kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

পাকিস্তানের বিপক্ষে জেতা সম্ভব

ইকরামউজ্জমান

২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পাকিস্তানের বিপক্ষে জেতা সম্ভব

তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার জন্য আমাদের ক্রিকেট দল এখন পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থান করছে। চলতি মাসের ২৪, ২৫ ও ২৭ তারিখে যথাক্রমে তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। দেশে বঙ্গবন্ধু বিপিএল খেলেই ক্রিকেটাররা পাকিস্তানে খেলতে গেছেন। অর্থাৎ একটি লম্বা সময় ধরে তাঁরা খেলার মধ্যেই ছিলেন। ১৫ জনের স্কোয়াডে সবাই যে বিপিএলে আগাগোড়া দারুণ ফর্ম এবং ছন্দে ছিলেন ব্যাটে-বলে তা নয়, নির্বাচকরা বিভিন্ন ধরনের চিন্তা মাথায় রেখে অভিজ্ঞ পারফরমারদের নিয়েই স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন। একেবারে নতুন মুখ হিসেবে সংযুক্ত হয়েছেন ২০ বছর বয়স্ক গতিময় পেসার হাসান মাহমুদ। হাসান সদ্যঃসমাপ্ত বঙ্গবন্ধু বিপিএলে ঘণ্টায় ১৪২.৪০ কিলোমিটার বল করেছেন। উইকেট নিয়েছেন ৩ ম্যাচে ১০টি। নির্বাচকরা হাসানের মধ্যে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করার ইঙ্গিত লক্ষণ করেছেন বলেই তাঁকে বিবেচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর ফিটনেস চমৎকার।

পাকিস্তানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে টিম ম্যানেজমেন্ট। ৯ মাসের মধ্যে বিশ্ব টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে অস্ট্রেলিয়ায়। বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে একটি ভারসাম্যময় শক্তিশালী দল সেট করতে হবে। আর এর জন্য ব্যাটিংয়ে কাকে কোথায় সেট, বোলিংয়ে অবস্থান ঠিক করা (অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে স্বাভাবিকভাবেই পেসারদের গুরুত্ব থাকবে), ফিল্ডিংয়ে দুর্বলতাগুলো নির্ণয় করে সংশোধনের চেষ্টা—এসব কাজ করার সুযোগ আছে পাকিস্তান সফরে। চিন্তার জগতে হেরফের হলে সুযোগ আছে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আরো কিছু নতুন খেলোয়াড়কে যাচাই করে দেখার।

তাই খেলোয়াড়দের সামর্থ্য, আত্মবিশ্বাস, মানসিক শক্তি, সাহস, স্কিল, জয়ের জন্য ক্ষুধা, নিজের ওপর আস্থা এবং দায়িত্বশীল আচরণের বড় পরীক্ষা দিতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই বাড়ছে। টি-টোয়েন্টিতে আরো বেশি। এই সংস্করণে দলের চাহিদা মেটানোটাই আসল। ভারতের দিকে তাকালে দেখব বিরাট কোহলির টি-টোয়েন্টি দলে বর্তমানে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। একসময়ের অধিনায়ক, অপরিহার্য খেলোয়াড়দের স্থান দখল করে নিয়েছেন সামর্থ্য প্রদর্শন করে তরুণ খেলোয়াড়রা। টিম ম্যানেজমেন্ট যা চায় তা তাঁরা দিতে পারছেন। ক্রিকেটে আবেগ সাময়িক। দলের জন্য পারফরম্যান্সই শেষ কথা।

সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম নিরাপত্তাজনিত ব্যক্তিগত কারণে পাকিস্তান যাবেন না জানিয়েছেন। সাকিব আল হাসান গত নভেম্বর থেকে নিষিদ্ধ আছেন। এই দুজন নির্ভরযোগ্য পারফরমারের অনুপস্থিতিতে দল খেলবে, এটিই জাগতিক নিয়ম। লক্ষ্য হবে শূন্যস্থান পূরণের সর্বাত্মক চেষ্টা। তা ছাড়া সব সময় তো এঁরা থাকবেন না। এটিও সুযোগ অন্য ক্রিকেটারদের জন্য নিজেকে তুলে ধরার। ইতিবাচক মানসিকতা পারে চ্যালেঞ্জ জয় করতে। দলের খেলায় সবাই মিলে যাঁর যাঁর অবস্থান থেকেই তো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।

পাকিস্তান বাবর আজমের নেতৃত্বে তরুণ খেলোয়াড়দের প্রাধান্য দিয়ে টি-টোয়েন্টি স্কোয়াড ঘোষণা করেছে। তবে এই স্কোয়াডে আছেন শোয়েব মালিক ও মোহাম্মদ হাফিজ, যাঁদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। এই দুজন ক্রিকেটার দলের অধিনায়ক ও অন্য খেলোয়াড়দের সব সময় উপদেশ দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন। পাকিস্তানও টি-টোয়েন্টি চূড়ান্ত দল সেট করার প্রক্রিয়ায় কাজ করছে। টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিংয়ে পাকিস্তান ১ নম্বরে আর বাংলাদেশ ৯-এ অবস্থান করছে।

দুই দেশের মধ্যে টি-টোয়েন্টি পরিসংখ্যানে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। বর্তমানে পাকিস্তান ক্রিকেট অনেক বেশি উজ্জীবিত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আবার দেশে ফিরে এসেছে। ক্রিকেট রসিকমাত্রই আনন্দিত এবং উচ্ছ্বসিত।

বাংলাদেশ দল অন্য যেকোনোবারের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞতায় (মুশফিক ও সাকিব না থাকা সত্ত্বেও) সমৃদ্ধ। খেলার মধ্যে থেকেই খেলোয়াড়রা খেলতে গেছেন। অতএব এত তাড়াতাড়ি ফর্ম হারিয়ে ফেলার কথা নয়। বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে ভালো দল। টি-টোয়েন্টিতেও অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে। আশা করছি, মাহমুদ উল্লাহর নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এর জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, সাহস, ইতিবাচক মানসিকতা এবং নিজের সামর্থ্য সময়মতো নিংড়ে দেওয়া। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম সংস্করণ টি-টোয়েন্টি। এই ক্রিকেটে নির্দিষ্ট দিনে যারা ভালো খেলবে, খেলার মধ্যে থাকবে তারাই জিতবে। বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা এবার অনেক বেশি চিন্তাশীল, ক্রিকেট ছাড়া এখন আর তাঁদের ভাবনায় অন্য কিছুর স্থান নেই। ক্রিকেটাররা জানেন, গত বছর নিজের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তান হেরেছে ৩-০ ব্যবধানে। সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি আর জয়ের মানসিকতা নিয়ে লড়াইয়ে অনেক কিছুই সম্ভব হয়। ক্রিকেটকে আগাম চেনা মুশকিল, এটিই খেলার সৌন্দর্য।

পাকিস্তানে ক্রিকেট দলের সফরকে ঘিরে অনেক জল ঘোলা করা হয়েছে। উভয় পক্ষের বিভিন্ন ধরনের ভুল-বোঝাবুঝি, আগাম কথাবার্তা বলা এবং স্ববিরোধিতা এর কারণ।

ক্রীড়াবান্ধব বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কোনো দেশের বৈরী সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক এবং দ্বিপক্ষীয় খেলার আয়োজনে সবাই অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদরা বিভিন্ন দেশে গিয়ে অংশ নিচ্ছেন। খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেই পাঠানো হয়। বাংলাদেশ কারো চাপে বা বিরোধিতায় কখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে। খেলাধুলার সঙ্গে যে কূটনীতিক এবং সহযোগিতার বিষয়টি জড়িয়ে আছে, বাংলাদেশ সেটিকে প্রথম থেকেই সম্মান করেছে। কখনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া রাজনীতিতে জড়ায়নি। এর আগেও বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ থেকে ক্রিকেট দল, এমনকি নারী ক্রিকেট দল দ্বিপক্ষীয় এবং আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট পাকিস্তানে খেলতে গেছে। খেলতে গেছে অন্যান্য খেলার দলগুলো—নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই সরকার অনুমতি দিয়েছে। সরকারের নৈতিক দায়িত্ব খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা। আর এ বিষয়টি শুধু পাকিস্তান নয়, সব দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

প্রথম অবস্থায় পাকিস্তানে তিনটি টি-টোয়েন্টি এবং দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলার (টেস্ট ম্যাচ দুটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের। এটি আইসিসির ইভেন্ট, এখানে পয়েন্টের বিষয়টি আছে) কথা ছিল। বাংলাদেশ প্রথম থেকেই বলেছে টি-টোয়েন্টির পর টেস্ট দুটি হোক নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। বিষয়টি যেহেতু অনেক দিনের। পাকিস্তানের বক্তব্য হলো, টেস্ট ম্যাচ হবে তাদের দেশে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কা পাকিস্তানে খেলে গেছে এবং নিরাপত্তার বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তা ছাড়া নিরাপত্তাজনিত সমস্যা নেই বলেই আইসিসি ম্যাচ অফিশিয়াল এবং আম্পায়ার ডেপুট করছে।

বাংলাদেশ থেকে নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি দল পাকিস্তান গেছে। তারা দেশে ফিরে এসে সরকার এবং ক্রিকেট বোর্ডের কাছে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছে। পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে সমস্যা নেই বলেই প্রতিবেদন দিয়েছে। এই দুটি প্রতিবেদন পাওয়ার পর ক্রিকেট বোর্ড সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে বসেছে। সরকার সফরের বিষয়ে সবুজ সংকেত দিয়েছে। তবে বলা হয়েছে, সফর যাতে কখনো দীর্ঘ না হয়। সংক্ষিপ্ত সফরই কাম্য।

এরপর কিছু ঘটনা ঘটেছে। দুবাইয়ে আইসিসি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উভয় দেশের বোর্ডপ্রধান বৈঠকে বসেছেন—উভয় দেশ নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরেছে। এখন যেটি দাঁড়িয়েছে, লাহোরে তিনটি টি-টোয়েন্টি শেষ করার পরপরই বাংলাদেশ দল দেশে ফিরে আসবে। এরপর যাবে ৭ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম টেস্ট খেলতে। টেস্ট শেষ হলে আবার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসবে। এরপর তৃতীয়বারের মতো যাবে করাচিতে, সেখানে গিয়ে প্রথম ৩ এপ্রিল একটি ওয়ানডে খেলবে আর ৫ থেকে ৯ এপ্রিল খেলবে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ। পাকিস্তানে পিসিএল অনুষ্ঠিত হবে ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ মার্চ। তাই মধ্য মার্চে টেস্ট ম্যাচ সম্ভব নয়। এদিকে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশেরও কিছু খেলোয়াড়ের পাকিস্তান গিয়ে খেলার সম্ভাবনা আছে। ২৩ জন ক্রিকেটার ফ্রাঞ্চাইজি নিয়ে খেলার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।

খেলোয়াড়রা কেউ কেউ সাধারণত নিজস্ব সংস্করণের খেলা খেলে দেশে ফিরে আসেন। অন্য সংস্করণের খেলোয়াড়রা তখন দলে যোগ দেন। এবার শুধু তাঁরা একবারই যাবেন। বিদেশে অনেক দিন থাকতে হবে না।

ক্রিকেট বোর্ড পাকিস্তানে গিয়ে খেলার বিষয়ে কোনো ধরনের জোরাজুরি করেনি। একজন খেলোয়াড় (মুশফিক) যেতে অপারগতার কথা জানিয়েছেন। সাপোর্টিং স্টাফদের মধ্যে কেউ কেউ যেতে রাজি হননি, তাঁদের বিকল্প অন্যরা গেছেন।

জয় হোক সুস্থ জীবনবোধের। জয় হোক খেলার মহত্ত্ব এবং আবেদনের।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা