনসাধারণের মাঝে প্লাস্টিকসামগ্রী ব্যবহারের অপকারিতা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিকল্প ব্যবহারও নিশ্চিত জরুরি।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গণশুনানি : নগরে সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক জবাবদিহিকে নাগরিক পরিবীক্ষণের আওতায় আনতে হবে। নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নাগরিক সংগঠনগুলোকে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কমিটি ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগদান করতে হবে এবং নাগরিক প্রতিষ্ঠানেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। খাদ্য পণ্যে ভেজাল রোধ, নিরাপদ খাদ্য, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাড়িভাড়া, হোল্ডিং ট্যাক্স, গণপরিবহন, নগর ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে নাগরিক ভোগান্তি নিরসনে গ্রাহক, সেবাদানকারী সংস্থা ও ভোক্তা প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় গণশুনানির ব্যবস্থা করতে হবে।

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা