kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমা বিকাশের সম্ভাবনা

সৈয়দ হাম্মাদুল করীম

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমা বিকাশের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে দেশটির বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে। এই বয়সটিই কাজ করার উপযুক্ত সময় এবং এই সময়কালে অর্থ উপার্জনের ক্ষমতা ও সুযোগ থাকে সর্বোচ্চ। এই সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে সুপরিকল্পিত আর্থিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা যেকোনো দুরারোগ্য ব্যাধি বা দুর্ঘটনা তাঁদের এই অমিত সম্ভাবনাময় জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। 

আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে বহুদূর। এই উন্নয়নের হাত ধরে আসা নানা ভালো দিকের মধ্যে একটি হচ্ছে, দেশের মানুষের গড় আয়ু, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছর। মানুষের জীবন যেহেতু দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তাই সে অনুসারে তাদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা না থাকায় দেশের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য রক্ষা ব্যয়ের শতকরা ৬৭ ভাগ নিজেকেই বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় সর্বোচ্চ। এতে ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও তাঁর পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্বাস্থ্য বীমা সম্পর্কে সচেতনতা প্রত্যেক মানুষের জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি আর্থিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের জিডিপিতে জীবন বীমা খাতের অবদান মাত্র ০.৫ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে যা খুবই নগণ্য। এর ফলে আমাদের দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে সব ধরনের বিকল্প থাকা সত্ত্বেও তারা বীমার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বেশ কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে বীমা সুবিধায় অন্তর্ভুক্তি হওয়া মানুষের সংখ্যা কম।

প্রথমত, জনগণের মাঝে বীমার উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব থাকায় আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি উপযোগী উপায় হিসেবে বীমাকে বিবেচনা করা হয় না। অনেক সময় গ্রাহকরা ব্যাংকিং ও বীমার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারেন না। দুটি খাতের প্রয়োগ ও সুবিধা যদিও ভিন্ন রকমের।

বীমা সম্পর্কে একটি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো, এটি একটি জটিল এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর কারণে অনেকে বীমার সঙ্গে যুক্ত হতে অনীহা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের মানুষকে বীমার আওতায় আনার জন্য সরকারের কাছ থেকে আমরা আশাব্যঞ্জক প্রতিশ্রুতি দেখছি। দেশের সব নাগরিককে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার দেশের বেশ কিছু জায়গায় একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত জনগণকে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। স্বাস্থ্য বীমা সংক্রান্ত বিভিন্ন উপাদান যুক্ত করার ফলে সরকারের গৃহীত ‘হেলথ ফর অল’ প্রকল্প আরো শক্তিশালী হচ্ছে। বর্তমানে গ্রাহকরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তা নিরসনে কাজ করছে এই খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে গ্রাহকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হচ্ছে, যা বীমা খাতে মানুষের অন্তর্ভুক্তি আরো বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে।  

বীমার আওতা বাড়াতে প্রযুক্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম ও চ্যানেলগুলোর জনপ্রিয়তার ফলে কম্পানিগুলো গ্রাহকদের নানা উদ্ভাবনী সেবা দিতে পারছে। নতুন নতুন চ্যানেল যুক্ত হওয়ার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বীমা সুবিধার আওতায় আসছে। গ্রাহকদের বীমা সুবিধা প্রদানের একটি সম্ভাবনাময় চ্যানেল হতে পারে ব্যাংক ইনস্যুরেন্স। কারণ বাংলাদেশে আর্থিক সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান চ্যানেল হচ্ছে ব্যাংক। 

আনন্দের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে বীমা খাত প্রসারে অনেকগুলো বিষয় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের উত্থান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন। দেশের মানুষের অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে একটি শক্তিশালী বীমা খাত।

 

লেখক : জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ মেটলাইফ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা