kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

কেন এত মৃত্যুর আয়োজন?

সারওয়ার-উল-ইসলাম

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কেন এত মৃত্যুর আয়োজন?

চারপাশে যেন মৃত্যুর আয়োজন। গাছ কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। কমে যাচ্ছে অক্সিজেন। ভরাট করে ফেলা হচ্ছে খালগুলো। কোথাও কোথাও নদীর স্বচ্ছ পানিতে কারখানার দূষিত বর্জ্য ফেলার চলছে মহোৎসব। যত্রতত্র পলিথিন ফেলে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে ড্রেনের পানির চলাচল।

হার্টে ব্লক ধরা পড়লে দ্রুত তা অপসারণের জন্য আমরা শল্যচিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। রক্তনালিতে জমে থাকা চর্বি কেটে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয় কিংবা রক্তনালিতে রিং পরিয়ে রক্ত সঞ্চালন করা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রকৃতির সেই রক্তনালির মতো নদীগুলোতে বর্জ্য ফেলে তাকে কেন মৃত ঘোষণা করা হচ্ছে? বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার অবস্থা যেন ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে প্রকৃতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারাই যেন চলছে।

প্রকৃতির কোনো হাত নেই, পা নেই। তাইতো রাগে-ক্ষোভে তেড়ে আসে না। প্রকৃতির মুখ নেই, প্রতিবাদে প্রেস ক্লাবে আমরণ অনশনে অংশ নিতে পারে না। প্রকৃতি যেহেতু দুর্বল, তাই প্রকৃতির ওপর যত নিষ্পেষণ-জুলুম চালিয়ে যাচ্ছি।

সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে আমাজনের জঙ্গলে আগুন বা দাবানল বললেও ভুল হবে না বোধ হয়। যাকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। দক্ষিণ আমেরিকার ৯টি দেশের তিন কোটি মানুষের অক্সিজেন জুগিয়ে থাকে এই আমাজনের বর্ষা-অরণ্য। সেই আমাজনের জঙ্গলে সাধারণত প্রাকৃতিক কারণেই আগুন লাগে। শুকনা ডালপালা নিজেদের মধ্যে ঘষা খেয়ে বা কখনো বজ্রপাতের কারণে জঙ্গলে আগুন লেগে যায়। আর এই আগুন জঙ্গলের জন্য উপকারী। ছাইভস্ম থেকে কচি সবুজ চারা গজায়। আবার সবুজে ছেয়ে যায় আমাজন। কিন্তু এবারের আগুন মানুষ লাগিয়েছে—এমনটাই বলা হচ্ছে।

জানা গেছে, ওই জঙ্গলের আশপাশে যারা থাকে সেই মানুষেরাই নিজেদের গরু-ছাগলের জন্য ঘাসের প্রয়োজন হয় বলে জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। কারণ ছাইভস্ম থেকে আবার গজাবে সবুজ ঘাস। সেই ঘাস পশুকে খাওয়াবে তারা।

মানুষের এই লোভের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আমাজনের বর্ষা-অরণ্যে জ্বলছে আগুন। এর ফলে আমাজনের আশপাশের মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের বাঁচানোর অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেবে।

আর আমাদের দেশের সবুজ কেটে প্রাসাদসম অট্টালিকা গড়ে তুলছি। দেখার কেউ নেই। গড়ে তুলছি নগর। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির দূরত্ব এতই সরু যে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না। তার চেয়েও বড় কথা, যে পানি দিয়ে আগুন নেভানো হবে সেই পানি নেই। পুকুর-জলাশয় ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য পুকুর আছে দেশে? ছোট লেক বা জলাশয় আছে দেশে? নেই, দু-একটি থাকলেও অচিরেই হয়তো ভরাট করা হবে।

ঢাকার বাতাস কেন দূষিত? এ শহরে যেসব গাড়ি চলে, সেগুলো থেকে কালো ধোঁয়া বের হয়ে পরিবেশকে দূষিত করে ফেলছে। ঢাকার চারপাশে রয়েছে ইটভাটা। নিম্নমানের কয়লা ও প্লাস্টিক পোড়ানো হয়। তা ছাড়া কলকারখানার ধোঁয়া পরিবেশকে কলুষিত করছে। এসব কারখানার বেশির ভাগেরই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই।

ঢাকা শহরে কোথাও কোথাও দৃষ্টিনন্দন গাছপালা থাকলেও যানবাহনের ক্ষতিকর গ্যাসের কারণে সেগুলো টিকে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।

এ ছাড়া রয়েছে পরিকল্পনাহীন নগর উন্নয়ন। যখন যেখানে মনে হলো শুরু হয়ে গেল খোঁড়াখুঁড়ি। ধুলাবালিতে নগরবাসীর জীবন অতিষ্ঠ হলো কি না, সেদিকে কারো কোনো খেয়াল নেই। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২৪ নভেম্বর ঢাকা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহর। এদিন বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ১৯৪। এই তালিকায় দ্বিতীয় ভারত, বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ১৮২।

এই বায়ুদূষণের ব্যাপারে গবেষকদের মতামত হচ্ছে, বায়ুদূষণের বড় কারণ বৃষ্টি কম হওয়া, ঢাকার আশপাশ থেকে দূষিত বাতাস আসছে, চলছে নগর উন্নয়নে খোঁড়াখুঁড়ি, কনস্ট্রাকশনের কাজের কারণে বেড়ে গেছে ধুলাবালি।

এই বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, চোখের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে, গর্ভবতী মায়েরা যখন দূষিত বাতাস থেকে শ্বাস নিচ্ছে তখন সন্তানের ফুসফুস ও মস্তিষ্কেও তা পৌঁছে যায়। গর্ভের শিশুর মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে তখন সমস্যা দেখা দেয়।

সংকট কোথায় নেই? বিশুদ্ধ পানি না পাওয়ার খবর প্রায়ই আমরা পত্রপত্রিকায় দেখে থাকি। বলা হয় পানির অপর নাম জীবন। এই পানিই একদিন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও এখন থেকে ভাবার দরকার আছে। নদী মরে যাচ্ছে, খননের ব্যবস্থা নেই। কারণ নদী মরে গেলে লাভ, ভরাট করে গড়ে উঠবে নগর, কার আগে কে দখল করবে সেই জায়গা, এই প্রতিযোগিতায় যখন লোভাতুর মানুষ মগ্ন তখন কে বাঁচাবে নদীকে। নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমেই তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পানির চাহিদা মেটাই। কিন্তু পানি নেই। তাই ভূগর্ভস্থ পানি মেশিনের মাধ্যমে টেনে তোলা হচ্ছে। সেখানেও সংকট দেখা দিচ্ছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে ভূগর্ভে পানি নেই। তাইতো পাহাড় অঞ্চলের মানুষকে এখন অনেক দূরের ছড়া আর ঝরনার খোঁজ করতে হয়।

প্রকৃতির ওপর মানুষের এই যে নির্মম আচরণ, কত আর সহ্য করা যায়? তাইতো বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাঝেমধ্যে এসে জানান দেয় প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিতে পারে। প্রকৃতি অনেক কিছু নীরবে সহ্য করলেও যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন সে আর চুপ থাকে না।

আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত এবং তা এখনই। মানুষ যেমন পৃথিবীর একটি অংশ, তেমনি প্রকৃতিও পৃথিবীর সৌন্দর্যের একটি অংশ। কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। উভয় মিলেই এ পৃথিবীর সব কিছু ভোগ করতে হবে।

প্রকৃতির সৌন্দর্য পাহাড়; পাহাড় কাটা যাবে না। নদীও প্রকৃতির আরেক সৌন্দর্য, তাই এর রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। বনভূমি প্রকৃতিকে সাজিয়েছে অপরূপ সাজে, তাই একে কেটে সাফ করা যাবে না। পানির অপর নাম যেহেতু জীবন, তাই এর বিশুদ্ধতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা মানুষকেই নিতে হবে। ইটভাটাকে সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র অবশ্যই নিতে হবে এবং তা হতে হবে লোকালয় থেকে অনেক দূরে।

পলিথিনের ব্যবহার অবশ্যই নিষিদ্ধ করতে হবে। প্লাস্টিক বা কারখানার বর্জ্য কোনোভাবেই নদীতে ফেলা যাবে না। এই বর্জ্য পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মাছের মৃত্যুর প্রধান কারণ। নগরের ভেতরে যেখানে জলাশয় বা লেক আছে, এগুলো পুনরুদ্ধার করে স্বচ্ছ পানির ব্যবস্থা করতে হবে। তার চারপাশে গাছ লাগিয়ে নগরের সৌন্দর্য বাড়াতে হবে।

প্রকৃতিকে ভালোবাসলেই শুধু আমাদের ভালোবাসায় সুশীতল ছায়ায় রাখবে প্রকৃতি। কারণ ভালোবাসা তো একতরফা হয় না। যাকে ভালোবাসেন তারও আপনাকে ভালোবাসতে হবে। তবেই তা সৌন্দর্যে পরিণত হবে। না হলে সেটা হবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ভয়াবহ ব্যাপার।

আমরা তো সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ চাই না। চাই সুশীতল বসুন্ধরায় সবুজের মাঝে বাঁচতে।

 

লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা