kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

কিভাবে বেড়ে উঠছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

মাছুম বিল্লাহ

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কিভাবে বেড়ে উঠছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বৈশ্বিক মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) অংশ হিসেবে একটি জরিপ চালিয়েছে, যার ফল প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ওই প্রতিবেদনে শিশুদের অপূর্ণ শৈশবের একটি চিত্র উঠে এসেছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় এতে অর্থায়ন করেছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষ্ঠু শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ পর্ব হচ্ছে শৈশব। শৈশবকালীন বিকাশ একজন মানুষের পরবর্তী জীবনে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। প্রাক-শৈশবে মা-বাবার সঙ্গে বন্ধন এবং প্রথম শিখন অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশকে প্রভাবিত করে। তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অভাববোধও হতে পারে; যদিও অপূর্ণতা ছাড়া বেড়ে ওঠা শিশুর ক্ষেত্রেও সেটি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সামগ্রিকভাবে শৈশবকালে শিশুদের হাতে বই ও খেলার সামগ্রী তুলে দেওয়াসহ পরিপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে রয়েছে রাষ্ট্রের বিশাল দায়িত্ব। 

গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত জরিপের ফল বলছে, মা-বাবার সান্নিধ্য ছাড়াই বড় হচ্ছে শিশুদের একটি অংশ। এর মধ্যে ৪.১ শতাংশ শিশু আছে, যাদের বায়োলজিক্যাল মা-বাবা কেউই নেই। ৪.১ শতাংশ শিশু আছে, যাদের মা অথবা বাবা দুজনই মারা গেছেন। এ ছাড়া ৭.৬ শতাংশ শিশুর মা অথবা বাবাকে উপার্জনের তাগিদে পরিবার ছেড়ে দেশের বাইরে থাকতে হয়। শিশুর সুষ্ঠু বিকাশে ভূমিকা রাখে প্রয়োজনীয় খেলা ও পড়ার উপকরণ। সেই সঙ্গে সঠিক তদারকিও। যদিও পাঁচ বছরের কম বয়সী মাত্র ৬.১ শতাংশ শিশুর কাছে তিন বা তার বেশি শিশুতোষ বই আছে। দুই বা ততোধিক খেলনাসামগ্রী আছে ৬৬.৫ শতাংশ শিশুর। সঠিক তদারকির বাইরে থাকে পাঁচ বছরের কম বয়সী অনেক শিশু। হয় একা থাকে অথবা ১০ বছরের কম বয়সী শিশুই দেখভাল করে এমন শিশুর হার কম নয়, ১১.২ শতাংশ। ফলে প্রাক-শৈশবের উন্নতি সঠিকভাবে হচ্ছে না ২৫.৫ শতাংশ শিশুর। তিন বছর থেকে পাঁচ বছর ১১ মাস বয়সে প্রাক-শৈশব শিক্ষা শুরু হওয়ার কথা; যদিও এ বয়সী ১৮.৯ শতাংশ শিশু এ ধরনের শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। নির্ধারিত বয়সে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে না অনেকে। প্রাথমিক ভর্তির এক বছর আগে প্রাক-প্রাথমিকে যাচ্ছে ৭৭.৪ শতাংশ শিশু। সঠিক বয়সে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারছে ৬১.৪ শতাংশ শিশু।

মাল্টিপল ক্লাস্টার ইন্ডিকেটর সার্ভে ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী সাত থেকে ১৪ বছর বয়সী মাত্র ৪৮.৮ শতাংশ শিশু ঠিকভাবে পড়তে পারে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া উপযোগীদের মধ্যে এই হার ২০.২ এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়াদের মধ্যে ২৪.৫ শতাংশ। মৌলিক সংখ্যার জ্ঞানও নেই সাত থেকে ১৪ বছর বয়সী ২৭.৯ শতাংশ শিশুর। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া উপযোগী শিশুদের মধ্যে এ হার ৯.৮ এবং এ দুই শ্রেণিতে পড়ুয়াদের মধ্যে ১২.৬ শতাংশ। শারীরিক ও মানসিক পীড়নের শিকার হচ্ছে শিশুদের বড় একটি অংশ। জরিপের তথ্য আরো বলছে যে এক থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৮.৮ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনোভাবে কেয়ারগিভারের কাছ থেকে শারীরিক ও মানসিক পীড়নের শিকার হচ্ছে।

বিশিষ্ট শিক্ষা বিজ্ঞানী লেভ ভাইগোস্কি খেলাকে শিশুর সামাজিক, আবেগিক, শারীরিক ও ভাষাভিত্তিক বিকাশের প্রতিনিধিত্বমূলক কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মনোবিজ্ঞানী ডেভিড এলকিন্ড বলেছেন, খেলা শুধু সৃজনশীল শক্তি নয়, এটি শেখার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। শিশুরা যখন খেলা করে তখন তারা বিভিন্ন বিষয় আবিষ্কার, অনুসন্ধান, নতুন চিন্তার উন্নয়ন ও তাদের শিক্ষার বিভিন্ন দিক প্রসারিত করার সুযোগ পায়। শিশুরা খেলার মাধ্যমে পারস্পরিক মতবিনিময়, পরিকল্পনা করা, সমস্যা সমাধান, নতুন কিছু সৃষ্টি করা ও বাস্তব জীবনের অনেক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়। বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ফ্রেজার মাস্টার্ডের মতে, খেলা শিশুর জ্ঞান বৃদ্ধি করে, কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে, সৃজনশীল চিন্তাকে প্রসারিত করে, সমস্যা সমাধান, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরিতে সহায়তা করে। এই সুযোগ থেকে আমাদের শিশুরা আজ বঞ্চিত।

আবার পরিবার ও প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদান করা হয়। শাস্তির নেগেটিভ প্রভাসগুলো, ভয়ভীতি শিশুকে দারুণভাবে মানসিক কষ্ট দেয়। সহপাঠীদের সামনে অপমানের যন্ত্রণায় শিশু ভীষণভাবে মানসিক কষ্ট পেয়ে থাকে। সে নিজেকে অপরাধী, ছোট ও হীন মনে করে। শারীরিক ক্ষতি সহজে মিটে গেলেও শিশুর মধ্যে অপমানবোধ সহজে শেষ হয় না। আর শিশুর এই অপমানবোধ তাকে বিদ্যালয়, শিক্ষক, পড়ালেখা ও সহপাঠীদের প্রতি অনীহা ও ঘৃণা তৈরিতে সহায়তা করে। কখনো কখনো অপমানের যন্ত্রণা বেশি হওয়ায় শিশু পরবর্তীকালে বিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। শাস্তি, রাগ ও ভয়ে শিশুর মস্তিষ্কে এক ধরনের হরমোন নির্গত হয়, যা তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে ক্ষণিকের জন্য বাধাগ্রস্ত করে। এ সময় এ ধরনের নির্গত হরমোন তার মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তির ক্ষেত্রটিতে মেঘের মতো ছায়া ফেলে ঢেকে দেয়। দেখা গেছে, শিশুরা যখন অতিরিক্ত মানসিক দুঃখ, ভয়, ক্রোধ বা মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকে তখন অতি সাধারণ কথা বা তথ্যও মনে করতে পারে না। আরো দেখা যায়, এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে শিশুর মস্তিষ্কের গঠন ও আকৃতিতে স্থায়ী পরিবর্তন বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। ভয়ভীতি ও শাস্তির কারণে শিশুরা কম শেখে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুরা খুবই আনন্দপ্রিয়। তারা আনন্দময় পরিবেশেই বেশি শেখে। পক্ষান্তরে শাস্তি, অপমান ও ভীতিকর বা আনন্দহীন পরিবেশে স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অনেক কম শেখে। শ্রেণিভিত্তিক যোগ্যতা অর্জনের দিক থেকে শিশুরা অনেক পিছিয়ে পড়ে। শিশুরা শিক্ষককে দেখে পরোক্ষভাবে শাস্তি বা মারামারি করা শেখে। স্বাভাবিকভাবে শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। শিশুরা পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সরাসরি শিক্ষক থেকে অনুকরণও করা শেখে। পরবর্তী জীবনে শিশু যখন বড় হয় তখন সে শিক্ষকের মতো শাসনের প্রক্রিয়া হিসেবে শাস্তি প্রয়োগ করে থাকে। বারবার শাস্তি পাওয়ার ফলে শিশুর মনে ক্ষোভ, যন্ত্রণা, দুঃখবোধ ও প্রতিশোধপ্রবণতা জন্ম নেয়। ধীরে ধীরে শিশুর মনমানসিকতায় জেদি, রাগী ও অস্থির ভাব জন্ম নেয়, যা শিশুর পরবর্তী জীবনে খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আচরণে অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পায়। শিশু পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাদের সুপ্ত মনের প্রতিভা জাগ্রত হতে বাধার সৃষ্টি হয়। তাই তাদের আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিশুর সঙ্গে আদর-ভালোবাসা ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তার চাহিদা, মানসিকতা ও পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে। বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে হবে শিক্ষাদান পদ্ধতিতে। খেলার মাঠে খেলা করতে দিতে হবে, উন্মুক্ত জায়গায় ঘুরতে দিতে হবে। মাঝেমধ্যে শিশুর সঙ্গে নিজেকে খেলতে হবে, মজার মজার গল্প বলতে হবে। তাকে স্বাধীনতা দিতে হবে এবং তার নিজস্বতা প্রকাশ করার সুযোগ দিতে হবে। তার বয়স উপযোগী খেলনা দিতে হবে। শিশুদের বিরতি থাকতে হবে, যাতে তারা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারে, হাসতে পারে, মন খুলে কথা বলতে পারে। এগুলো তার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য খুবই প্রয়োজন।

 

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা