kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর অপরিহার্যতা বাড়ছে

ড. হারুন রশীদ

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর অপরিহার্যতা বাড়ছে

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী বাঙালির জন্য অনন্য এক প্রাপ্তি। তিনি এমন এক নেতা, যিনি বাঙালিকে দিয়েছেন একটি দেশ, পতাকা ও মানচিত্র। একটি সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। তাইতো তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। কবির ভাষায় পুরুষোত্তম তুমি, জাতির পিতা। যতই দিন যাচ্ছে বাঙালির কাছে বঙ্গবন্ধুর অপরিহার্যতা আরো বাড়ছে। শতবর্ষে আরো উজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু। অসাধারণ নেতৃত্বগুণ ও অনুকরণযোগ্য জীবনযাপনের কারণে বঙ্গবন্ধুর মতো বিশ্ববরেণ্য নেতার অপরিহার্যতা দিন দিন বাড়ছে।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন স্বাধীনতার স্থপতি। তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বের গুণে তিনি শুধু বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবেই পরিগণিত হননি, নিজেকে তিনি নেতৃত্বের এমন এক সুমহান স্তরে সমাসীন করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে একাত্তরে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর নাম বলতে বলতেই দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন।

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে কারাবন্দি করে। কিন্তু কী আশ্চর্য বন্দি মুজিব আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। রণাঙ্গনে প্রতিজন যোদ্ধাই হয়ে উঠলেন একেকজন মুজিব। তাঁর নামেই পরিচালিত হলো মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অবশেষে বাঙালি পেল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতার জন্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে ধীরে ধীরে তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

দুই.

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পশ্চিম পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কারা অন্তরিন রাখা হয় বঙ্গবন্ধুকে। কিন্তু তাঁর নামেই পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। অবশেষে বাঙালি পায় তার বহুদিনের লালিত স্বপ্নের লাল-সবুজ পতাকা আর স্বাধীন মানচিত্র। অবশেষে পাকিস্তানি জান্তা স্বাধীন দেশের নেতাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (যাঁর নামে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে) স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তানের অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত পর পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে তাঁকে গ্রেপ্তার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে আটক রাখা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধের পর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতি বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর আগমন বাঙালি জাতির জন্য একটি বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে বাঙালি যখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি তখন পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। ২৯০ দিন পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুযন্ত্রণা শেষে লন্ডন-দিল্লি হয়ে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে ফেরেন বঙ্গবন্ধু।

তিন.

শোষক ও স্বেচ্ছাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে তিনি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেই স্বপ্ন তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। এ মুক্তির সংগ্রামে তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই প্রতিবাদী ছিলেন। সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন। সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে তিনি কখনো দূরে সরে যাননি। ভীতি ও অত্যাচারের মুখেও সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক। শোষিত মানুষের পক্ষে নির্ভীক অবস্থানের কারণে তিনি শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পান।

১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত, এক পক্ষে শোষক, আরেক পক্ষে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এই অবস্থান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়। বিশ্বের শোষিত-নির্যাতিত মানুষ বঙ্গবন্ধুকে গ্রহণ করে নেয় নিজেদের নেতা হিসেবে।

চার.

২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মগ্রহণের শততম বছর পূর্ণ হবে। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শেখ রেহানাসহ ১০২ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১০ জানুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা।

এটি অনন্য গৌরবের বিষয় যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে উদ্‌যাপন করার ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘের বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। গত ২৫ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেসকো সদর দপ্তরে সংস্থার ৪০তম সাধারণ পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে মুজিববর্ষ উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৪০তম সাধারণ অধিবেশনে সংস্থাটির সাধারণ পরিষদের সভাপতি আলতে সেনজাইজারের সভাপতিত্বে এবং ইউনেসকোর মহাপরিচালক মিজ অদ্রে আজুলে ও বিভিন্ন কমিটি এবং কমিশনের চেয়ারপারসনদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত প্লেনারি সেশনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ইউনেসকোর সঙ্গে যৌথভাবে উদ্যাপনের প্রস্তাবটি দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়।

মহান এই নেতার জন্মশতবার্ষিকী বাঙালি জাতিকে  দেবে নতুন এক দিশা। দেশাত্মবোধে নতুন করে উদ্বুদ্ধ হবে গোটা জাতি। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ প্রথমবারের মতো এই দিনটি শিশু দিবস হিসেবে সরকারিভাবে পালন করা হয়। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়নি। বস্তুত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর তাঁর নাম-নিশানা মুছে ফেলতে চেয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতাসীন হলে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনও আগের মতো যথাযথ মর্যাদায় উদ্যাপিত হয়ে আসছে। জাতির জনকের জন্মদিনটিকে শিশু দিবস হিসেবে পালন করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল আজকের শিশুই দেশের ভবিষ্যৎ। আগামী দিনে দেশ গড়ার নেতৃত্ব তাদের হাতেই। শিশুরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, মর্যাদা ও মহিমায় সমৃদ্ধ হোক—এটিই ছিল তাঁর একান্ত চাওয়া।

বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ছয় কোটিই শিশু। শিশুরা যাতে একটি সুষ্ঠু স্বাভাবিক উপায়ে বেড়ে উঠতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের ভবিষ্যতের সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠার সুযোগ করে দিতে হবে। তবেই বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন শিশু দিবস হিসেবে পালনের সার্থকতা।

বঙ্গবন্ধুর জীবন শিশুদের জন্য তো বটেই, সবার জন্যই এক শিক্ষণীয় বিষয়। তাঁর অপরিসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার জন্য আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি যেমন আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, তেমনি দেশের জন্য জীবন দিতেও কুণ্ঠা বোধ করেননি। তাই বাঙালি জাতি চিরকাল শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করবে। কবির ভাষায়, ‘যত দিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান, তত দিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা