kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বিশ্ব আদালতের আদেশ ও রোহিঙ্গা মানবতার বিজয়ের সূচনা

মো. জাকির হোসেন

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



বিশ্ব আদালতের আদেশ ও রোহিঙ্গা মানবতার বিজয়ের সূচনা

হৃদয়ের গহিনে নিঃস্বার্থ ভালোবাসাদের বসতবাড়ি যেখানে, অন্তরের সেই অন্তস্তল থেকে অভিবাদন গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রী Abubacarr M. Tambadou আপনাকে। নির্যাতিত রোহিঙ্গা মানবতার পক্ষে মিয়ানমারের গণহত্যার বিষয়টি ছোট দেশের নাগরিক হয়েও বুক চিতিয়ে বড় সাহসিকতার সঙ্গে বিশ্ব আদালতে তুলে ধরেছেন। ভূলুণ্ঠিত রোহিঙ্গা মানবতার জয়ের সূচনায় সাহসী সত্য উচ্চারণের জন্য অভিবাদন সোমালিয়ার নাগরিক আন্তর্জাতিক আদালতের সভাপতি আবদুল কাভি আহমেদ ইউসুফ ও তাঁর সহযোদ্ধা বিচারকদের। অভিবাদন বাংলাদেশ সরকারকেও। বিশ্ব আদালতে মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করানোর নেপথ্যে বাংলাদেশের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। আঞ্চলিক রাজনীতি ও বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ সরাসরি মামলা না করে ওআইসিতে প্রস্তাব পাস করিয়ে গাম্বিয়াকে দিয়ে মামলা করিয়েছে। মিয়ানমারের এই জবাবদিহি উদ্যোগে বাংলাদেশের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো নৃশংসতম অপরাধ সংঘটিত করার পরও বিশ্বজনমতকে উপেক্ষা করার ধৃষ্টতা দেখানো মিয়ানমারের জন্য এই রায় নিঃসন্দেহে এক চপেটাঘাত। আর মৃত্যুশয্যায় ধুঁকতে থাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের স্বপ্নদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও সঞ্জীবনী সুধা আন্তর্জাতিক আদালতের এই অন্তর্বর্তী আদেশ। আদালত তাঁর আদেশে যেসব বিষয় বলেছেন তা হলো—এক. রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে তথা জাতিসংঘ গণহত্যা চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধগুলো রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত হওয়া ঠেকাতে মিয়ানমারকে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। দুই. মিয়ানমার নিশ্চিত করবে যে তার সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি অন্য কোনো অনিয়মিত সশস্ত্র ইউনিট রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের গণহত্যা করবে না বা গণহত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে না। তিন. গণহত্যা চুক্তির আওতায় বর্ণিত অপরাধগুলোর তথ্য-প্রমাণ বিনষ্ট না করতে এবং সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চার. অন্তর্বর্তী আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে আগামী চার মাসের মধ্যে আদালতকে মিয়ানমারের জানাতে হবে। এরপর জেনোসাইডের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারকে প্রতি ছয় মাস অন্তর আদালতে অন্তর্বর্তী আদেশ পালন বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের মধ্যে রোহিঙ্গা মানবতার মুক্তির যেসব বিষয় লক্ষণীয় তা হলো—এক. আন্তর্জাতিক আদালতের ১৫ জন নিয়মিত বিচারক ও মামলার দুই পক্ষ গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের নিয়োগকৃত দুজন অ্যাডহক বিচারক—মোট ১৭ জন বিচারকই সর্বসম্মতভাবে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তার মানে, মিয়ানমারের নিয়োগকৃত বিচারকও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। অন্তর্বর্তী আদেশের সঙ্গে সব বিচারক একমত পোষণ করলেও Vice President XUE, Judge CANCADO TRINDADE এবং Judge adhoc KRESS আদেশের সঙ্গে আলাদা যুক্তি সংযুক্ত করেছেন। দুই. মিয়ানমার বারবার অস্বীকার করে আসছে, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী’ বলতে কিছু নেই। আন্তর্জাতিক আদালত বলেছেন, গণহত্যা চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গারা সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য। আদালত সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, আদালতের দৃষ্টিতে গণহত্যা চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গারা সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গণহত্যা চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো জাতি, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, জাতি-গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায় সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য বলে স্বীকৃত। তার মানে, রোহিঙ্গারা আদালতের সর্বসম্মত আদেশে মিয়ানমারে বসবাসকারী একটি গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়, যারা গণহত্যা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার দাবিদার। তিন. আদালতের আদেশে বলা হয়নি যে মিয়ানমারে গণহত্যা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশে গণহত্যা হয়েছে, এটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। গণহত্যার অপরাধগুলোর তথ্য-প্রমাণ বিনষ্ট না করতে এবং সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারে গণহত্যা হচ্ছে এবং অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা গণহত্যার প্রবল ঝুঁকিতে আছে বলে গাম্বিয়ার অভিযোগ এবং জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনসহ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার পরিষদের এসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো আদালত আমলে নিয়েছেন। চার. মিয়ানমার সরকার গত ডিসেম্বরে মামলার শুনানির সময় তার দেশে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ সুরাহা করার বিষয়ে যে আশ্বাস দিয়েছে, আদালত ওই সব উদ্যোগকে অপর্যাপ্ত বলে আদেশ দিয়েছেন। আদালতে যুক্তি-তর্ক, তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের পাশাপাশি ফিলিপাইনের সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাপানি রাষ্ট্রদূতের সমন্বয়ে তথাকথিত স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে এবং তদন্ত কমিটির সাজানো প্রতিবেদনে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে, গণহত্যা হয়নি বলে আদালতের আদেশকে প্রভাবিত করার অপকৌশল অবলম্বন করলেও আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশকে প্রভাবিত করা যায়নি। পাঁচ. শুনানিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে বলে জানিয়েছিল। মিয়ানমার আরো বলেছিল, রাখাইন রাজ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আদালত তাঁর আদেশে বলেছেন, প্রত্যাবাসন ও সুরক্ষায় মিয়ানমারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় এবং মিয়ানমারের এসব আশ্বাস রোহিঙ্গাদের গণহত্যার অপূরণীয় ক্ষতির ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় যথেষ্ট নয়। ছয়. আদালত অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বরং মিয়ানমারকে আদালতে ‘ব্যাক টু ব্যাক’ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রতিরোধে আদালতের দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের পর যে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে তা হলো, মিয়ানমার আদালতের নির্দেশ পালন করবে কি না এবং রোহিঙ্গারা ফেরত যাবে কি না? আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের সংবিধি অনুযায়ী আদালতের আদেশ মানতে সব পক্ষই আইনত বাধ্য। জাতিসংঘের গণহত্যা কনভেনশনের ৪১ অনুচ্ছেদের আওতায় আদালতের আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিরাপত্তা পরিষদে চলে যাবে। জাতিসংঘের মহাসচিব ঘোষণা দিয়েছেন, দ্রুততার সঙ্গে তিনি আদেশ নিরাপত্তা পরিষদে প্রেরণ করবেন। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদই আদালতের হাতিয়ার। সামনের দিনগুলোতে নিরাপত্তা পরিষদ যদি এ বিষয়ে নির্বিকার থাকে, তাহলে সেটি কার্যত সমগ্র জাতিসংঘ ব্যবস্থা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হবে। নিরাপত্তা পরিষদ আদালতের আদেশ মানতে কী ব্যবস্থা নেবে, সেটি একান্তই নিরাপত্তা পরিষদের ব্যাপার। তবে জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদ আলাপ-আলোচনা, নানা রকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ, এমনকি রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। মিয়ানমার মূলত প্রত্যক্ষভাবে চীন ও রাশিয়া এবং পরোক্ষভাবে ভারতসহ কয়েকটি দেশের নীরব সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে নিরাপত্তার অজুহাত তুলে রোহিঙ্গাদের প্রতি নৃশংসতাকে তথা গণহত্যাকে গ্রহণযোগ্য বলে সাফাই গেয়েছে। মিয়ানমারের পক্ষের দেশগুলো তার গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি। উপরন্তু জাতিসংঘে ভেটো দিয়েছে কিংবা ভোটদানে বিরত থেকে পরোক্ষভাবে মিয়ানমারকে সহায়তা জুগিয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালত যেসব নির্দেশ দিয়েছেন, সেসব গণহত্যা সম্পর্কিত। এতে দেশটির অস্বীকার সত্ত্বেও গণহত্যার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। গণহত্যার মতো একটি জঘন্য অপরাধে সংশ্লিষ্টতার বিষয় বিশ্ব আদালতে উচ্চারিত হওয়ার পরও এসব দেশ মিয়ানমারের আচরণে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আগের মতো নিঃশর্ত সমর্থন জোগাবে না বলে আশা করা যায়। কয়েক বছরের মধ্যে চীন বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে। সম্ভাব্য বিশ্বনেতৃত্ব দানকারী রাষ্ট্র গণহত্যাকারী রাষ্ট্রকে শর্তহীন সমর্থন জোগাবে কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আদালত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর অপরাধকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মিয়ানমারকে নিঃশর্ত সমর্থন জুগিয়ে এই স্বীকৃত গণহত্যার অপরাধের দায় চীন নিতে চাইবে না।

আদালতের আদেশ অমান্যকারী রাষ্ট্রের সংখ্যা খুবই কম। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিকারাগুয়ার পক্ষে দেওয়া রায়কে অমান্য করেছিল। ১৯৭৩ সালে ‘পারমাণবিক পরীক্ষা’ মামলায় আইসিজের দেওয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করেছিল ফ্রান্স। ১৯৪৯ সালে করফু চ্যানেল মামলার রায় অমান্য করেছিল আলবেনিয়া, যে রায় ছিল যুক্তরাজ্যের পক্ষে। রায়ের খেলাপ শুধু আন্তর্জাতিক আইনের খেলাপই নয়, জাতিসংঘ সনদেরও খেলাপ বিধায় রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আদালতের রায় শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়। আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশ-নির্দেশ তথা রায় মেনে চলার ক্ষেত্রে যে দুটি বিষয় প্রণোদনা বা প্রেরণা হিসেবে কাজ করে তা হলো—রায় মানতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ, আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে উপস্থিতি ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সমুন্নত রেখে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ। ২০০২ সালে নাইজেরিয়া ও ক্যামেরনের মধ্যে সীমান্তবিরোধ মামলায় নাইজেরিয়া রায় মানতে অস্বীকার করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক চাপে রায় মানতে বাধ্য হয়। ১৯৯৪ সালে আফ্রিকার রাষ্ট্র লিবিয়া ও চাদের মধ্যে Aouzou Strip নামে এক খণ্ড জমি নিয়ে বিরোধে লিবিয়া আদালতের রায় মানতে অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের কাছে তার এ অস্বীকারের ফলাফল বিবেচনায় রায় মেনে নেয়। ১৯৯২ সালে এল সালভাদর ও হন্ডুরাস তাদের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে রায় মেনে নেয় আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রেরণায়। ২০০২ সালে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে একটি দ্বীপ নিয়ে বিরোধ, রাষ্ট্রদূত নিয়ে বেলজিয়াম-কঙ্গো বিরোধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংগঠনের প্রচেষ্টায় মেনে নেয়। ১৯৯৬ সালে বসনিয়া ও সার্বিয়ার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত আদেশ দেন যে গণহত্যা বন্ধে সার্বিয়া ব্যর্থ হয়েছে এবং গণহত্যায় অভিযুক্তদের শাস্তিদানে ব্যর্থতার কারণে সার্বিয়া গণহত্যা চুক্তির আওতায় তার দায়দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছে। আন্তর্জাতিক আদালত যুদ্ধকালীন নেতা Radovan Karadzic ও মিলিটারি কমান্ডার Ratko Mladic-কে আটক করে জাতিসংঘ ট্রাইব্যুনালের কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ দুজনকে আটক করে হস্তান্তর না করা পর্যন্ত ইউনিয়নে সার্বিয়ার অন্তর্ভুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। সার্বিয়া তার ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করে এ দুজনকে আটক করে ট্রাইব্যুনালের কাছে হস্তান্তর করে।

আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশ অনুযায়ী মিয়ানমার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন হবে না, ফিরিয়ে নিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত শিবিরে আটক রাখা হবে না, রাখাইনে বা অন্য কোথাও তাদের জমিজমা ফেরত দেওয়া হবে—এমন নিশ্চয়তা পেলে রোহিঙ্গারা ফেরত যাবে নিশ্চিত করেই বলা যায়। আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশ মেনে চলার ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হবে অদূর ভবিষ্যতে। ইউরোপের ২৮টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) এক বিবৃতিতে আদালতের আদেশকে আমলে নিয়েছে। ইইউ বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মিয়ানমারকে আদালতের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা সংক্রান্ত আদেশ মেনে চলতে হবে। মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের পাশাপাশি সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইইউ আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট, সংক্ষেপে আইসিসি) নির্দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের তদন্তের দিকেও দৃষ্টি রাখছে। ইইউ ছাড়াও জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইডেনসহ অনেক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংগঠন আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশ অনুযায়ী মিয়ানমারকে ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছে।

এ আদেশের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি হবে। এত দিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে রাখাইনে গণহত্যা, গণনিষ্ঠুরতার বিষয়টি মিয়ানমার অস্বীকার করেছে; কিন্তু এ আদেশের পর মিয়ানমারের সামনে অপরাধ অস্বীকার করার সুযোগ আর থাকল না। মিয়ানমার কী করবে সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি। মিয়ানমার কোনো ব্যবস্থা না নিলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশে অপেক্ষমাণ রাখাটাই গণহত্যার হুমকি নিশ্চিত করে। বিশ্ব আদালতের আদেশ রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় বড় অগ্রগতি এবং প্রকারান্তরে পদদলিত রোহিঙ্গা মানবতার বিজয়ের সূচনা।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা