kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

বঙ্গবন্ধু বিপিএলে প্রাপ্তি কম নয়

ইকরামউজ্জমান

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু বিপিএলে প্রাপ্তি কম নয়

মাঠে গড়ানোর আগে থেকেই সমালোচনা, বিভিন্ন ধরনের আশঙ্কা আর উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও এবারের বঙ্গবন্ধু বিপিএল আসর ছিল চিত্তাকর্ষক এবং ঘটনাবহুল। ক্রিকেটপ্রেমীরা খেলা উপভোগ করেছেন, টুর্নামেন্টে স্থানীয় খেলোয়াড়দের ভূমিকা ও অভিজ্ঞতা অন্য যেকোনোবারের চেয়ে ছিল ব্যতিক্রমী ও আশাব্যঞ্জক। এই ক্রিকেটে প্রাপ্তি ক্রমেই বাড়ছে। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হওয়ার মাধ্যমে তরুণ ক্রিকেটারদের জড়তা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হতে চলেছে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী স্মরণীয় করে রাখার জন্য বিসিবি এবার বিপিএল নিজেরাই আয়োজন করেছে, যেটি বিগত আসরগুলো থেকে বিভিন্নভাবে দৃশ্যমান পার্থক্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। অনেক ধরনের কথাবার্তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত জমজমাট ও চমৎকার একটি সফল টুর্নামেন্ট সমাপ্ত হয়েছে নতুন চ্যাম্পিয়ন (রাজশাহী রয়ালস) উপহার দেওয়ার মাধ্যমে। বিসিবি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী থেকে এই টুর্নামেন্ট সব সময় ক্রীড়াপ্রেমী জাতির পিতা ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ’ নামে অনুষ্ঠিত হবে। আর তাই বিসিবিকে এটি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জাতির পিতা নাম সম্পৃক্ত টুর্নামেন্ট কখনো প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত না হয়।

স্বাধীনতার পর একসময় দেশে ক্রিকেটের অস্তিত্বের বিষয়টি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল। বলা হয়েছে, ক্রিকেট ‘বুর্জোয়াদের’ খেলা। এটি বাংলাদেশে কাম্য নয়। এর বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংগঠক, খেলোয়াড় এবং ক্রিকেটপ্রেমী সর্বস্তরের মানুষ। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর শরণাপন্ন হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল। তিনি তখন আশ্বাস দিয়েছেন, এ দেশে ক্রিকেট ছিল, ক্রিকেট থাকবে। তিনি প্রতিনিধিদলকে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সত্বর দেখা করতে বলেন। ক্রিকেটের আকাশ থেকে মেঘ কেটে যায়। সেই ক্রিকেট এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের গৌরব এবং ইতিবাচক পরিচিতি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ ‘টেস্ট স্ট্যাটাস’ পেয়েছে ২০০০ সালের ৩০ জুন। ক্রিকেট এখন দল-মত-নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। বর্তমান ক্রিকেটপ্রেমী প্রজন্মের এই ইতিহাস জানার প্রয়োজন আছে। বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই স্বাধীন দেশে চেয়েছেন কিশোর ও তরুণসমাজকে ক্রীড়াঙ্গনে সম্পৃক্ত করে ধাপে ধাপে ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতি। আর এর জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি কয়েকটি উদ্যোগও নিয়েছেন।

প্রথমবারের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, বিপিএলে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী রয়ালস, যেটি আগেই উল্লেখ করেছি। দেশের ক্রিকেটের জন্য এটি ইতিবাচক। এর আগে উত্তরবঙ্গের রংপুর রাইডার্সও একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০১৯ বঙ্গবন্ধু বিপিএলের ফাইনালে লড়েছে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী রয়ালস এবং দক্ষিণবঙ্গের খুলনা টাইগার্স। উভয় দলই পদ্মার ওপারের। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে নিয়মিতভাবে খেলোয়াড় উঠে আসছেন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে।

উত্তরবঙ্গের রাজশাহী রয়ালসের শিরোপা বিজয় এ অঞ্চলের কিশোর ও তরুণদের ক্রিকেট চর্চার ক্ষেত্রে এখন বড় অনুপ্রেরণা। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ক্রিকেট চর্চাকে আরো উৎসাহিত এবং বেগবান করার জন্য প্রয়োজন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ‘ভেন্যু’ নিশ্চিতকরণ।  ভেন্যু বাড়লে ক্রিকেটের আকর্ষণ আরো বাড়বে, তরুণ খেলোয়াড়রা ক্রিকেটকে আঁকড়ে ধরবে, যেটি এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি কিছু বাস্তব সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে। এ বিষয়টির আশু সমাধানে কাজ করতে হবে বিসিবিকে।

এবারের উইকেট ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক ভালো। যার জন্য ভালো ক্রিকেট উপভোগ করেছি। ভালো ক্রিকেটবান্ধব উইকেট পাওয়ায় ব্যাটসম্যান ও বোলাররা যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। বোলিংয়ে পেসারদের পাশাপাশি স্পিনাররাও উইকেট থেকে সাহায্য পেয়েছেন। দক্ষতা, ইচ্ছাশক্তি, সাহস ও ইতিবাচক মানসিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। খেলতে হয় সব সময় খেলার চাহিদা পূরণের জন্য। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে। টি-টোয়েন্টি এমন একটি খেলা, যেখানে এক ওভার বা কয়েক বলে খেলার প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। পাল্টে যায় একটি ক্যাচ ‘মিসে’। ফাইনালে সবাই দেখলাম, রাজশাহী রয়ালসের অধিনায়ক আন্দ্রে রাসেল কিভাবে খেলকে নিজের দলের অনুকূলে নিয়ে গেলেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনেক সময় একজন ক্রিকেটার দলকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেন। বঙ্গবন্ধু বিপিএলেও বিদেশি ক্রিকেটারদের পাশাপাশি অনেক ম্যাচে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় ক্রিকেটাররাও দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এবার এই ভূমিকা বেশি চোখে পড়েছে।

এবারের বিপিএল পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, প্রাপ্তি কম নয় আমাদের ক্রিকেটে। দেশের ক্রিকেটাররা বিদেশি ক্রিকেটারদের পাশাপাশি সমান তালে অনেকেই লড়েছেন। যদি ব্যাটিংয়ের প্রথম ১০ জনের তালিকার দিকে তাকাই, দেখব স্থানীয় ক্রিকেটার সাতজন সেই তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। বোলিংয়ে সেরা দশে আছেন পাঁচজন। এবারকার বিপিএলে স্থানীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। ওপেনিং জুটিতে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভালো শুরু করতে হবে। প্রথম ছয় ওভারেই আঁচ করা সম্ভব হয় খেলা কোন দিকে এগোচ্ছে। ক্রিকেট অনিশ্চিত। টি-টোয়েন্টিতে এই অনিশ্চয়তা আরো বেশি। আর তাই অনেক সময় প্রথম দিকে খেলার অবস্থা দেখে শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে এটা বলা যায় না। এটিই ক্রিকেটের সৌন্দর্য। এবার মিডল অর্ডারে স্থানীয় ক্রিকেটারদের ভূমিকা নিয়ে কথা উঠেছে। সংগতভাবেই স্থানীয় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স নিয়েই এবার লক্ষ ছিল বেশি। ফর্মের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। চিহ্নিত খেলোয়াড়রা ভালো করেছেন কমবেশি, তবে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, ব্যাটিং ও বোলিংয়ে কিছু নতুন মুখ চোখে পড়েছে। এঁদের দিকে এখন তাকাতে হবে। জাতীয় দলের ক্রিকেটে পরিবর্তনের জোর হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ইতিবাচক এই পরিবর্তন স্বাগত জানানো উচিত।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা