kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

এই সময়

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের নতুন মাত্রা

তারেক শামসুর রেহমান

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



মধ্যপ্রাচ্য সংকটের নতুন মাত্রা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ৯ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চান না, তিনি শান্তি চান। প্রেস ব্রিফিংটি তিনি করলেন এমন এক সময় যখন ইরান ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটির ওপর ১২টি মিসাইল রকেট নিক্ষেপ করে। গত ৭ জানুয়ারি ইরাকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে হত্যার পর এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান এই মিসাইল হামলা চালায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে মার্কিন ড্রোন বিমান হামলায় শীর্ষ ইরানি সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুর পর খোদ ইরানসহ সমগ্র বিশ্বে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্য সংকটে নতুন একটি মাত্রা এনে দিয়েছে। সংবাদপত্রগুলোতে সম্ভাব্য একটি ‘যুদ্ধ’, এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের (?) সম্ভাবনার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আদৌ কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে কি না, তা এই মুহূর্তে স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে নিঃসন্দেহে এই হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনীতিতে উত্তেজনা ছড়িয়েছে এবং এ অঞ্চলের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে কাসেম সোলাইমানি ছিলেন ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের এলিট ফোর্স কুদস ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডার। এই রেভল্যুশনারি গার্ড সরাসরি ইরানের ‘সুপ্রিম লিডার’ আলী খামেনির কাছে দায়বদ্ধ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন তিনি নন। বলা হয় ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পর ‘রেভল্যুশনারি গার্ড’ গঠন করা হয়েছিল শুধু ইসলামিক শাসন ব্যবস্থা তথা ধর্মীয় নেতাদের ‘প্রটেকশনের’ জন্য! এ জন্যই বলা হয় রেভল্যুশনারি গার্ড হচ্ছে ইরানি বিপ্লবের অন্যতম স্তম্ভ। তবে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ নেই, তা নয়। অভিযোগ আছে। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক সময়ে স্ট্রেইট অব হরমুজ প্রণালিতে যেসব বিদেশি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছিল, এর পেছনে ছিল এই রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী। অনেক দিন থেকেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলার চেষ্টা করছেন, কোনো সংকটে এই রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী স্ট্রেইট অব হরমুজ প্রণালি বাদ করে দিতে পারে। তারা এই সমুদ্র সীমানায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের পর এই আশঙ্কা আরো বাড়ল। সোলাইমানির বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ আমরা শুনেছি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখ থেকে। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যত সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড তার রচয়িতা ছিলেন এই সোলাইমানি। বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকে তিনি শিয়া ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে মার্কিনবিরোধী একটি ‘অ্যালায়েন্স’ গড়ে তুলেছিলেন। পেন্টাগনের সাবেক শীর্ষ সেনা কমান্ডার জেনারেল ডেভিড পেত্রাউসের মুখেও আমরা শুনেছি সে কথা। পেত্রাউস বলেছেন, ইরানি শীর্ষ সেনা কমান্ডার সোলাইমানিকে হত্যা মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবিরোধী সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেছেন, নির্দিষ্ট উদ্যোগের কারণেই এটি গুরুত্বপূর্ণ। ওসামা বিন লাদেন ও আইএস নেতা বাগদাদিকে হত্যার চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হলো জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা। এর পেছনে সত্যতা কতটুকু আছে আমরা জানি না। এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট করে বলা হয়নি কোন কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জেনারেল সোলাইমানি জড়িত ছিলেন। তবে এটি ঠিক সাম্প্রতিক সময়গুলোতে লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় ছিলেন। সিরিয়ার অভ্যন্তরে এই গার্ড বাহিনীর নেতৃত্বে একটি সেনা ক্যাম্প পরিচালিত হতো, যেখানে ইসরায়েলি বিমান হামলার খবর কিছুদিন আগে সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল, ইরান তা অস্বীকারও করেনি। একই সঙ্গে লেবাননে হিজবুল্লাহ গ্রুপ কিংবা ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী হাশেদ আল শাবির অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের অন্যতম উৎস ছিল এই রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী। মার্কিন ড্রোন হামলায় ‘হাশেদ আল শাবি’র সহকারী প্রধান আবু মাহদি আল মুহানদিসও নিহত হয়েছিলেন। মুহানদিস ইরাকে ‘কায়তাব হিজবুল্লাহ’ নামে একটি সংগঠনের প্রধান ছিলেন। ড্রোন হামলার আগে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা ও একজন কন্ট্রাক্টরকে হত্যার জন্য হাশেদ আল শাবিকে অভিযুক্ত করা হয়। সুতরাং এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে সোলাইমানি ছিলেন ইসরায়েলি ও মার্কিন গোয়েন্দাদের টার্গেট। তাঁকে যেকোনো সময় হত্যা করা হতে পারে, এটি তিনি জানতেন। তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন বলে মনে হয় না। কেননা তিনি কোন সময় এবং কখন বাগদাদে থাকবেন, এটি তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকজন তথা ইরাকি শীর্ষ সেনা কমান্ডার ছাড়া অন্য কারো জানার কথা নয়। ইসরায়েল ও মার্কিন গোয়েন্দাদের সাফল্য এখানেই যে তারা এ তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিল। সোলাইমানির বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে একটি স্বাধীন দেশের ভেতরে কোনো নাগরিককে হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। জাতিসংঘের সনদেও এমনটি নেই। এটি এক ধরনের ‘যুদ্ধের’ শামিল! এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে স্বীকার করেছেন তিনি সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর ব্যক্তি। কিন্তু তিনি কি কাউকে সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিতে পারেন? খোদ যুক্তরাষ্ট্রে এই বিতর্ক উঠেছে এখন।

সোলাইমানি হত্যার পর এখন কী হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে? আরেকটি সর্বাত্মক যুদ্ধ কি আমরা প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি? সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা সেখানে ক্ষীণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন ৫২টি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা কিংবা ইরান তেল আবিবসহ ৩৫টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দিলেও বাস্তবে যুদ্ধের আশঙ্কা কম। কেননা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ভালো করে জানে যুদ্ধের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তবে কয়েকটি সম্ভাবনার কথা বলা যায়। এক. সর্বাত্মক যুদ্ধ সেখানে হবে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ভেতরে ‘যুদ্ধ’ সম্প্রসারিত করার হুমকি দিলেও পঞ্চমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে জড়াবে, তা মনে হয় না। ১৯৯০ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে ‘প্রথম যুদ্ধ’র সূচনা করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল ১৯৯০ সালের আগস্ট থেকে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কুয়েতকে ‘ইরাকমুক্ত’ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি বহুজাতিক বাহিনী। দ্বিতীয় যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে গিয়েছিল ওই ইরাকেই। ইরাকের কাছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র রয়েছে (ডগউ) এই অভিযোগ তুলে ২০০৩ সালে দ্বিতীয় যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ যুদ্ধ শুরু করে ২৩ দিনের মধ্যে দেশটি দখল করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সরকারিভাবে সেই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল ২০০৩ সালের ১ মে আর মার্কিন সেনাবাহিনী সেখান থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় ২০১১ সালে। তৃতীয় যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে লিবিয়া আক্রমণের মধ্য দিয়ে। ওই ‘যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী লিবিয়ায় প্রবেশ করেনি বটে, কিন্তু অব্যাহত বিমান আক্রমণের মুখে গাদ্দাফির পতন হয়েছিল। ২০১১ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, দীর্ঘ সাত মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর বিমানবাহিনী লিবিয়ায় বোমা হামলা চালিয়ে গাদ্দাফিকে উত্খাত করে। ওই ঘটনার পর দীর্ঘ আট বছর পার হয়েছে। কিন্তু লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। লিবিয়া একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চতুর্থ যুদ্ধ শুরু করেছিল ২০১৪ সালে সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে রাশিয়াও সিরিয়ায় আসাদ সরকারের সাহায্যে আইএসের বিরুদ্ধে বোমা হামলা শুরু করে।  আলাদাভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া আইএস ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালালে একপর্যায়ে সিরিয়া ও ইরাকে গড়ে ওঠা আইএসের তথাকথিত ‘জিহাদি রাষ্ট্র’র পতন ঘটে। কিন্তু সরকারিভাবে সিরিয়ায় ‘যুদ্ধ’ বন্ধের ঘোষণা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো বাহিনীর হাতে আইএসের নেতা বাগদাদির মৃত্যুর পর ধারণা করা হয়েছিল, এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের পর এই যুদ্ধ নতুন একটি মাত্রা পেল। এখন বলা হচ্ছে আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো বিমান অপারেশন পরিচালনা করবে না। এরই মধ্যে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে যে আইএস আবার সিরিয়া-ইরাকে সংগঠিত হয়েছে। সোলাইমানির বিরুদ্ধে একটি ‘অভিযোগ’ যে তিনি আইএস উত্খাতে প্রেসিডেন্ট আসাদকে সহযোগিতা করেছিলেন। এখন আইএসকে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি লবি কি এখন আইএসকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে? যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে ‘পঞ্চম যুদ্ধের’ সূচনা করে, এর ধরন কী হবে, সেটিও একটি প্রশ্ন। মেরিন সেনারা ইরাক দখল করে নিয়েছিল; কিন্তু লিবিয়া ও সিরিয়ার ক্ষেত্রে তাদের স্ট্র্যাটেজি ছিল ভিন্ন। শুধু বোমা হামলা চালিয়ে সরকার উত্খাতের (‘রেজিম চেঞ্জ’) উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। লিবিয়ায় এই ‘তত্ত্ব’ কাজ করলেও সিরিয়ায় কাজ করেনি। সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে উত্খাত করা যায়নি। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের বিরুদ্ধে স্ট্র্যাটেজি কী হবে? মূল টার্গেট সেখানকার ইসলামী সরকারকে উত্খাত, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু কাজটি খুব সহজ হবে না। ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায়, বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান বোমা হামলা চালাতে পারে; কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। এতে মার্কিনবিরোধী জনমত সারা মধ্যপ্রাচ্যে আরো শক্তিশালী হবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সম্ভাবনা অনেক। এক. সারা মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের ‘গেরিলা যুদ্ধ’ (‘হিট অ্যান্ড রান’)-এর সূচনা করবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড। এতে মার্কিন স্থাপনাগুলো থাকবে এক ধরনের ঝুঁকির মুখে। দুই. স্ট্রেইট অব হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী। এতে বিশ্বে জ্বালানি তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে। একটি তথ্য দিই। স্ট্রেইট অব হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২০১৫ সালে প্রতিদিন ১৮.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল (বিশ্বের মোট সরবরাহকৃত তেলের ২০ শতাংশ) সরবরাহ করা হয়েছিল। এই তেলের ওপর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরশীল। অন্যদিকে পারসীয় গালফ অঞ্চল থেকে বিশ্বে প্রতিদিন ২৫ শতাংশ তেল ও ৩৫ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করা হয়। এতে তখন বিঘ্ন ঘটতে পারে। ফলে বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে আমাদের মতো দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিন. ইরান সংকট ঘনীভূত হলে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধ-২-এর ধারণা আরো শক্তিশালী হবে। এরই মধ্যে চীন-রাশিয়া-ইরানের মধ্যে ‘ঐক্য’ হয়েছে। এই তিন শক্তি সম্প্রতি একটি সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। যেকোনো যুদ্ধে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিকে ইরানের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে আমরা দেখব। চার. এরই মধ্যে ইরান ঘোষণা দিয়েছে তারা ছয় জাতি পারমাণবিক চুক্তি (২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ও ২০১৬ সালে কার্যকর) থেকে সরে আসছে। দেশটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তেহরান আর পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, মজুদ, গবেষণা ও উন্নয়ন সীমিত রাখার শর্ত মেনে চলবে না। এর অর্থ পরিষ্কার—ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রক্রিয়ায় নিজেদের আবারও জড়িত করবে। পাঁচ. সোলাইমানিকে হত্যা ও ইরানে নতুন একটি ফ্রন্ট ‘ওপেন’ করার মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিনেটে তাঁর বিরুদ্ধে যে ‘ইমপিচমেন্ট’ প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে, তা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হলেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনও এমনটা করেছিলেন ১৯৯৮ সালে ইরাকে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়ে। এখন নিঃসন্দেহে সিনেটে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে।

চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইরান সংকটের সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি জড়িত। ২০১৯ সালে ইসরায়েলে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে ১৭ মার্চ নির্বাচন হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ‘যুদ্ধ’ তাঁর অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে পারে। এরই মধ্যে ইরানের ফের পারমাণবিক কর্মসূচি হাতে নেওয়ার ঘোষণা—কার্যত ইসরায়েলি ফাঁদে পা দিলেন ইরানি নেতারা। এই ঘোষণা কট্টরপন্থী নেতানিয়াহুকে ফের ক্ষমতায় বসাতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বারের মতো বিজয় সহজ হবে।

 

লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা