kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

ডোনাল্ড ট্রাম্প কি প্রেসিডেন্ট থাকছেন?

শামীম আল আমিন

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডোনাল্ড ট্রাম্প কি প্রেসিডেন্ট থাকছেন?

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইমপিচ বা অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল বেশ কয়েক দিন আগেই। তবে এ নিয়ে চূড়ান্ত বিতর্ক শুরু হওয়ার এক দিন আগে থেকেই রাজপথে সরব ট্রাম্পবিরোধীরা। হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিল নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে। সেখান থেকে স্লোগান ওঠে, ‘আইনের ঊর্ধ্বে কে আছে?’ আবার উত্তরও আসে সেখান থেকে, ‘কেউ নয়, কেউ নয়।’ আর আমেরিকার সৌন্দর্য এখানেই যে শেষ পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্টকেও আইনের মুখোমুখি করা যায়। এবার ক্ষমতার অপব্যবহার ও কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইমপিচ বা অভিশংসনের প্রস্তাব হাউসে পাস হয়েছে।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কী? নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই তিনি ছিলেন আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে। এমনকি নির্বাচনে রাশিয়ার সঙ্গে নিজের ক্যাম্পেইন টিমের আঁতাতের অভিযোগে রীতিমতো দীর্ঘ অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষটায় ফেঁসে গেলেন ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের বিষয়ে নাক গলাতে গিয়ে। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে কংগ্রেসের কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।   

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে প্রথম অভিযোগটি হচ্ছে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। দ্বিতীয় অভিযোগটি হচ্ছে, অভিশংসনের তদন্তে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন। প্রথম অভিযোগ ২৩০-১৯৭ ভোটে এবং দ্বিতীয় অভিযোগ ২২৯-১৯৮ ভোটে অনুমোদন করে হাউস।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পই হচ্ছেন তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, যিনি ইমপিচড বা অভিশংসিত হলেন। কোনো প্রেসিডেন্টকে এ কারণে ক্ষমতা ছাড়তে হয়নি। শুধু ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন অভিশংসিত হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছিলেন।

অ্যান্ড্রু জনসন হচ্ছেন অভিশংসনের মুখোমুখি হওয়া আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট। গৃহযুদ্ধের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন নিহত হন। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন অ্যান্ড্রু জনসন। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে গৃহযুদ্ধে পরাজিত দক্ষিণের রাজ্যগুলোর পুনর্গঠন নিয়ে ডেমোক্র্যাট এই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সংকট তৈরি হয়। তখন  র‌্যাডিক্যাল রিপাবলিকানরা যুদ্ধে হেরে যাওয়া সাবেক কনফেডারেট নেতাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আইন করা এবং মুক্ত দাসদের অধিকার সুরক্ষার আইন তৈরি করতে চাপ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তাঁদের প্রতিটি উদ্যোগ বন্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করছিলেন জনসন। আইন অবজ্ঞা করে কংগ্রেসের ছুটি চলাকালে প্রেসিডেন্ট জনসন তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বী এডউইন স্টান্টেনকে বহিষ্কার করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় নিজের দপ্তরে অবস্থান নিয়ে স্টান্টেন পদ ছাড়তে অস্বীকার করেন। আর এ ঘটনায়ই হাউস তাঁকে ইমপিচ করে। কিন্তু মাত্র এক ভোট কম পাওয়ায় সিনেটে প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়। পদ ছাড়তে হয় না ডেমোক্র্যাট এই প্রেসিডেন্টকে। তবে মেয়াদের বাকি সময়টায় স্বস্তি পাননি জনসন। সেই সঙ্গে পরের নির্বাচনে হেরে যায় তাঁর দল।

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে রিয়াল এস্টেট ব্যবসায় প্রেসিডেন্টের বিনিয়োগের অনুসন্ধান চলছিল স্পেশাল কাউন্সেল কেনেথ স্টারের নেতৃত্বে, যা হোয়াইট ওয়াটার কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তদন্তে জড়িয়ে যায় অন্য একটি বিষয়। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের তৎকালীন শিক্ষানবিশ মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সম্পর্কের বিষয়টিও পরে সেই অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রেসিডেন্ট অভিযোগ অস্বীকার করলেও ১৯৯৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কেনেথ স্টারের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করার মতো ১১টি সম্ভাব্য ক্ষেত্রও চিহ্নিত করা হয়। হাউসে ইমপিচমেন্টের শিকার হলেও সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের মত তাঁর বিরুদ্ধে যায়নি। ফলে ক্ষমতাও ছাড়তে হয়নি ডেমোক্র্যাট এই প্রেসিডেন্টকে।

এর আগে অভিশংসিত দুই প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেমোক্র্যাট। এবার রিপাবলিকান হিসেবে প্রথম ইমপিচড হলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসছে জানুয়ারিতে সিনেটে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে ট্রাম্পকে। শুনানি শেষে অপসারণের পক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পড়লে পদ ছাড়তে হবে ট্রাম্পকে।

এর আগের দুই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়নি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে? চলুন জেনে নিই কিভাবে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কংগ্রেসের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে অভিশংসন বা অভিযুক্ত করার প্রক্রিয়াটি শুরু করা যায়। আর এটি পাস করানোর জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই চলে। অর্থাৎ ৫১ শতাংশ ভোট প্রস্তাবের পক্ষে পড়লেই প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হন। কিন্তু এরপর কী হয়? প্রেসিডেন্ট কি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন? না, বিষয়টি তেমন নয়। এরপর প্রক্রিয়াটি চলে যায় সিনেটে। সেখানে অবশ্য শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট হলেই চলে না, প্রয়োজন হয় দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন। অর্থাৎ ১০০ সদস্যের সিনেটের ৬৭ শতাংশের বলতে হয় প্রেসিডেন্ট দোষী। তাহলেই শুধু ক্ষমতা থেকে প্রেসিডেন্টকে সরানো যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত হাউস অভিযুক্ত করেছে। সেটিকেই বলা হচ্ছে অভিশংসন। কিন্তু ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না, এটি প্রায় নিশ্চিত। কারণ রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে সিনেট। সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলেই ধরে নেওয়া হয়েছে। এতে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বেই থাকছেন ধরে নেওয়া যায়।

তাহলে এ সিদ্ধান্তের কি কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই? অবশ্যই আছে। রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা হয়েছে। অতীতের ইতিহাসও তা-ই বলে। দেশের রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানরা মুখোমুখি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগামী নির্বাচনেও প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। ধরেই নেওয়া যায়, তিনিই হচ্ছেন রিপাবলিকানদের কাণ্ডারি। অনেকে বলতেও শুরু করেছিলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে তিনিই প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। কিন্তু হয়তো হাউসে অভিশংসনের মুখোমুখি হওয়ায় তাতে বড় বাধার মুখে পড়বেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কেননা সাধারণ দৃষ্টিতে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার মাধ্যমে অভিযুক্ত প্রেসিডেন্টকে আবারও নির্বাচিত করার পেছনে খুব বেশি উৎসাহ দেখায় না দেশের মানুষ। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই ব্যতিক্রম। অনেক বাধা টপকে, অসম্ভবকে সম্ভব করে তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এবং টিকে গেছেন। এ ছাড়া রয়েছে দেশের রাজনীতিতে নানা সমীকরণ। বিশেষ করে, শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বিরাট ভোটব্যাংক এখনো ট্রাম্পের পেছনে রয়েছে। কেননা তাদের শঙ্কা খুব দ্রুতই হয়তো তারা দেশটিতে সংখ্যালঘিষ্ঠ হয়ে পড়বে। এ কারণে ট্রাম্পের ওপর তাদের অগাধ আস্থা। অভিবাসনব্যবস্থার রাশ টেনে ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশটি তাদের জন্যই সংরক্ষিত রাখবেন, এমনটিই তারা ভাবে। এ পরিস্থিতিতে তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তিনি কি আবারও প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন? তবে এখনই নিশ্চিত উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন।

স্থানীয় সময় ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন ডিসিতে যখন হাউসে ভোটাভুটি চলছিল তখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য মিশিগানে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ব্যস্ত ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্বভাবতই তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমরা যখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছি, মিশিগানের জন্য লড়াই করছি, কংগ্রেসে ওই উগ্র বামেরা, যারা হিংসা আর বিদ্বেষের মধ্যে ডুবে আছে, আপনারা দেখছেন তারা কী করছে।’

স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবের বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ডেমোক্র্যাট পেলোসি সেদিন বলেছিলেন, ‘আমরা যদি এখনই উদ্যোগী না হই, তাহলে তা হবে দায়িত্ব এড়ানো। প্রেসিডেন্টের দায়িত্বহীন আচরণ আজ ইমপিচমেন্টকে জরুরি করে তুলেছে, এটি আমাদের দুর্ভাগ্য। তিনি আমাদের জন্য অন্য কোনো সুযোগ রাখেননি।’

পরস্পরবিরোধী অবস্থান থেকে বোঝাই যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে মরিয়া ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে এই ঘটনায়ও এতটুকু বিভ্রান্ত ও বিচলিত মনে হয়নি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। বরাবরের মতোই তিনি এমন। কোনোভাবেই ভেঙে পড়েন না বলেই অন্তত মনে হয়। এ পরিস্থিতিতে দেশটির রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে, সেটিই দেখার জন্য তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্বের মানুষ। এর কারণ বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্রটি পৃথিবীর রাজনীতির অনেক কিছুরই নিয়ন্ত্রক।

লেখক : কালের কণ্ঠ’র উত্তর আমেরিকার

বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা