kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ইরান-মার্কিন যুদ্ধাবস্থার শেষ কোথায়

মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.)

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



ইরান-মার্কিন যুদ্ধাবস্থার শেষ কোথায়

৫ জানুয়ারি ২০২০। আমেরিকার নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেটের ফোর্ট ব্র্যাগ বিশেষ বিমানঘাঁটিতে সি-৫ ও সি-৭ ক্যাটাগরির দুটি বিশাল পরিবহন বিমানের সঙ্গে আরো দুটি বোয়িং কমার্শিয়াল বিমান দণ্ডায়মান। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় গ্লাসে আবৃত বিশাল শেডের মধ্যে আমেরিকার সবচেয়ে এলিট ফোর্স ৮২তম এয়ার বোর্ন ডিভিশনের পদাতিক ব্রিগেডের ছয়-সাত শ সেনার একটি দল যুদ্ধসাজে সজ্জিত হওয়ার ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে। আবার কেউ কেউ শেষ মুহূর্তে প্রিয়জনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যুদ্ধযাত্রার আগে শেষবিদায় নিচ্ছে। বিমানে উঠার পর থেকে আর কারো কাছে মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস থাকবে না। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক। ৩৪ কেজি ওজনের ব্যাকপ্যাক, যার ভেতর মোজা থেকে শুরু করে সুই-সুতা, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও ২১০ রাউন্ড গুলিসহ সব কিছুই আছে, যা একজন সৈনিকের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে আপাত প্রয়োজন মেটাবে। ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে বিমানের দিকে হাঁটতে হাঁটতেই একজন তরুণ সৈনিক, যিনি প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছেন, এক সঙ্গীর কাঁধে আমেরিকান স্টাইলে থাপ্পড় দিয়ে বলছেন, ‘হে আমরা যুদ্ধের জন্য যাচ্ছি।’ আরেকজনকে বলতে শোনা গেল, তিনি ফ্লোরিডায় নিজ বাড়িতে ছুটিতে থাকাকালে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন; কিন্তু ঘাঁটিতে ফেরার জরুরি বার্তা পেয়ে সব ফেলে চলে এসেছেন। এই সেনাদলের আপাত গন্তব্যস্থান কুয়েত। তার পরের স্থান অত্যন্ত গোপনীয়, কেউ জানে না। সাড়ে তিন হাজার নতুন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের যে ঘোষণা সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিয়েছেন, তারই অংশ হিসেবে এই সেনাদল যাত্রা করছে। সৈনিকের নামধাম গোপন রাখার শর্তে রয়টারের সাংবাদিক রিক মিকে যুদ্ধযাত্রার এই চিত্র প্রকাশ করেছেন ৭ জানুয়ারি, যেটি এখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুকুমে গত ৩ জানুয়ারি ইরানের রেভল্যুশন গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে ইরাকের বিমানবন্দরের বাইরে ড্রোন থেকে মিসাইল ছুড়ে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ইরান-মার্কিন যুদ্ধাবস্থার নতুন সংকট সামনে এসেছে। সারা বিশ্বের মিডিয়ায় এটিই এখন টক অব দ্য টাইম। তুমুল বিতর্ক ও বিশ্লেষণ চলছে, তাহলে কি ইরান-আমেরিকার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ একটি যুদ্ধ আসন্ন। তা যদি হয়, তাহলে সেটির শেষ কোথায় এবং তার জন্য দুই পক্ষ ও বিশ্ববাসীকে কী মূল্য দিতে হবে। প্রথম প্রশ্ন, এর শেষ কোথায়, তা বুঝতে হলে এর শুরুটা এবং ধারাবাহিকভাবে তার পর্যায়ক্রমিক ঘটনাবলির একটা বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

১৯৭৯ সালের শুরুতে আমেরিকার একান্ত অনুগত রেজা শাহ পাহলবির ক্ষমতা থেকে উত্খাত এবং সে স্থলে শিয়াপন্থী ইসলামিক ধর্মীয় পক্ষের ক্ষমতা দখলকে ইরান-মার্কিন যুদ্ধাবস্থার শুরু বলা হলেও আসলে এর গোড়াপত্তন হয় ১৯৫৩ সালে, যখন ইঙ্গ-মার্কিন অক্ষের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইরানের জাতীয়তাবাদী মুহম্মদ মোসাদ্দেক সরকারকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করে আবার রেজা শাহ পাহলবিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়া হয়। এই কাজে সরাসরি সিআইএ যুক্ত ছিল এবং যার প্রধান ব্যক্তি ওই সময়ে ইরানে এসে সরাসরি কাজের তত্ত্বাবধান করেন, তিনি ছিলেন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্টের নাতি কারমিট রুজভেল্ট।

পরবর্তীকালে কারমিট এ বিষয়ের ওপর একটি বই লিখে সবিস্তারে সব বর্ণনা করেছেন। কারমিটের বইয়ের নাম ‘কাউন্টার ক্যু’। বেশির ভাগ আমেরিকান থিংকট্যাংক মনে করে, বিপ্লবী নেতাদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ইরানের এক দল উগ্রপন্থী ছাত্র-যুবক কর্তৃক ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দখল এবং অর্ধশতাধিক কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারকে জিম্মি করা ছিল সরাসরি আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য। তাদের এ রকম মনে করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। সব কূটনৈতিক আইন, বিধান ও নিয়ম ভঙ্গ করে এমন কাজ কোনো রাষ্ট্র করতে পারে না। অন্যদিকে পাল্টা যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন তাঁদের মতে, তাহলে ১৯৫৩ সালে আমেরিকার সরাসরি তত্ত্বাবধানে মোসাদ্দেক সরকারকে উত্খাত করাও ছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে আমেরিকার দূতাবাস জিম্মি করার ঘটনা ৪৪৪ দিন ধরে চলমান থাকার পরিণতিতে যে সর্বনাশটি হয়েছে তার একটি বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় এডওয়ার্ড ডাব্লিউ সাইদের রচনা ‘কাভারিং ইসলাম’ গ্রন্থে। দূতাবাস জিম্মি ঘটনার সূত্র ধরে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবশালী সব শ্রেণির মিডিয়া ইরানের বিপ্লব ও তার কর্মকাণ্ডকে সমগ্র ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সমার্থক করে দেখিয়ে যেভাবে ইরান ও ইসলাম ধর্মকে ডেমোনাইজড বা সেটির প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছে সেগুলোর বর্ণনা, তারিখ ও মিডিয়ার নামসহ এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর ‘কাভারিং ইসলাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। জায়গার স্বল্পতা বিবেচনায় ওই বই থেকে দু-একটি মাত্র উদাহরণ দিই।

নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সানডে ম্যাগাজিনে ১৯৮০ সালের ৬ জানুয়ারি মাইকেল ওয়ালজার লিখেছেন, ‘পৃথিবীর যেসব জায়গায় হত্যা, যুদ্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত-সংঘর্ষসহ ভয়াবহতার সৃষ্টি হয়েছে, তার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের যোগসূত্র রয়েছে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৫)। ১৯৭৯ সালের ২১ নভেম্বর এবিসি নিউজ চ্যানেলে ফ্রাংক রেনল্ড নামের একজন এক আলোচনায় হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য করেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৪)। এই বাড়াবাড়ির ফলে যা হয়েছে তা হলো, পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকার বৃহত্তর জনমনে ইসলাম ধর্ম ও ইরানের প্রতি একটা স্থায়ী বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং তা থেকে ভয়ও তৈরি হয়েছে। ফলে ইরানকে তারা একটি স্থায়ী শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে ধরে নিয়েছে। সেই সঙ্গে স্যামুয়েল পি হান্টিংটন (১৯২৭-২০০৮) তাঁর ‘ফ্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ গ্রন্থের মাধ্যমে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন এই মর্মে যে ভবিষ্যতে ইসলামিক সংস্কৃতির সঙ্গে পশ্চিমা মূল্যবোধের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্ব দ্বিমুখী স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেছে। প্রথমত, যেকোনো মূল্যে ইরানের রিজিম পরিবর্তন এবং দ্বিতীয়ত, ইরানকে ডেমোনাইজ করে ইসলামী বিশ্বকে দ্বিখণ্ডিত, বহুখণ্ডিত করে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে চিরস্থায়ীভাবে লাগিয়ে রাখা। মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে এই চিত্রটি এখন স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। আমেরিকা যদি বিশ্বের সব রাষ্ট্রের ওপর তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে সংঘাত বাড়বে বৈ কমবে না, যে কথা হান্টিংটন তাঁর ‘ফ্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দখল, সত্তরের দশকে ভিয়েতনামে পরাজয়, ১৯৭৯ সালে ইরানে খোমিনিদের ক্ষমতা দখল এবং ১৯৯৬ সালে তুরস্কে ইসলামপন্থী দল ক্ষমতায় এলে আমেরিকার রাষ্ট্র ও সিভিল সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রে ও সময়ে একই প্রশ্ন উঠেছে, কার জন্য এসব দেশ আমেরিকার হাতছাড়া হয়ে গেল যেমন—‘হু লস্ট চায়না’।

অন্যদিকে ইরানের ঘোষিত নিজস্ব ব্যাখ্যামতো ধর্মভিত্তিক শাসনপদ্ধতি এই বিশ্বায়ন ও তথ্য-প্রযুক্তির যুগে অন্য যেকোনো রাষ্ট্র, সেটি ইসলামিক বা অন্য কোনো ধর্মভিত্তিক হোক অথবা ধর্মনিরপেক্ষ হোক, তার সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য, যদি না ইরান অত্যন্ত সতর্ক হয়। তাই সংঘাত এড়াতে চাইলে ইরানকে পথ বের করতে হবে তারা পুরো বিশ্বের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখে কিভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবে। বিশ্বব্যবস্থা, শ্রেণিবৈষম্য, ধর্মীয় দ্বন্দ্ব এবং মানবিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ—এই বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বব্যাপী সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে রকম বিশাল মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তার সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে মোটামুটি একটা সহাবস্থানের জায়গায় পৌঁছতে না পারলে মানবসভ্যতা সংঘাত ও যুদ্ধ থেকে বের হতে পারবে না। আর না পারলে হয়তো একদিন ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মানবপ্রজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই আজকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ঐতিহাসিক লিগ্যাসির সূত্র ধরে এই সময়ে ইরান-আমেরিকার যুদ্ধাবস্থার যে পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে, সেটি কত দূর যাবে। জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার পাল্টা হিসেবে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর ইরানের এক ঝাঁক মিসাইল হামলার পর দুই পক্ষের রক্ষণমূলক প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যাচ্ছে তারা কেউ আপাতত পরিপূর্ণ একটি যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছে না। আমেরিকান জনগণের বৃহত্তর অংশ এই সময়ে আরেকটি নতুন যুদ্ধের বিরুদ্ধে। ডেমোক্রেটিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে এরই মধ্যে প্রস্তাব পাস হয়েছে, যাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে না পারেন।

যদিও এই প্রস্তাব সিনেটে, যেখানে রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, সেখানে গৃহীত হবে বলে মনে হয় না। ট্রাম্পের হুকুমে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি হেডলাইন ছিল—Airstrike pushes National Security to forefront of 2020 race.. এতে বোঝা যায় সোলাইমানি হত্যাকে আমেরিকার বিজয় হিসেবে আগামী নির্বাচনের ক্যাম্পেইনে স্লোগান উঠাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল। চরম ডানপন্থা উত্থানের যে ট্রেন্ড চলছে, তাতে ভোটের রাজনীতিতে এটি মোক্ষম অস্ত্র হবে বলে মনে করছে রিপাবলিকান দল। হতে পারে ২০১৯ সালে ভারতের জাতীয় নির্বাচন থেকে এই শিক্ষা তারা নিয়েছে। ভারতের নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরুর প্রাক্কালে মোদি সরকার পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালিয়ে ভোটের রাজনীতিতে যেভাবে বাজিমাত করেছেন, সেটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক হবে, এটিই স্বাভাবিক। আমেরিকার অভ্যন্তরে এখনো জনমতের যে ট্রেন্ড চলছে, তাতে দ্বিতীয়বার ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হবেন বলেই অনেকে মনে করছে। তবে এই ট্রেন্ড যদি নির্বাচনের আগে উল্টো দিকে ঘুরে যায়, তাহলে ট্রাম্প আবার একটি অজুহাতে ইরানের ওপর যেকোনো ধরনের হামলা চালাতে পারেন। আমেরিকান শ্রেষ্ঠত্ব ও সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠা ও প্রদর্শন ভোটের রাজনীতিতে দারুণ সুবিধা দেয়। ১৯৬০ সালের নির্বাচনে জন এফ কেনেডি কিউবার বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহি প্রচার চালিয়ে এবং ২০০৩ সালে ইরাক দখল করে ২০০৪ সালের নির্বাচনে জর্জ ডাব্লিউ বুশ বাজিমাত করেছিলেন।

ভিয়েতনাম এবং তারপর সম্প্রতি ইরাক ও আফগানিস্তানে সরাসরি সামরিক অভিযানের ট্র্যাজেডির দিকে তাকালে আমেরিকার জনগণ এই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন দেবে বলে মনে হয় না, যার প্রমাণ এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। তা ছাড়া ওই দিন আর নেই, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে প্রাচীনকাল থেকে সমৃদ্ধ একটি জাতি-রাষ্ট্রের সব কিছু পরিবর্তন করে পশ্চিমা ধাঁচে নিয়ে আসার সক্ষমতা এখন আর আমেরিকার নেই। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির মাঠে রাশিয়া এখন শক্তিশালী খেলোয়াড়। বহু চেষ্টা এবং তার সঙ্গে দেশটি ধ্বংস হলেও আসাদ রিজিমের পরিবর্তন পশ্চিমা বিশ্ব করতে পারেনি। উপরন্তু লাখ লাখ সর্বহারা শরণার্থী এখন ইউরোপের জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে। বারাক ওবামার সময় সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েও শেষ মুহূর্তে আমেরিকা পিছিয়ে যায়।

সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে আমেরিকার কাছে ইরান কিছুই না। কিন্তু আঞ্চলিকভাবে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুতি, ইরাকের মিলিশিয়া বাহিনী—সব মিলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও সৌদি আরবসহ আমেরিকান স্বার্থের ওপর একযোগে চারদিক থেকে শত শত মিসাইলের পাল্টা আক্রমণ হবে। আট কোটি মানুষের দেশ ইরান, যারা একটি চেতনার শক্তিতে ঐক্যবদ্ধ, তাদের ইরাক বা আফগানিস্তান ভাবা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক ফোরামে রাশিয়া ও চীন ইরানের পক্ষে দাঁড়াবে, তা এখন স্পষ্ট। অন্যদিকে একমাত্র ব্রিটেন ছাড়া ইউরোপের অন্য কোনো দেশ আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে বলে মনে হয় না। বিপরীতে ইরান এই সময়ে অর্থনৈতিকভাবে ভয়ানক দুর্বল। যুদ্ধ শুরু হলে অর্থনৈতিক হাহাকারে ইরানের অভ্যন্তরেই নিয়ন্ত্রণহীন অসহনীয় সংকট সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া আমেরিকা ও ইসরায়েলের মিসাইল আক্রমণে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাসহ সব অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। ইরানকে পিছিয়ে দেবে ৫০ বছর। তাই সব কিছু মিলে চলমান যুদ্ধাবস্থা বজায় থাকলেও সর্বাত্মক যুদ্ধ বেধে যাচ্ছে, তা এখনো মনে হচ্ছে না। আবার যুদ্ধাবস্থার অবসান অদূর ভবিষ্যতে হবে, তারও কোনো লক্ষণ নেই। সুতরাং যেকোনো পক্ষের একটি ভুল পদক্ষেপে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যার ভোগান্তি ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বব্যাপী।

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা