kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ইরান এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে

গাজীউল হাসান খান

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইরান এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে

এক সর্বনাশা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ইরান। এ কাল রাহুর গ্রাস যেন কোনোমতেই কাটছে না ইরানের। বরং ক্রমে ক্রমে বিশ্বের এই প্রাচীনতম সভ্যতার অধিকারী ও সত্যিকার অর্থে প্রথম পরাশক্তি পারস্য বা আজকের ইরান আরো জটিল থেকে জটিলতর সমস্যায় জড়িয়ে যাচ্ছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪-৩৩১ সময়ে মেসিডোনিয়ার তরুণ সমর নায়ক আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কাছে পরাজিত হলেও পারস্যের শাসক সাইরাস দ্য গ্রেটের গড়ে তোলা মহান সাম্রাজ্য আবার সার্থকভাবে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল এই বীর জাতি। আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর সেনাপতি সেলুকস-১ শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেননি দারিয়ুস-৩-এর হারানো সাম্রাজ্য। শৌর্যবীর্য সভ্যতা ও আলোকিত ঐতিহ্য দিয়ে পারস্যবাসী (ইরানি) তাদের গড়ে তোলা জাতীয় পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্যকে কোনো দিনই ধুলায় বিলীন হতে দেয়নি। পারস্য ছিল বিশ্বের বুকে শক্তিধর রোম সাম্রাজ্যের চরমতম প্রতিদ্বন্দ্বী। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ থেকে বিশ্বের বুকে আজও ইরান মাথা উঁচু করে প্রায়ই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে চলেছে। ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস ও খিলাফতের (শাসন) পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যখন একে একে পশ্চিমা সামরিক জোট কিংবা মিত্রশক্তির কাছে নিজেদের অতীত গৌরব, ঐতিহ্য, শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে, ইরান তখনো (রেজা শাহ পাহলভির সময়) তার জাতীয় পরিচিতি, ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন পরিসরে অব্যাহতভাবে সংগ্রাম করে চলেছে, যা আজও আপসহীনভাবে চলমান রয়েছে। ইরানিরা তাদের জ্বালানি সম্পদ নিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি কিংবা পশ্চিমা সামরিক জোট নিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কখনো পিছু হটেনি। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে যে দুষ্টগ্রহের আবির্ভাব ঘটেছে, তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল নামের এক দখলদার রাষ্ট্রের ইহুদিবাদী অপশক্তি।

ইহুদিবাদী ইসরায়েলের দখল থেকে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের মুক্তি, অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ করা, ইরানের হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চক্রান্ত থেকে মুক্ত করে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করা এবং সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান বিভিন্ন সংকট নিরসন করে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিল। কিন্তু ইসরায়েলসহ পশ্চিমা শক্তির মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছে মানবিক কাজে ইরানের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি। এর পেছনে ছিল ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্ররোচনা। তাদের সন্দেহ ছিল, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির লক্ষ্যেই লোকচক্ষুর অন্তরালে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ করে যাচ্ছে। পশ্চিমা সামরিক শক্তি ও তাদের তাঁবেদার ইসরায়েল কোনোভাবেই ইরানের কোনো যুক্তিতর্ককে আমলে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাদেরই চাপে রাশিয়া ও চীন যুক্ত হয়েছিল ইরানকে তাদের অভিযুক্ত পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ থেকে দূরে রাখতে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের আণবিক শক্তি কমিশন (আইএইএ) বিশ্বের বিভিন্ন পরাশক্তি, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল যুক্তরাষ্ট্রে ওবামা প্রশাসনের শেষ প্রান্তে এসে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালের ২ এপ্রিল স্বাক্ষরিত সেই চুক্তিকে অগ্রাহ্য করার ঘোষণা দেন। তাঁর মতে, চুক্তির বিভিন্ন বিধি-নিষেধ ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। ট্রাম্পের সেই মতবিরোধ সৃষ্টি করার পেছনে কাজ করেছে ইহুদিবাদী ইসরায়েল। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান মুসলিম রাষ্ট্র সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাতও সেই চুক্তি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না।

ফলে ক্ষমতায় এসেই ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। শুধু তা-ই নয়, এক বিশাল কর্মসূচি নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের হয়ে মাঠে নামেন ট্রাম্প। লেবাননের হিজবুল্লাহ গেরিলা বাহিনী এবং ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার হামাস বাহিনীকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে ইরানকে তাদের মদদদানকারী দেশ বলে প্রচার করে ট্রাম্প প্রশাসন ও তার সহযোগী শক্তিগুলো।

তেমন একটি পরিস্থিতিতে পারমাণবিক চুক্তি, ইসরায়েলে হামলাকারীদের মদদদাতা এবং সিরিয়ায় সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষ, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে কেন্দ্র করে ক্রমে ক্রমে ইরানের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেই আবার হরমুজ প্রণালিতে কিছু সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়েছিল। ইসরায়েলের প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্র এসবকে কেন্দ্র করেই ইরানের বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে থাকে। সম্প্রতি নতুন কলেবরে এসেছে আরো কিছু নিষেধাজ্ঞা। এর ফলে ইরানের তেল রপ্তানি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে চরম চাপের মুখে পড়েছে ইরান। কর্মসংস্থানের অভাব এবং দারিদ্র্যের কারণে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে ইরানের তরুণ জনগোষ্ঠী। জীবন রক্ষাকারী ওষুধপত্র আমদানি করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে তাদের জন্য। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুতি গেরিলাদের সংঘর্ষ এবং সৌদি জ্বালানি ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্যও দায়ী করা হচ্ছে ইরানকে। শুধু সৌদি আরব নয়, বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে মিসর ও আরব আমিরাত। এ অবস্থায় প্রতিবেশী লেবানন, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করছিল ইরান। কিন্তু গত সপ্তাহে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের ‘কুদস বাহিনীর’ প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইরানের জন্য সম্পূর্ণ বিষয়টি এখন ভিন্ন খাতে চলে গেছে। ইসরায়েল প্রদত্ত ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে এ হত্যাকাণ্ডের আদেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়েছে প্রতিবেশী ইরাকের মাটিতে, যা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর বরখেলাপ। তা ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প সোলাইমানিকে হত্যা করার ব্যাপারে যে কারণ দেখিয়েছেন, তা এখন ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হচ্ছে। জেনারেল সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরাকে অবস্থিত অন্য কোনো পশ্চিমা দূতাবাসে হামলা চালাতে বাগদাদে যাননি। তিনি গিয়েছিলেন ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া ও ইয়েমেনে চলমান বিভিন্ন সংঘর্ষ ও সংকট নিরসনকল্পে আলাপ-আলোচনার জন্য। এ তথ্য রিয়াদ থেকে সৌদি রাজপরিবার সরবরাহ করেছে বলে জানা গেছে।

ইরানের জন্য জেনারেল সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের চেয়ে সর্বনাশা পরিস্থিতি ডেকে এনেছে তেহরান বিমানবন্দরের কাছে ভুলক্রমে ইউক্রেনের একটি বাণিজ্যিক বিমান ভূপাতিত করা। মার্কিন যুদ্ধবিমান সন্দেহ করে, ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডরা এ অপকর্মটি করেছে। এর বিরুদ্ধে ইরান যত ব্যবস্থাই নিক না কেন, তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভরত যুবসমাজকে কোনোমতেই থামানো যাচ্ছে না। তাদের যতই সুন্নি মতাবলম্বী বলে উল্লেখ করা হোক না কেন, বিক্ষোভকারীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ করা যায় না। এ ঘটনাকে উসকে দেওয়ার জন্য ফারসি ভাষায় টুইট বার্তা প্রচার করছেন ট্রাম্প। বলেছেন, তিনি গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে রয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা ইরানের ধর্মীয় নেতা আলী খামেনিকে স্বৈরাচারী বলে উল্লেখ করে তাঁর অপসারণ দাবি করেছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরান শাসন করার ম্যান্ডেট জনগণ আলী খামেনিকে দেয়নি। এ সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা এবং বিশেষ করে ইসরায়েল চায় ইরানে একটি সরকার পরিবর্তন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড এবং ইসলামী বিপ্লবকে তাদের বড় ভয়। কিন্তু ইরানে এখনো শিয়াপন্থী বিপ্লবী বা তার সমর্থকদের সংখ্যা অনেক বেশি। তবে ইরানে বিরাজমান সার্বিক পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত বিস্ফোরণোন্মুখ।

একদিকে চরম অর্থনৈতিক অবরোধ, অন্যদিকে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও উত্তেজনা ইরানকে বেসামাল করে তুলেছে। এ অবস্থায় পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির নয়া নিষেধাজ্ঞা জারির হুমকি ইরানকে অনেকটাই অস্থির করে তুলেছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ উঠিয়ে নেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্য চেয়েছিল। বলেছিল, পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরকারী ৫+১ (যুক্তরাষ্ট্র বাদে) যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করাতে না পারে, তবে ইরান তার স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত আর মানবে না। বর্ধিত পরিমাণে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজে ইরান হাত দেবে। এর বিরুদ্ধে এখন পাল্টা হুমকি এসেছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির কাছ থেকে। তারা ইরানকে চুক্তির শর্ত মেনে চলতে বলেছে নতুবা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা আসবে। তারা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও এ ব্যাপারে আলোচনা করবে বলে জানিয়েছে। ১৪ জানুয়ারি থেকে এ ব্যাপারে দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে ইরানকে। এ ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তা ছাড়া এ ক্ষেত্রে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁও তৎপর রয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তা ছাড়া এরই মধ্যে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের সঙ্গে মস্কোয় একটি বৈঠক হয়েছে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। বর্তমান অবস্থায় ইরান সরকার যদি টিকে যায় অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, তবে পারমাণবিক ক্ষেত্রে একটি নতুন চুক্তিও হতে পারে। কারণ ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবেন না। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্য ইরানে বহু কিছুই ঘটতে পারে। ইরানের পাশে এখন রাশিয়া ও চীন ছাড়া বিশেষ কেউ নেই। মানব ইতিহাসের এখন এক চরম ক্রান্তিকাল চলছে ইরানে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান কি তার অতীত গৌরব, ঐতিহ্য, বৈশিষ্ট্য এবং আলোকিত জাতিসত্তা নিয়ে আবার দাঁড়াতে সক্ষম হবে?

 

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক [email protected]mail.com

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা