kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ভারত সরকারকে সাংবিধানিক নৈতিকতা শিখতে হবে

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারত সরকারকে সাংবিধানিক নৈতিকতা শিখতে হবে

ভারত সরকারকে সাংবিধানিক নৈতিকতা শিখতে হবে ভারতের প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় সংগ্রাম শুরু হয়েছে। আজ থেকে ৭০ বছর আগে ভারতের সংবিধান চালু হয়। সংবিধানে মৌলিক অধিকারের প্রথম শব্দটিতে বলা হয়েছে, ‘উই দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া’  (We the people of India)। আজ থেকে অঙ্গীকার করছি যে  JUSTICE LIBERTY OF THOUGHT FATERNITY OF SECULARISM AND UNITY OF NATION.

৭০ বছর পর বিশ্বের এই বৃহত্তম প্রজাতন্ত্রের প্রজারা হঠাৎ জানতে পারল যে তারা ভারতের নাগরিক নয়। তাদের চৌদ্দপুরুষ আগেকার প্রপিতামহের জন্মস্থান, নাম, গোত্র—সব কিছু মোদি সরকারকে জানাতে হবে। তাই সারা ভারতবর্ষের মানুষ জাত-পাত-ধর্ম-নির্বিশেষে নতুন করে আজাদির ডাক দিয়েছে। বস্তুত কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ২৬ জানুয়ারি হবে স্বাধীনতা দিবস। প্রসঙ্গত ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২৬ জানুয়ারি হবে ভারতের স্বাধীনতা দিবস; কিন্তু ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট মুম্বাইয়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় এক লাইনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, এই সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান মহাত্মা গান্ধী।

গান্ধীজি সেদিন ভারতবাসীকে জানিয়েছিলেন, ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’, তিনি শর্ত দিয়েছিলেন—যদি না ছাড়ো, তবে অহিংসভাবে আমি এক কদম উঠাব, তার ফলে গোটা ভারত উথাল-পাথাল হয়ে যাবে আর এর জন্য দায়ী হবে ইংরেজরা। গান্ধীজির ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেদিন সারা ভারতে আগুন জ্বলেছিল, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কংগ্রেস এই সুযোগ বেছে নিয়েছিল। ইংরেজরা উল্টো দিকে অবিভক্ত বাংলাসহ বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দেয়। সেদিন রাতেই গান্ধীজি, জওয়াহেরলাল নেহরু, বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সরদার প্যাটেলসহ জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাই গান্ধীজি ও ভারতীয় সর্বস্তরের নেতাদের ও জনগণের প্রতিবাদের চাপে ইংরেজরা ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে বিভক্ত করে স্বাধীনতার নামে ভারতকে পঙ্গু করে দিয়ে ভারতকে ছেড়ে গেল। কংগ্রেস দল গণপরিষদ গঠন করে প্রায় আড়াই বছর ধরে সংবিধান রচনা করে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারত একটি প্রজাতান্ত্রিক দেশ হিসেবে জন্মলাভ করে। গণপরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওয়াহেরলাল নেহরু। গণপরিষদে সংবিধানে স্বাক্ষর করার সময় নেহরু বলেছিলেন, এই সংবিধান হবে ভারতের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার দলিল। তিনি আরো বলেছিলেন, ভারতের উন্নতির জন্য আমাদের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তিনি তা করেও ছিলেন। ভারত স্বাধীনতার পরই তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নেহরুকে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নেহরুকে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, নতুন ভারত নির্মাণের জন্য তারা বিপুল অর্থ সাহায্য করবে; কিন্তু শর্ত একটিই, ভারতকে আমেরিকার তাঁবেদার হয়ে থাকতে হবে। নেহরু তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ভারত পুনর্গঠনের সময় কোনো রাষ্ট্রের তাঁবেদারি করবে না বা কারো কাছ থেকে ভিক্ষা নেবে না—এটিই ছিল নেহরুর প্রতিজ্ঞা। আর সংবিধানই ছিল ভারতের জনগণের একমাত্র রক্ষাকবচ। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্তালিন নেহরুকে মস্কো সফরে আমন্ত্রণ জানান। নেহরু নিজে না গিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও নেহরুর বন্ধু ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণানকে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মস্কো পাঠিয়েছিলেন। স্তালিনের প্রস্তাব ছিল, ভারতের উন্নয়নের ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন সব রকম সাহায্য করতে প্রস্তুত—কোনো শর্ত ছাড়াই এ কথা তিনি ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণানকে বলেছিলেন। ভারতের উন্নয়নের ব্যাপারে সোভিয়েত রাশিয়ায় স্তালিনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে নেহরু পাঠান তৎকালীন ভারতের বিদেশ ও কমনওয়েলথ সচিব সুবিমল দত্তকে। সুবিমলবাবু দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর আগেই বিদেশ ও কমনওয়েলথ সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।

তিনি মস্কো থেকে ঘুরে এসে নেহরুকে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, বিজ্ঞান প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ইস্পাত, রেল, জাহাজ, যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান—সব ব্যাপারে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন স্তালিন। সুবিমলবাবু চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার ১৮ বছর পর নেহরুকন্যা ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে বাংলাদেশের প্রথম হাইকমিশনের পদ গ্রহণ করেছিলেন দুই বছরের জন্য। সেই সময় তাঁর সঙ্গে আমার প্রায় প্রতিদিনই আলোচনা হতো। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের বিদেশনীতি কিভাবে স্থির করা হয়েছিল—এই প্রসঙ্গ নিয়ে। সুবিমলবাবু আমাকে বলেছিলেন, ভারত কোনো জোটে থাকবে না। না আমেরিকা, না সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারত সেই সময় এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার মতো সদ্যঃস্বাধীন হওয়া দেশগুলোকে নিয়ে ভারত একটি নির্জোট আন্দোলন গড়ে তুলবে। নেহরুর চিঠি নিয়ে সুবিমলবাবু মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের, যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটো, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ, আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নকুমা এবং চীনে সদ্যোবিপ্লবের পর চীনের প্রধানমন্ত্রী জুএনলাই—তাঁরা সবাই নেহরুর প্রস্তাবে রাজি হন। নেহরু জীবিতকালে পৃথিবীর ১৩২টি দেশ এই নির্জোট আন্দোলনের সদস্য হয়। বর্তমানে সম্ভবত বাংলাদেশসহ ১৯২টি দেশ এই নির্জোট আন্দোলনের সদস্য। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যই ছিল—স্বাধীন দেশগুলো নিজেদের দেশের উন্নয়নের জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করবে।

সংবিধান চালু হওয়ার ৬৫ বছর প্রত্যেক নাগরিক এই সংবিধানের নির্দেশাবলি মেনে নিয়েই চলেছে। হঠাৎ করে মোদি সরকার সংবিধান সংশোধন করে ভারতীয় নাগরিকদের বিদেশি বলে চিহ্নিত করতে শুরু করল। তাদের এক দফা কর্মসূচি হলো, ভারত থেকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের তাড়াতে হবে। ২০ কোটি মুসলমান বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় ২৪ শতাংশ মুসলমান কোথায় যাবে তা-ও তারা ঠিক করে দিয়েছে। তারাও তো ভারতের প্রজা, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে মোদি, অমিত শাহ ও মোহন ভগবতের কোনো অধিকার নেই তাদের তাড়ানোর। আর তারই প্রতিবাদে ভারতের ছাত্র, যুবসমাজ, শিক্ষক, শিক্ষিকা, বুদ্ধিজীবী, বিশ্বজন, সাংবাদিক, মহিলারা গর্জে উঠেছেন। গেরুয়া বাহিনীর সরকার তা দমন করার জন্য প্রজাতন্ত্রের প্রজাদের ওপর প্রায় প্রতিদিন নানা রকম আইন নিয়ে আসছে। এমনকি ব্রিটিশ যে আইন করেনি—বিনা বিচারে যেকোনো মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া ও গৃহবন্দি করে রাখার আইন চালু করেছে। এই নাগরিকত্ব বিলে এমন কিছু ধারা সংযোগ করা হয়েছে, যা ভারতের প্রজারা মানতে পারছে না। এরই মধ্যে বিজেপিশাসিত সব শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছে।

শাসক সরকার যে এমন আশ্চর্য তৎপরতায় ভারতের সংবিধানকে ‘অলীক’ বানিয়ে দিল, সেটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, নিশ্চয় এরও একটি লম্বা প্রস্তুতিপর্ব আছে—ক্রমে সেটি প্রকাশ পাবে। বিশেষজ্ঞরা আমাদের কাছে সেটি বুঝিয়ে বলবেন। মনে পড়ে যখন এ দেশের সংবিধান তৈরি হচ্ছিল তখনো এ নিয়ে টেনশন কম ছিল না। রোহিত দের বইয়ে পঠিত জয়রুল হাসান লারির কথা, মুসলিম লীগের সমর্থক হয়েও তিনি ভারতীয় মাটিকে বেছে নিয়েছিলেন, কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির (গণপরিষদ) সদস্য ছিলেন। তারপর সংবিধান চালু হওয়ার আগেই আবার পাকিস্তানে চলে যাওয়ার মনস্থ করেছিলেন, গণপরিষদের চেয়ারপারসন অম্বেদকর যখন সাংবিধানিক নৈতিকতার ওপর জোর দিয়েছিলেন, বলেছিলেন যে এটি কোনো স্বাভাবিক বোধ নয়, যা মানুষের মধ্যে এমনিই থাকে, অনেক ধৈর্য নিয়ে, যত্ন নিয়ে মানুষের মধ্যে এই বোধ তৈরি করতে হয়—অম্বেদকরের সেই উঁচু থেকে নিচুর প্রতি দায়িত্বের কথা মেনে নিয়েও লারি একটি গুরুতর শর্ত যোগ করেছিলেন। ‘উঁচু’র জন্যই সেই শর্ত। বলেছিলেন, শুধু সাধারণ মানুষ কেন, সরকারের মধ্যেও এই নৈতিকতা স্বাভাবিকভাবে থাকার কথা নয়। সরকারকেও সাংবিধানিক নৈতিকতা নামের বিষয়টি শিখতে হবে। মানুষ যখন বিচার বিভাগের মাধ্যমে শাসন বিভাগকে প্রশ্ন করবে, সমালোচনা করবে, চ্যালেঞ্জ করবে তখন সরকারকেও তা যথাযথভাবে গ্রহণ করতে হবে, আত্মসংশোধন করতে হবে, অর্থাৎ সাংবিধানিকতা একটি দ্বিমুখী বিষয়, একমুখী নয়।

সংবিধান চালু হওয়ার ৭০ বছর পর এ বছরই প্রথম দেশের যুবসমাজ, ছাত্র-ছাত্রীরা এরই মধ্যে দাবি তুলেছে। আমরা এই পবিত্র সংবিধান আঁকড়ে ধরে থাকব। এই সংবিধান ভাঙতে দেব না, তাতে যা হওয়ার হোক। ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি গেল। দেখা যাক কোন হলাহল মন্থনে কোন অমৃত উঠে আসে।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা