kalerkantho

শনিবার । ১৪ চৈত্র ১৪২৬। ২৮ মার্চ ২০২০। ২ শাবান ১৪৪১

সঠিক চিকিৎসায় কুষ্ঠ নিরাময় হয়

ডা. মো. আশরাফুল হক

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সঠিক চিকিৎসায় কুষ্ঠ নিরাময় হয়

লেপ্রসি বা কুষ্ঠ আসলে মাইকো ব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি নামক এক ধরনের জীবাণু দিয়ে সৃষ্ট একটি রোগ, যা সাধারণত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, যেখানে অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।

প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শরীরের উপরিভাগের চামড়ার ভেতরে ছোট ছোট সাদা রঙের কিছু দাগের মতো সৃষ্টি হয় বা ছোট চাকের মতো ধরতে অনুভব হয়। তাই একেবারে শুরুর দিকে একে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন থাকে এবং অনেক সময় তা সঠিক চিকিৎসাও পায় না। তাই এর চিকিৎসা সারা বিশ্বে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হয়।

যদি একে সঠিকভাবে প্রথম পর্যায়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে এটি শরীরের বিভিন্ন অংশের স্নায়ুকে আক্রান্ত করে, বিশেষ করে হাত, পা, চোখ ও মুখমণ্ডলের নানা অংশে। এর কারণে যদি রোগী কোনোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তবে তারা কোনোরূপ ব্যথা অনুভব করে না। তাই তারা বুঝতে পারে না আঘাতের মাত্রা কতটুকু। চিকিৎসা একেবারে না পেলে মাংসপেশি দুর্বল হতে থাকে; যার ফলে প্যারালিসিস হয়ে একপ্রকার বিকৃতির সৃষ্টি হয়, যা হাতে আক্রান্ত হলে ক্লো হ্যান্ড, পায়ে হলে ফুট ড্রপ নামেও পরিচিত। অনেক সময় রোগী তার চোখের পাতাও বন্ধ করতে পারে না, যখন চোখের পাতা আক্রান্ত হয়। এসব কারণে লেপ্রসি আক্রান্ত রোগী উচ্চ মাত্রার নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

চিকিৎসা পাওয়ার পর যখন ব্যাকটেরিয়া থাকে না শরীরে তখনো রোগী ব্যথা, দুর্বলতা, মুখ ফুলে যাওয়া, জ্বর ইত্যাদির লক্ষণ নিয়ে আসতে পারে।

পৃথিবীর অনেক দেশেই নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা ও কুসংস্কারের জন্য কুষ্ঠরোগীরা তাদের পরিবার এবং সমাজ থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক সময় তারা তাদের কর্মক্ষেত্রেও তাদের রাখতে আপত্তি জানায়। ফলে তারা আয়ের উৎস থেকেও বঞ্চিত হয়। তাই কুষ্ঠরোগীদের যত্নের মাঝে থাকে একজন মানুষের সব কিছু—যার দ্বারা সে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আর্থিক নিশ্চয়তা পায়।

কিভাবে ছড়ায়

বিজ্ঞানীরা এখনো শতভাগ নিশ্চিত নন কিভাবে এটি ছড়ায়। এ নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান, তবে আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, থুতু, লালা, নাক থেকে নিঃসৃত পানি ইত্যাদির দ্বারা।

রোগীর সঙ্গে হাত মেলালে বা কোলাকুলি করলে, পাশাপাশি বসলে বা বসে থাকলে এবং পাশাপাশি বসে খাওয়াদাওয়া করলে কুষ্ঠ সংক্রমিত হওয়ার ভয় নেই।

আক্রান্ত মায়ের থেকে বাচ্চার মাঝে এই রোগ ছড়ায় না। দৈহিক মিলনের ফলে হয় না। খুবই ধীরগতিতে এই রোগের জীবাণু আমাদের শরীরে লক্ষণ প্রকাশ শুরু করে বলে বোঝা মুশকিল হয়ে যায় জীবাণুর উৎস আসলে কোথায়।

আমাদের দেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে আসলে এসব এড়িয়ে চলাও মুশকিল। কারণ যে আক্রান্ত সে নিজেই বুঝতে দেরি করে তার মাঝের পরিবর্তনগুলো। তাই বাইরে চলাফেরার সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবহার করা অতি উত্তম। ব্যক্তির স্বভাবও পরিবর্তন জরুরি। হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা সবার জন্যই নিরাপদ।

ঝুঁকিপূর্ণ দেশ কোনগুলো?

এটি জানা এ কারণেই প্রয়োজন, নয়তো রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলেও সচেতনতার অভাবে হারিয়ে যেতে পারে রোগীর হিসাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বছরে এক হাজারের বেশি নতুন রোগীর সন্ধান পাওয়া দেশগুলোর নাম হলো—আফ্রিকা, কঙ্গো, ইথিওপিয়া, মাদাগাস্কার, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া, আমেরিকা ও ব্রাজিল। এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, এর মধ্যে ২০ লাখ মানুষ এই রোগের কারণে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে ।

সঠিক চিকিৎসা না পেলে কী কী ক্ষতি হতে পারে?

হাত ও পায়ের শক্তি চলে গিয়ে অচল হয়ে যাওয়া, হাত-পায়ের আঙুল ছোট হয়ে যাওয়া, দীর্ঘমেয়াদি ঘা হওয়া, অন্ধত্ব, চোখের ভ্রু ও পাপড়ি পড়ে যাওয়া, নাকের বিকৃতি ইত্যাদি।

রোগ দূরীকরণের বড় সমস্যা কী কী?

ঘনবসতি, খাদ্যমান বৃদ্ধিকরণ, দক্ষ জনবলের অভাবে মানসম্পন্ন সেবা ব্যাহত হয়, শারীরিক ও আর্থিক কারণে অনেক রোগীই একটি স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস না করা, ফলে হারিয়ে যাওয়া, সামাজিক দৃষ্টিকোণের উন্নতি না হওয়া, পুনর্বাসনের অভাব, কিছু ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি সামঞ্জস্যতার অভাব ইত্যাদি।

আশার কথা হলো, বর্তমান সরকার এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে এরই মধ্যে অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে কুষ্ঠমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা আশা করতে পারি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ব্লাড ট্রান্সফিউশন, শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা