kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড-শেষ পর্ব

শত প্রতিকূলতা হার মেনেছে শহীদ পরিবারের দৃঢ়তার কাছে

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



শত প্রতিকূলতা হার মেনেছে শহীদ পরিবারের দৃঢ়তার কাছে

সাক্ষী তৌহিদ রেজা নূর আরো বলেন, ‘তখন আমার বাবা লুঙ্গি-গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় আলনার দিকে যাচ্ছিলেন সেখান থেকে একটি পাঞ্জাবি নিয়ে গায়ে দেওয়ার জন্য; কিন্তু তা পারেননি। তার আগেই তাঁকে হাত উঁচু করতে বলা হয়। এই অবস্থায় আমার বাবাকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ভাঙা ভাঙা উর্দুতে তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করে। তিনি তাঁর পরিচয় দিলে ওই লোকগুলো তাদের সঙ্গে বাইরে যেতে বলে এবং বাড়ির লোকদের কাছে একটি গামছা চায়। আমার বাবার পিছে পিছে যারা ঘরের বাইরে গিয়েছিল তাদের বন্দুকধারীরা বন্দুকের নলের মুখে ঘরের  ভেতরে চলে যেতে বলে। এরই মধ্যে আমার মা একটি গামছা বন্দুকধারীদের হাতে তুলে দিয়ে সবাই ঘরের ভেতরে চলে আসে। এরপর বন্দুকধারী ব্যক্তিরা গামছা দিয়ে আমার বাবার চোখ বেঁধে নগ্ন পায়ে নিয়ে যায়। এটাই ছিল আমার বাবা প্রথিতযশা সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন সাহেবের শেষ যাত্রা। বিজয়ের পরে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ যখন জানা গেল রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমিতে বেশ কিছু বুদ্ধিজীবীর লাশ পড়ে আছে তখন আমাদের স্বজনরা সেখানে যান; কিন্তু গলিত বিকৃত লাশের মধ্যে আমার বাবার লাশটি শনাক্ত করতে পারেননি।’

তৌহিদ রেজা নূরের সাক্ষ্য থেকেই উঠে এসেছে বর্বরতার প্রকৃতি। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। শহীদের স্বজনদের এ বেদনা জাতি কোনো দিন বিস্মৃত হবে না। ১৯৭১ সালে ঘটনার সময় সাক্ষী তৌহিদ রেজা নূর ছিলেন শিশু। বাবার স্নেহ-আদর কি তিনি পেয়েছেন? শহীদ বাবার প্রতি নির্মমতা তাঁকে এবং শহীদের স্বজনদেরও চরম নির্মমতায় নিক্ষেপ করেছে। কিন্তু তার পরও শহীদের পরিবার থেমে থাকেনি। শত প্রতিকূলতা হার মেনেছে শহীদ পরিবারের আদর্শ, সাহস, দৃঢ়তার কাছে।

সাংবাদিক সৈয়দ নাজমুল হকের অপহরণ ও হত্যা

শহীদ সৈয়দ নাজমুল হকের ছেলে সৈয়দ মোর্তুজা নাজমুল এই মামলায় সাক্ষ্য দেন। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল পাঁচ বছর। তিনি বড় হয়ে মা ও পরিবারের মুরব্বিদের কাছ থেকে তাঁর বাবার অপহরণ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তাঁদের কষ্ট শহীদ সৈয়দ নাজমুল হকের লাশ কখনো খুঁজে পাননি তাঁরা।

সৈয়দ মোর্তুজা নাজমুল ট্রাইব্যুনালে যে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তার কিয়দংশ :

‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে যখন পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়, তৎপরবর্তীতে আমার বাবাকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য দুইবার পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে আটক রাখা হয় এবং অকথ্য নির্যাতন সত্ত্বেও আমার বাবা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় পাকিস্তানিরা তাঁকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। ওপরে উল্লিখিত ঘটনাসমূহ আমি আমার মা, আমার চাচা সাবেক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ সাজ্জাদুল হক (বর্তমানে মৃত) এবং আমার পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ অন্য সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পারি।

আমার মায়ের কাছ থেকে জেনেছি যে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৪টার সময় আলবদর বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল আমাদের ৯০ নম্বর পুরানা পল্টনের বাসায় এসে দরজা জোরপূর্বক ভেঙে ফেলে এবং ছয়-সাতজনের একটি দল ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। তখন আমার বাবা, মা ও আমার এক বোন এবং আমি দোতলার সিঁড়িতে আশ্রয় নিই। এ সময় আলবদররা আমার বাবার নাম ধরে ডাকে। এরা সবাই মুখোশ পরা ছিল। তখন আমার বাবা নিচে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন। তারপর তারা অস্ত্রের মুখে আমার বাবাকে আটক করে ধরে নিয়ে একটি গাড়িতে তোলে।

আমি পরিবারের মুরুব্বিদের কাছ থেকে আরো জানতে পারি বদর বাহিনীর লোকেরা আমার বাবাকে অপহরণের পূর্বে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ও আ ন ম গোলাম মোস্তফা সাহেবকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছে। জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্যই বদর বাহিনীর সদস্যরা একটি নীলনকশার মাধ্যমে এই সাংবাদিকদের অপহরণ করে।

আমরা ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের পর থেকে আমার বাবাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুর জল্লাদখানাসহ বিভিন্ন জায়গায় অনেক খোঁজাখুঁজির পরও বাবার লাশ পাইনি।’

এই সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকেও পাওয়া যায় বর্বরতার আরেক চিত্র। বাবাকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাবার লাশটিও খুঁজে পাওয়া গেল না। ঘটনার ভয়াবহতা শুধু শহীদের পরিবারকে শোকে মুহ্যমান করেনি, বিশ্বও হয়েছে হতবাক। দৈনিক পূর্বদেশে ২৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ‘আলবদরের নরপিশাচরা ওদের হৃিপণ্ড টেনে বের করেছে’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয় হয়, “...কুখ্যাত বদর বাহিনী বাংলার শত শত বুদ্ধিজীবীকে একই উপায়ে অপহরণ করে এবং তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে। বাংলার এই সব সুসন্তানদের খুনিরা প্রথমে মোহাম্মদপুরস্থ ফিজিক্যাল ট্রেনিং স্কুলে নিয়ে যায় এবং রায়েরবাজারের ইটখোলার কাছে বধ্যভূমিতে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। সৈয়দ নাজমুল হকের ভাগ্যেও এই-ই ঘটেছে।...শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক দেখতে গিয়েছিলেন এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড। পিশাচদের এই রক্তপিপাসা দেখে তাঁরা স্তম্ভিত হয়ে বাক্রুদ্ধ হয়ে গেছেন। তাঁরা বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে এরূপ নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ এই প্রথম। একজন বিদেশি সাংবাদিক এরূপও বলেছেন, ‘আমরা যে মানুষ তা এ দেখে বিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই।’ নিজেদের মানুষ বলে পরিচয় দিতেও আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত।” [রায়ের পৃষ্ঠা-৯৮-এ উদ্ধৃত]

সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফা অপহরণ ও হত্যা

শহীদ গোলাম মোস্তফার ভাই গোলাম রহমান দুলু ছিলেন তাঁর ভাইয়ের অপহরণের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল ২২-২৩ বছর। এই মামলার অপর সাক্ষী শহীদ গোলাম মোস্তফার ছেলে অনির্বাণ মোস্তফা। ১৯৭১ সালের ৫ মার্চ তাঁর জন্ম। বাবার মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন ৯ মাসের শিশু।

সাক্ষী আ ন ম গোলাম রহমান ওরফে দুলু ট্রাইব্যুনালে বলেন, “১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের একেবারেই আমরা যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত, ঠিক সেদিন ভোর ৬টার দিকে আমার ভাবির (জনাব আ ন ম মোস্তফা সাহেবের স্ত্রী) বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার সামসুদ্দোহা সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে একটি জিপে কয়েকজন মিলিশিয়া ও আলবদর আমাদের বাসার সামনে এসে থামে।...সেদিন আমার বড় ভাই তাঁর ৯ মাসের বাচ্চা অভিকে কোলে নিয়ে বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। এরই একপর্যায়ে আগত আলবদর ও মিলিশিয়ারা আমাদের বাসার দরজার কড়া নাড়ে। কড়া নাড়ার শব্দ শুনে আমার ভাই-ই দরজা খুলে দেন। আগত লোকেরা আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করে তিনি আ ন ম গোলাম মোস্তফা কি না। তিনি হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। দুই-তিনজন মুখোশধারী লোক ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে, বাকি বেশ কয়েকজন মিলিশিয়া ছাই রঙের পোশাক পরিহিত অবস্থায় অস্ত্র হাতে বাইরে অবস্থান করছিল।...আমার বাবা-মাসহ আমরা সকলেই কান্নাকাটি করতে থাকি। আমার বাবাকে আগন্তুকদের একজন সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘বিচলিত হওয়ার কিছু নেই, আপনার ছেলের পরিচয় নিশ্চিত করেই তিনি ফিরে আসবেন।’ এ কথা বলে আমার ভাইকে তারা তাদের সঙ্গে নিয়ে যায়।

বিজয় অর্জনের পর আমি প্রায় প্রতিদিন রায়েরবাজারের বধ্যভূমি থেকে শুরু করে ঢাকার আশপাশের প্রায় প্রতিটি বধ্যভূমিতে আমার ভাইয়ের লাশ খুঁজেছি। লাশ খুঁজতে গিয়ে অনেক অর্ধগলিত লাশ টেনে সরাতে হয়েছে। তখন অনেক লাশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। আমরা আর আমার ভাইয়ের লাশ খুঁজে পাইনি। আমার ভাইকে আলবদররা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে আমার বাবা যে শয্যাশায়ী হয়েছিলেন, তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। তিনি ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুবরণ করেছেন।”

অনির্বাণ মোস্তফা সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেন, “আমার বাবার মৃত্যুর সময় আমার বয়স ছিল মাত্র ৯ মাস। আমার মা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ আমার ছোট বোন ঊর্মি মোস্তফার জন্ম হয়। আমার মা বর্তমানে বেঁচে আছেন।

আমি শিশুকাল থেকেই পিতৃহারা হওয়ার কারণে আমার বেড়ে ওঠার সাথে সাথে আমার পিতার অপহরণ এবং হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়তে থাকে। যেহেতু আমি আমার বাবাকে বাবা বলে সম্বোধন করতে পারিনি, সেহেতু তাঁর ব্যাপারে এবং তাঁর অপহরণকারী যার নাম আমি পরবর্তীতে জেনেছি চৌধুরী মঈনুদ্দীন—এই দুইজন মানুষের ব্যাপারে আমার জানার আগ্রহ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়।

আমি জেনেছি, ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখ রাতে আমি সারা রাত ঘুমাইনি। সে কারণে ১১ ডিসেম্বর ভোরবেলা থেকেই আমার বাবা আমাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। সেদিন ভোর ৬টার দিকে একটি জিপে করে কিছু লোক রায়েরবাজার থেকে আমার বড় মামা ইঞ্জিনিয়ার সামসুদ্দোহা সাহেবকে নিয়ে আমাদের ঢাকার গোপীবাগের বাসায় আসেন। বাবাকে ওই আগন্তুকরা তাদের সঙ্গে দৈনিক পূর্বদেশ অফিসে যেতে বলেন। বাবা সেই যে গেলেন আর ফিরে আসেননি।

আমি আরো জেনেছি যে বাবা ফিরে না আসার কারণে বাসায় সবাই কান্নাকাটি করছিল, এই অবস্থায় আমার চাচা আ ন ম গোলাম রহমান বাবার খোঁজে দৈনিক পূর্বদেশ অফিসে যান। সেখানে গিয়ে তিনি এহতেশাম হায়দার চৌধুরী ও আতিকুর রহমানকে আমার বাবার অপহরণের কথা জানান। তখন তারা আমার চাচাকে বলেন সম্ভবত চৌধুরী মঈনুদ্দীন বিষয়টি অবগত আছেন। আমি এও শুনেছি, তখন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে ডেকে আমার চাচাকে সঙ্গে নিয়ে বাবার খোঁজ করতে বলেছিলেন; কিন্তু চৌধুরী মঈনুদ্দীন চাচাকে নিয়ে কয়েকটি জায়গায় খোঁজ করে জানিয়েছিলেন যে বাবার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমি চাচার কাছ থেকে শুনেছি, মঈনুদ্দীন যখন মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে প্রবেশ করছিলেন তখন দণ্ডায়মান প্রহরীরা তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করেছিল।...আমি আরো জানতে পেরেছি, ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের পর আমার চাচা ঢাকার আশপাশে অনেক বধ্যভূমিতে আমার বাবার লাশ খুঁজেছেন কিন্তু পাননি।”

কী অবর্ণনীয় বীভৎসতা! অসহায় স্বজনদের সামনে থেকে একজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বধ্যভূমিতে গিয়ে তাঁর লাশ খুঁজতে হয়েছে। লাশ পাওয়া যায়নি। বর্বর ঘটনাটি শহীদের বাবাকেও ঠেলে দেয় মৃত্যুর দিকে। মাত্র ৯ মাসের সন্তান অভি বাবার স্নেহ পাননি। বাবাকে কোনো দিন বাবা বলে ডাকতে পারেননি। এই করুণ চিত্র যে কারো হৃদয়কে করবে বেদনাক্রান্ত। নাড়া দেবে বিশ্ব বিবেক ও মানবতাকেও। তার পরও এই শহীদের পরিবার শত প্রতিকূলতায় সামনে এগিয়ে গেছে। এই অনির্বাণ মোস্তফা অভি যখন বাবা হারানোর কথা ব্যক্ত করতে ট্রাইব্যুনালে আসেন তখন তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক।

সাংবাদিক নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ অপহরণ ও  হত্যা

শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দীনের ছেলে সাফকাত নিজাম এই মামলায় সাক্ষ্য দেন। ১৯৭১ সালে সাফকাত নিজাম ওরফে বাপ্পী ছিলেন চার বছরের শিশু। তিনি বড় হয়ে তাঁর মা, নানা, নানি, মামা ও খালার কাছ থেকে তাঁর বাবার অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের কথা জানতে পারেন। এই পরিবারের কষ্ট পরিমাপের কোনো সুযোগ নেই। শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দীনের লাশটি তাঁরা খুঁজে পাননি। শহীদের সন্তান সাফকাত নিজাম এই ট্রাইব্যুনালে বিষাদময় যে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তার কিয়দংশ :

“আমার বাবা শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দীন আহমেদ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে এ দেশের মানুষের অধিকার নিয়ে কথাবার্তা বলতেন। ১৯৭১ সালে তিনি বিবিসি বাংলাদেশের সংবাদদাতা এবং পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনালের (পিপিআই)  জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। এটি একটি সরকারি সংস্থা ছিল। তিনি সরকারি সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়েও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত বাঙালিদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের চিত্র সারা বিশ্ববাসীর সামনে সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সাফল্যগাথাও বিবিসিতে তাঁর রিপোর্টে তুলে ধরতেন।

১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর কারফিউ ছিল। দুপুর আনুমানিক ১টা থেকে ২টার মধ্যে বাসার সবাই দুপুরের খাবার খেতে বসেছিলাম। এই সময় একপর্যায়ে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। দরজা খোলা মাত্রই আমাদের বাসায় দুজন অস্ত্রধারী প্রবেশ করে। তারা ভাঙা ভাঙা উর্দুতে আমার বাবার নাম ধরে খোঁজ করতে থাকে। আমার বাবা পরিবারের সবার নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি নিজেই খাবার টেবিল থেকে উঠে অস্ত্রধারীদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমিই নিজাম উদ্দীন আহমেদ।’ উনার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য অস্ত্রধারীরা তাঁর কাছে পরিচয়পত্র চায়। উনি একপর্যায়ে পরিচয়পত্র দেখান। তখন অস্ত্রধারীরা কালবিলম্ব না করে উনাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে থাকে। আমার মা তখন আমার বাবার পিছু পিছু যাচ্ছিলেন, তখন অস্ত্রধারীরা মাকে পেছনে যেতে মানা করে।

পরে আমরা আমাদের এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানতে পারি, একটি কাদামাখা মিনিবাসে করে উনার চোখ এবং হাত বেঁধে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এই সময় ওই গাড়িতে পেছন দিকে হাত বাঁধা এবং চোখ বাঁধা অবস্থায় আরো অনেক ব্যক্তি ছিলেন।

আমার বাবাকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার আগেই তিনি জানতে পেরেছিলেন যে তাঁর সহকর্মী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, সৈয়দ নাজমুল হক, আ ন ম গোলাম মোস্তফাসহ আরো কয়েকজন সাংবাদিককে আলবদররা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি এ ব্যাপারে একটি নিউজ করেছিলেন বলে শুনেছি। অন্য অপহৃতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার পরিবারের সদস্যরা আমার বাবাসহ অন্যদের খোঁজ করতে থাকে। কিন্তু আমার বাবার কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।...আমার বাবাকে অপহরণ এবং হত্যা করা সংক্রান্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে আমি যে বক্তব্য দিলাম, আমি তা আমার মা, নানা-নানি, মামা-খালা এঁদের কাছ থেকে বড় হয়ে শুনেছি।”

প্রগতিশীল মুক্তবাক একজন মানুষ ছিলেন শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দীন আহমেদ। স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের ঠিক কয়েক দিন আগেই নির্মমতার শিকার হন তিনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চলমান বর্বরতা অসীম সাহসে তিনি তুলে ধরেছিলেন বিশ্বের কাছে। এটিই কি ছিল তাঁর অপরাধ? কী নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাঁকে! অসহায় স্বজনদের সামনে থেকেই তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সবই উঠে এসেছে শহীদের সন্তান এই সাক্ষীর উচ্চারণ থেকে। ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয় তিনি দেখে যেতে পারেননি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে দেখতে পাই—

“খুনে রাংগা সোনার বাংলায় স্বাধীনতার সূর্য দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়নি সাংবাদিক জনাব নিজাম উদ্দীন আহমেদ তাদের অন্যতম।...জনাব আহমেদকে ১২ই ডিসেম্বর বিকেল দু’টায় কুখ্যাত আলবদর বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। গেস্টাপো আলবদর আলশামস বাহিনীর কলংকিত বধ্যভূমি ও সম্ভাব্য স্থানে খোঁজ করেও তাঁর কোন পাত্তা পাওয়া যায়নি।”  [রায়ের পৃষ্ঠা ১০৪-১০৫-এ উদ্ধৃত]

সাংবাদিক সেলিনা পারভিন অপহরণ ও হত্যা 

শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিনের ছেলে সুমন জাহিদ এই মামলায় সাক্ষ্য দেন। এই অভিযোগ প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য দেন রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে ফিরে আসা একমাত্র মানুষ দেলোয়ার হোসেনও। ১৯৭১ সালে সুমন জাহিদের বয়স ছিল আট বছর। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ শহীদ সেলিনা পারভিনের পরিবারের সদস্যরা রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাঁর লাশ শনাক্ত করেন এবং তা উত্তোলন করে আজিমপুর কবরস্থানে সমাধিস্থ করেন। শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিনের ছেলে সুমন জাহিদ বুকে একরাশ কান্না নিয়ে ট্রাইব্যুনালে বলেন :

“১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল আট বছর। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আনুমানিক দুপুর ১.৩০ মি. সময় আমি এবং আমার এক মামা (উজির) দুপুরের গোসল সেরে বাসার ছাদে অবস্থান করছিলাম। সে সময় মা রান্না করছিলেন। আমরা বুঝতে পারলাম বাসার সামনে কিছু গাড়ি এসে থেমেছে। তখন আমরা ১১৫ নিউ সার্কুলার রোডে (বর্তমানে ২৯ নম্বর শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিন সড়ক) থাকতাম।...কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বাসার কলাপসিবল গেটে কড়া নাড়ানোর আওয়াজ পাই। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে তখন জাতীয় পরিষদ সদস্য (সংসদ সদস্য) অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সৈয়দ সালাউদ্দিন সাহেব থাকতেন। তখন তিনি কলাপসিবল গেটটির দরজা খুলে দেন। আগন্তুকরা আমার মায়ের ফ্ল্যাট কোনটি জানতে চাইলে তিনি আমাদের ফ্ল্যাটটি দেখিয়ে দেন।...তখন আমাদের বাসার কড়া নাড়াবার আওয়াজ পাই। মা তখন দরজা খুলে দেন, তারা তখন মার পরিচয় জানতে চায়। আগন্তুকদের মধ্যে একজন তখন আমাদের দেখে ফেলে এবং বন্দুক তাক করে বলে হ্যান্ডসআপ। আমি এবং উজির মামা তখন হাত তুলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসি। তারা আমাদের পরিচয় জানতে চায়। মা তখন আমাকে দেখিয়ে বলেন এ আমার ছেলে, উজির মামাকে দেখিয়ে বলেন আমার ছোট ভাই। আগন্তুকরা উজির মামাকে দেখিয়ে বলে ইয়ে মুক্তি হ্যায়। এ সময় আমি মায়ের কাছে গিয়ে তাঁর আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। তখন আগন্তুকরা আমার মাকে বলে আপনাকে আমাদের সঙ্গে সেক্রেটারিয়েটে যেতে হবে। মা তখন বলেন আমার সঙ্গে তো কারফিউ পাস নেই, আমি কিভাবে যাব। আগন্তুকরা বলে, আমাদের কাছে কারফিউ পাস আছে অসুবিধা হবে না। আমি মায়ের সঙ্গে যেতে চাইলে তারা বাধা দেয়। এদের মধ্যে একজন বলে, বাচ্চা লোক নেহি জায়েগা, অন্দর মে যাও। আগন্তুকরা যারা এসেছিল, তাদের মুখ মাফলার দিয়ে ঢাকা ছিল এবং হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তাদের ধমকে আমি এবং মামা ভয় পেয়ে দরজার কাছে চলে যাই। এই সময় মা আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন যে ‘সুমন তুমি মামার সঙ্গে খেয়ে নিয়ো, আমি কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসব।’ এটাই ছিল আমার মায়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা। তখন আগন্তুকরা মায়ের হাতে থাকা একটি গামছা দিয়ে মায়ের চোখ বেঁধে ফেলে এবং ওদের হাতে থাকা মাফলারজাতীয় একটি জিনিস দিয়ে মাকে পিঠমোড়া করে বাঁধে। এই অবস্থায় আগন্তুকরা আমার মাকে কাদামাখা গাড়িটিতে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায়। আমরা তাঁর আর কোনো খবর পাইনি। 

এরপর ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী ও কবির চৌধুরীর ভাই শমসের চৌধুরীর কাছ থেকে আমার মেজো মামা ও উজির মামা জানতে পারেন রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে আমার মায়ের লাশ পড়ে আছে। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সেই লাশ সেখান থেকে উজির মামা ও মহসিন মামা শনাক্ত করে তা উত্তোলন করে আজিমপুর নতুন কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের পাশে দাফন করেন।”

এই সাক্ষীর সাক্ষ্যে যে নির্মম সত্য উঠে এসেছে, তা হলো একজন নারী যিনি মাতৃজাতির একজন, তাঁকেও বর্বররা রেহাই দেয়নি। শিশুপুত্র অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখেছে তার মাকে বেঁধে নিয়ে যেতে। কয়েক দিন পর সেই অসহায় শিশুর মায়ের লাশ রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে খুঁজে পাওয়া যায়। কী নির্মমতা! ট্রাইব্যুনাল রায়ে পর্যবেক্ষণ দেন যে এটি শুধু সেলিনা পারভিনকে হত্যা ছিল না, এটি ছিল মাতৃজাতি হত্যা, যা ‘ম্যাট্রিসাইড’। মানববিবেককে এটি আঘাত করেছে। আজ এই নির্মম সত্যটি সবাই জানুন। শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিনের প্রতি চরম নির্মমতার প্রতিফলন দেখতে পাই ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে দৈনিক পূর্বদেশ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে। এখানে বলা হয় :

‘বেগম সেলিনা পারভীনের লাশ মোহাম্মদপুর রায়ের বাজারের বিলের বধ্যভূমিতে তাঁহার ক্ষতবিক্ষত লাশ গত শনিবার পাওয়া গিয়াছে। গত ১৪ই ডিসেম্বর বেলা ২টায় বেগম সেলিনা পারভীনকে জামায়াতে ইসলামীর গুণ্ডা বাহিনী আল বদরের জল্লাদেরা তাঁহার সিদ্ধেশ্বরীর বাসভবন হইতে ধরিয়া নিয়া যায়।... বেগম সেলিনা পারভীনের ডান চোয়ালে দুইটি গুলির আঘাত ও পেটে বেয়নেটের আঘাত রহিয়াছে।’ [রায়ের পৃষ্ঠা ১০৮-এ উদ্ধৃত]

লেখক : হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর

সাবেক চেয়ারম্যান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা