kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিনোদনের ক্রিকেটে আউটপুটটাই আসল

ইকরামউজ্জমান

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিনোদনের ক্রিকেটে আউটপুটটাই আসল

ক্রিকেটপ্রেমীরা উন্মুখ হয়ে আছে চার-ছক্কার বিনোদনের ক্রিকেট উপভোগ করার জন্য। টি-টোয়েন্টি স্বল্প সময়ে অনেক বেশি নির্মল উত্তেজনা আর আনন্দের সান্নিধ্য দেয়। ক্রিকেট অনিশ্চিত। টি-টোয়েন্টি আরো বেশি অনিশ্চিত। তিন-চার বলেই খেলার রং পাল্টে যায়। আশা-নিরাশা, স্বস্তি-অস্বস্তিতে ভরপুর এই ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা এসব সত্ত্বেও এখন তুঙ্গে। ঘড়ির কাঁটার ক্রিকেটের প্রতি কী প্রচণ্ড আকর্ষণ আর ভালোবাসা। এই ক্রিকেট শতভাগ ফিট এবং ভয়ডরহীন সাহসী ক্রিকেটারদের—যাঁদের সবাইকে পারফরম করতে হয় নিজস্ব অবস্থান থেকে। মাঠে এই খেলার ক্রিকেটারদের শারীরিক ভাষাটাই আলাদা। বিসিবি এবারের বিপিএল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে উৎসর্গ করেছে। ঢাকা ছাড়াও খেলা হবে চট্টগ্রাম ও সিলেটে। গত রবিবার সন্ধ্যায় নাচে-গানে ভরপুর জমকালো অনুষ্ঠানে টুর্নামেন্টের সাফল্য কামনা করে বঙ্গবন্ধু বিপিএলের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্পন্সর হিসেবে বিসিবির পাশে ছিল বসুন্ধরা গ্রুপ।

সাত দলের অংশগ্রহণে বিপিএলের চিন্তা এবং নিয়ম-নীতি এবার একেবারে আলাদা। প্রতিটি দলের ফ্র্যাঞ্চাইজি—বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী স্মরণীয় করে রাখার জন্য ক্রিকেট বোর্ড বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে সব দলের দায়িত্বভার নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিপিএলের আসর নতুন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। এর গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে দলগুলোর মাঠের লড়াইয়ের ওপর আর এই লড়াইয়ে স্থানীয় ক্রিকেটারদের ভূমিকা এবং তাঁদের থেকে পাওয়া ‘আউটপুট’।

আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলবে বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটে এবারের বিপিএল ক্রিকেটারদের জন্য অনেক বড় সুযোগ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরার। নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। ভালো বিদেশি খেলোয়াড় সব দলেই আছেন, তাঁদের সঙ্গে একসঙ্গে অনুশীলন, ড্রেসিংরুম শেয়ার এবং মাঠে ইতিবাচক ‘মাইন্ডসেট’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সাধারণ দৃষ্টিতে বলা হয়, টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানদের খেলা! বোলাররা পেছনে পড়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি ঠিক তা নয়—এখানে উভয়ই উজ্জ্বল, যদি ঠিকঠাকমতো পারফরম করতে পারেন। খেলাটি তো বুদ্ধিদীপ্ত, সাহসী, ইতিবাচক মানসিকতা ও মনঃসংযোগের অধিকারী ক্রিকেটারদের। খেলা থেকে সরে গেলেই বিপদের সঙ্গে আলিঙ্গন। স্বল্প সময়ের ক্রিকেটে তো ভুল সংশোধনের সুযোগ নেই। স্থানীয় ক্রিকেটাররা বিদেশিদের সঙ্গে থেকে নিজ দুর্বলতা নির্ণয় করে, সংশোধিত হয়ে খেলার চেষ্টা করবেন—এটাই কাম্য। পারফরম্যান্সে উন্নতি করা ছাড়া উপায় নেই। দল হিসেবে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ভালো খেলে না—এটাই বাস্তবতা। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে।

নিজের প্রত্যাশা, দলের প্রত্যাশা থাকবেই। এই চাপটা নিতে হবে। কাজটা কঠিন। চাপটা শুষে নিতে হবে। হজম করতে হবে। এটা করতে না পারলে ভালো খেলা যাবে না। কাজটি কিভাবে করতে হবে—এই পথটি নিজেকে খুঁজে নিতে হবে। ভালো ক্রিকেটাররা একটি বলয় তৈরি করেন, যার বাইরে কিছুই তাঁদের স্পর্শ করে না।

কেউ কেউ বলে থাকেন, বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ভালো খেলবে কিভাবে? পাওয়ার হিটার কোথায়? আসলে পাওয়ার শাণিয়ে নেওয়াই আসল বিষয়। ভারতের অধিনায়ক বিরাট কোহলি কিভাবে খেলেন? শক্তি নয়, স্কিলের খেলা টি-টোয়েন্টি। ভয়ডরহীনভাবে খেলতে হয়। ভয়ে কুঁকড়ে থাকলে প্রতিপক্ষ গুঁড়িয়ে দেবে।

আধুনিক ক্রিকেটের ধরনটা পাল্টে গেছে। টি-টোয়েন্টিতে অধিনায়ককে ‘ট্যাকটিক্যালি’ও বিভিন্নভাবে ভাবতে হয়। খেলাটি বড্ড ঝুঁকির। মোটেই ধুমধাড়াক্কার খেলা নয়। এটি রীতিবদ্ধ ক্রিকেট। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে তখন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন মানিয়ে নেওয়ার জন্য পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন আনতে হয়।

আমরা খেলাকে ভালোবাসি। বিশ্বাস করি, খেলার আয়োজন মানেই লক্ষ্যপূরণের পথে বাধা। দেশে এমন একটি সময়ে সবাই বিপিএল নিয়ে মেতে উঠেছি, যখন জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা নিজেরা নিজেদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। একটি বাজে সময়ের মধ্যে ক্রিকেট আটকে পড়ে আছে। বারবার দেশের ক্রিকেটাররা সমর্থক ও ভক্তদের মুখ নিচু করেছেন। বিশ্বকাপের পরপর শ্রীলঙ্কা সফরে ব্যর্থতা, এরপর আফগানিস্তানের বিপক্ষে দেশের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে অবাক হওয়ার মতো করুণ পরাজয়, সব শেষে ভারতের বিপক্ষে এই প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ সিরিজে নাকানিচুবানি। কেউ ভাবেননি, বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে জিতবে—কিন্তু সেখানে দল যেভাবে খেলেছে, সেটা ছিল ভয়াবহ। দেশের অগণিত মানুষ টিভিতে খেলা দেখেছে—‘বল টু বল’। বাংলাদেশ দল কী ক্রিকেট খেলেছে! এই ব্যর্থতার পেছনে তো কারণ আছে। ন্যক্কারজনক খেলার তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তের কথা বলাও হয়েছে। বাংলাদেশ দলকে তো ঘুরে দাঁড়াতে হবে। শুধু ক্রিকেটার নয়, টিম ম্যানেজমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ড পরিচালকদেরও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। কেউ তো দেশের স্বার্থের চেয়ে বড় নয়। তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসবে আসল অবস্থা এবং প্রকৃত ঘটনা। ভবিষ্যতে সংশোধন এবং সঠিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তদন্তের রিপোর্ট আলোর মুখ দেখার প্রয়োজন আছে। যত দ্রুত এই কাজটি করা সম্ভব হবে—মঙ্গল হবে দেশের ক্রিকেটের। বিশ্বাস করি, বোর্ড প্রেসিডেন্ট বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবেন। তিনি নিজেও ক্রিকেট নিয়ে চিন্তিত—এটা তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে। দেশের ক্রিকেটে সুস্থ জীবনবোধ প্রাধান্য পাক।

বাংলাদেশ নেপালে অনুষ্ঠিত ১৩তম সাউথ এশিয়ান গেমসে ভালো করেছে। কাঠমাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত পুরুষদের ক্রিকেট (নারীদের ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয়েছে পোখারায়) মাঠে উপস্থিত থেকে আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। নারী ক্রিকেটাররা দেশকে গৌরবান্বিত করেছেন স্বর্ণ জয়ের মাধ্যমে। সোমবার পুরুষদের ক্রিকেটেও সোনা জিতেছে বাংলাদেশ। ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে পরাজিত করেছে ৭ উইকেটে। ভারত ও পাকিস্তান ক্রিকেটে অংশ নেয়নি। এটা তাদের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত। আমরা আনন্দিত—দেশ পদক জিতেছে। তবে এই সাফল্যকে ব্যবহার করে বা বঙ্গবন্ধু বিপিএল শুরু হচ্ছে, অতএব সব কিছু চাপা পড়ে যাবে, মানুষ সব কিছু ভুলে যাবে—এ ধরনের চিন্তা ক্রিকেটার ও কর্মকর্তাদের মাথা থেকে সরাতে হবে। নিজের সঙ্গে প্রতারণা তো আত্মহননের মতো!

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা