kalerkantho

বুধবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ১ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

উনসত্তরের গণ-আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান

তোফায়েল আহমেদ

২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উনসত্তরের গণ-আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান

প্রত্যেক মানুষের জীবনে উজ্জ্বল কিছু দিন আছে। আমি দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী। আমার জীবনেও কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা আছে। ১৯৬৯ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কালপর্ব। সেই কালপর্বে আইয়ুবের লৌহ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সর্বব্যাপী গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করে। আসাদ, মতিউর, মকবুল, রুস্তম, আলমগীরসহ অনেক শহীদের রক্তের বিনিময়ে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। এই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।

উনসত্তরের সোনালি দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তের কথা মনে পড়ে। অনেক সময় ভাবি, কী করে এটা সম্ভবপর হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা দেন আমি তখন ইকবাল হলের ভিপি। ইকবাল হলে বসেই ছয় দফার পক্ষে আমরা আন্দোলনের পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আমার কক্ষ নম্বর ছিল ৩১৩। এই কক্ষে প্রায়ই থাকতেন শ্রদ্ধেয় নেতা শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক। ছয় দফা দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেছিলেন, ‘সাঁকো দিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ অর্থাৎ এই ছয় দফার সিঁড়ি বেয়ে তিনি স্বাধীনতায় পৌঁছবেন। ছয় দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু দেশব্যাপী ঝটিকা সফর করে ৩২টি জনসভা করেন এবং বিভিন্ন জেলায় বারবার গ্রেপ্তার হন। শেষবার নারায়ণগঞ্জ থেকে সভা করে ঢাকায় আসার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আমরা সর্বাত্মক হরতাল পালন করেছিলাম। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে কারামুক্তি দিয়ে জেলগেটেই আবার গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে আমরা জানতাম না প্রিয় নেতা কোথায় কিভাবে আছেন। আমরা জাগ্রত ছাত্রসমাজ এই গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে মিছিল করি। আমার সৌভাগ্য, ওই দিনই ডাকসুর ভিপি হয়েছিলাম। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন আগরতলা মামলার বিচার যেদিন শুরু হয়, সেদিন থেকে আমরা জানতাম আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুদণ্ড দেবে। কারণ স্বৈরশাসক আইয়ুব খান উপলব্ধি করেছিল, সবাইকে বশে আনা যায় কিন্তু শেখ মুজিবকে বশে আনা যায় না। তাই আইয়ুব খান সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই একটি কণ্ঠকে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিতে হবে। কেননা একটি কণ্ঠে কোটি কোটি কণ্ঠ উচ্চারিত হয়। আইয়ুব খান প্রদত্ত মামলার নামই ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ডাকসুসহ চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ঐতিহাসিক ১১ দফার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। ডাকসু ভিপির কক্ষে বসেই আমরা ১১ দফার ভিত্তিতে গণ-আন্দোলনের পরিকল্পনা গ্রহণ করি। ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনের বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রথম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আমার সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গভর্নর মোনেম খাঁ ১৪৪ ধারা জারি করেছে। সভাপতি হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল সিদ্ধান্ত দেওয়ার যে আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙব কি ভাঙব না। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত জানিয়ে মিছিল নিয়ে রাজপথে এলাম। পুলিশ বাহিনী ক্ষিপ্রগতিতে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু করে বেপরোয়া লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ আর ফায়ারিং। ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুর রউফ ঘটনাস্থলে আহত হন। পরদিন ১৮ জানুয়ারি পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল এবং ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি দিই। ১৮ জানুয়ারি বটতলায় জমায়েত। যথারীতি আমি সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সফল ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সকালে বটতলায় ছাত্র জমায়েতের পর খণ্ড খণ্ড মিছিল এবং সহস্র কণ্ঠের উচ্চারণ, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, আইয়ুব খানের পতন চাই।’ সেদিনও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত এবং মিছিল নিয়ে রাজপথে এলাম। দাঙ্গা পুলিশ বেধড়ক লাঠিপেটা আর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করল। পরদিন ১৯ জানুয়ারি ছিল রবিবার। সে সময় রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকত। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় খোলা ছিল। কর্মসূচি নেওয়া হলো আমরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল শুরু করব এবং ১৪৪ ধারা ভাঙব। গত দুই দিনের চেয়ে মিছিল আরো বড়। পুলিশ গুলি চালাল। একজন ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ল রাজপথে। ছাত্রলীগের এই কর্মীর নাম আসাদুল হক। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাড়ি দিনাজপুর। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। পুলিশের বর্বরতা ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তাত্ক্ষণিকভাবে ২০ জানুয়ারি সোমবার আবারও বটতলায় সমাবেশের কর্মসূচি দিলাম। ২০ জানুয়ারি উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে মাইলফলক। এদিন ১১ দফার দাবিতে ঢাকাসহ প্রদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। ২১ জানুয়ারি পূর্বঘোষিত হরতালের কর্মসূচি পালনকালে চারদিক থেকে স্রোতের মতো মানুষের ঢল নামে পল্টন ময়দানে। ২২ জানুয়ারি ঢাকা নগরীতে আমি এমন কোনো বাঙালি দেখিনি, যার বুকে কালো ব্যাজ নেই। বাড়িতে, অফিসে—সর্বত্রই কালো পতাকা উড়ছে। একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া ঘৃণা প্রকাশের এই প্রতীকী প্রতিবাদ ছিল সর্বত্র। ২৩ জানুয়ারি শহরের সব অলিগলি থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয় মশাল মিছিল। ঢাকা পরিণত হয় মশালের নগরীতে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ২৪ জানুয়ারি সর্বাত্মক অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। সবার তখন একই প্রশ্ন, ‘শেখ মুজিব কবে মুক্তি পাবে?’ (তখনো তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি পাননি), ‘কবে আগরতলা মামলা তুলে নেওয়া হবে?’, ‘যদি সরকার না মানে তাহলে?’, ‘এমন সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে যেন আমরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাঁকে মুক্ত করে নিয়ে আসতে পারি’, ‘এখনই আমাদের তুমুল সংগ্রাম শুরু করা উচিত যেন আইয়ুবের পতন ঘটে’, ‘আইয়ুব-মোনেমের পতন না হলে শেখ মুজিব মুক্তি পাবে না’—ঢাকা শহরের সর্বত্র এ ধরনের আলোচনাই চলছিল। হরতালের পরও মিছিলের বিরাম নেই। ডাকসুর ভিপি হিসেবে আমার স্কন্ধে তখন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক, মুখপাত্র ও আহ্বায়কের দায়িত্ব। সমগ্র বাংলাদেশ সংগ্রামের বিস্ফোরণে প্রকম্পিত, অগ্নিগর্ভ। জনরোষ নিয়ন্ত্রণ করে নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রাখা যে কত কঠিন, সেদিন তা মর্মে মর্মে অনুভব করেছি। হরতাল চলাকালে একজন মন্ত্রীর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। কিছুক্ষণের মধ্যে ইপিআর ও পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে বিক্ষোভ দমনে। যেখানে-সেখানে গুলি চালাতে থাকে। সে গুলিতেই নিহত হয়ে শহীদদের তালিকায় যুক্ত হয় মতিউর, মকবুল, আনোয়ার, রুস্তম, মিলন, আলমগীরসহ আরো অনেক নাম। ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমানের লাশ নিয়ে আমরা পল্টনে যাই। তখনই শুনতে পাই মোনেম খাঁ শহরের নিয়ন্ত্রণভার ছেড়ে দেবে সেনাবাহিনীর হাতে এবং অচিরেই কারফিউ জারি হবে। আমরা পল্টন থেকে ইকবাল হলে এলাম মতিউরের লাশ নিয়ে। সেদিন শহীদ মতিউরের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দিইনি। ঢাকা শহরের বিবেক নড়ে উঠেছিল। কারফিউ কোথায়? রাজপথে বিক্ষুব্ধ মানুষের ভয়াল গর্জন আর সরকারি ভবনগুলো এবং দৈনিক পাকিস্তান, মর্নিং নিউজ ও পয়গাম পত্রিকা অফিস তখন আগুনে জ্বলছে। বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় আগরতলা মামলার প্রধান বিচারপতি এস রহমান, নবাব হাসান আসকারীর বাড়ি এবং রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধকারী খাজা শাহাবুদ্দীনসহ আরো কয়েক মন্ত্রীর বাসভবন। উনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি প্রবল গণ-আন্দোলন ও গণবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে ঢাকা নগরীর মানুষ রাজপথে নেমে এসে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত করল। বাংলাদেশে বহু আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি—সাত দিনে নিরস্ত্র বাঙালি জাতি এককাতারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঐতিহাসিক যে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল, তা আজও স্মৃতির পাতায় অম্লান। কারফিউয়ের মধ্যে এক দিনও থেমে থাকেনি আমাদের সংগ্রাম। দেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানি প্রশাসন বর্জন করেছে। কলকারখানা, অফিস-আদালত, সচিবালয়—সর্বত্র প্রশাসন ভেঙে পড়েছে। পুলিশ দ্বিধাগ্রস্ত। সরকারি কর্মকর্তারা জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য ধরনা দিতেন ইকবাল হলে। কিছুদিনের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দপ্তর তথা ইকবাল হলের ৩১৩ নম্বর কক্ষ। ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা ১১ দফার প্রতি ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবীসহ বাংলার সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিলাম।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা