kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশ্ব আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার

মো. জাকির হোসেন

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বিশ্ব আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার

মানবতার প্রতি হিটলার ও তাঁর নািস বাহিনীর ভয়ংকর নির্যাতন ও মানব মর্যাদার অবর্ণনীয় অবমাননাকে যাঁরা চূড়ান্ত সীমারেখা মনে করেছিলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতার মাত্রা দেখে তাঁরাও আঁতকে উঠতে বাধ্য হবেন। জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সদস্য রাধিকা কুমারাসামি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের গণহত্যার মাধ্যমে তারা ধ্বংস করতে চেয়েছিল এবং তাদের পালাতে বাধ্য করেছে।’ মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী ও কিশোরীদের কাঠামোবদ্ধ হত্যা ও ধর্ষণ, গর্ভবতী নারীদের ধর্ষণ, শিশুদের ওপর হামলা, জননাঙ্গে আঘাত, স্পর্শকাতর স্থানে হামলা ও তার প্রদর্শন করেছে। এ ছাড়া নারীদের এমনভাবে আঘাত করা হয়েছে, যেন তারা স্বামীদের সঙ্গে সহবাস করতে না পারে এবং সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়ে। বেশির ভাগ আক্রমণই ছিল নারী ও কিশোরীদের ওপর। তাদের সিগারেটের আগুনে পোড়ানো হয়েছে, ছুরি দিয়ে কাটা হয়েছে এবং সামরিক ঘাঁটিতে বেশ কয়েকজনকে যৌনদাসী করেও রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে পুরুষদের ওপরও ধর্ষণ, জোরপূর্বক নগ্ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পশুত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে জাতিসংঘ প্রতিবেদনের একটি ঘটনায় উল্লেখ রয়েছে, কাচিনের মিতকিনা শহরে মিয়ানমারের গোয়েন্দারা দুজন পুরুষকে জোরপূর্বক নগ্ন করে পরস্পরকে ধর্ষণ করতে বাধ্য করেছে। এই দৃশ্য দেখে হাসতে হাসতে তারা প্রশ্ন করে, ‘তোমরা উপভোগ করছ তো?’ চার দশক ধরে এই গ্রহের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধন, গণহত্যা, ধর্ষণ, শত শত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে রোহিঙ্গাদের সাংবিধানিক মৃত্যু ঘটানো হয়েছে। বিশ্ববাসী দেখেছে, শুনেছে। জীবন হাতে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে নানা দেশ থেকে নানা ডেলিগেশন এসেছে এবং বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকা মৃদুস্বরে প্রতিবাদ করেছে, কিংবা মিয়ানমারের ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে বিবৃতি দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান বিবৃতি আর গভীর পর্যবেক্ষণের ফাঁদে আটকা পড়ে ছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সভায় যোগ দিয়ে মুসলিম নেতাদের প্রতি আবেগঘন বক্তৃতায় রোহিঙ্গা মানবতার প্রতি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৫৭ সদস্যের ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমর্থনপুষ্ট হয়ে আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, নিপীড়নের মাধ্যমে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ প্রণীত গণহত্যা চুক্তির বিধান লঙ্ঘন করায় গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সংসদ ও রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক প্রণীত আইন যেমন রাষ্ট্রীয় আইনের সবচেয়ে বড় উৎস, তেমনি আন্তর্জাতিক আইনের প্রধান উৎস হলো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত আইন সৃষ্টিকারী আন্তর্জাতিক চুক্তি। আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—চুক্তি অবশ্যই পালনীয় (Pacta Sunt Servenda)। গণহত্যা চুক্তির অনুচ্ছেদ-১ অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং বিশ্বময় প্রতিরোধে সব রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। চুক্তির ২ অনুচ্ছেদে গণহত্যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, গণহত্যা এমন কর্মকাণ্ড, যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই চুক্তির অধীনে যে কর্মকাণ্ডকে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা হলো—ক. পরিকল্পিতভাবে একটি জাতি বা গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য তাদের সদস্যদের হত্যা বা নিশ্চিহ্নকরণ। খ. তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিসাধন। গ. পরিকল্পিতভাবে একটি জাতি-গোষ্ঠীকে ধ্বংসসাধনকল্পে এমন জীবননাশী অবস্থা সৃষ্টি করা, যাতে তারা সম্পূর্ণ অথবা আংশিক নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ঘ. এমন কিছু ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে একটি জাতি বা গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা হ্রাস করতে গোষ্ঠীর সদস্যদের সন্তান জন্মদানকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এবং ঙ. একটি জাতি বা গোষ্ঠীর শিশু সদস্যদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্মপরিচয় ও জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলা হয়। গণহত্যা চুক্তির ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শুধু হত্যাকাণ্ডই শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়, বরং গণহত্যার পরিকল্পনা—এই হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও প্রকাশ্য উসকানি প্রদান, গণহত্যার প্রচেষ্টা চালানো ও গণহত্যায় সহায়তা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রী Abubacarr M Tambadou গণহত্যা চুক্তিতে বর্ণিত দায়দায়িত্ব পালনে মিয়ানমারের ব্যর্থতার অভিযোগ এনে গত ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের ছয়টি প্রধান অঙ্গসংস্থার অন্যতম আন্তর্জাতিক আদালত তথা International Court of Justice (ICJ)-এ মামলা করেন। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ কয়েক বছর সময় প্রয়োজন। তাই মামলা দায়েরকারী মূল মামলার পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকার চেয়েও আবেদন করেছেন। আবেদনকারীর অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকার জরুরি কি না এবং তা মঞ্জুর করা হবে কি না, সে বিষয়ে ১০-১২ ডিসেম্বর হেগে অবস্থিত এই আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকারের আদেশ আদালত দ্রুততার সঙ্গে প্রদান করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ Bosnia and Herzegovina vs. Federal Republic of Yugoslavia মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকার চাওয়া হয় ১৯৯৩ সালের ২০ মার্চ, আর তা মঞ্জুর করে ICJ আদেশ দেন ৮ এপ্রিল ১৯৯৩।

বৈশ্বিক এই আদালতের বিচারকসংখ্যা ১৫। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আদালতে মামলার পক্ষগুলোর নিজ দেশের কোনো নাগরিক বিচারক হিসেবে না থাকলে মামলার শুনানির জন্য নিজেদের ইচ্ছামতো একজন করে অ্যাডহক বিচারক নিয়োগ দিতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত ও রুয়ান্ডা গণহত্যা মামলার বিচারে জাতিসংঘ গঠিত অস্থায়ী ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক এবং জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার হাইকমিশনার Dr. Navanethem (Navi) Pillay-কে গাম্বিয়া তার পক্ষে অ্যাডহক বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমার জার্মান একাডেমিক ও কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক Professor Claus Kress-কে নিয়োগ দিয়েছে।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়া যেসব অভিযোগ আনয়ন করেছে, তা হলো—এক. মিয়ানমার গণহত্যা না করা বিষয়ে গণহত্যা চুক্তির পক্ষ হিসেবে যে অঙ্গীকার করেছে, রোহিঙ্গা গণহত্যার মাধ্যমে সেই দায়দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছে। দুই. গণহত্যার অভিপ্রায়ে তথা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করা তথা নিশ্চিহ্ন করার অভিপ্রায়ে তাদের ধারাবাহিকভাবে দশকের পর দশক ধরে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার অংশ হিসেবে সন্তান জন্মদান বাধাগ্রস্ত করতে তাদের বিয়ের অধিকারের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। তিন. রোহিঙ্গা গণহত্যায় উসকানি দিতে মিয়ানমার ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। চার. রোহিঙ্গা জাতি-গোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করতে গণহত্যার অংশ হিসেবে মিয়ানমার ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের হত্যা করেছে, ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে, ব্যাপক হারে নারী ও শিশুদের ওপর ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। পাঁচ. রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের গণহত্যা কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। নভেম্বর ২০১৮ থেকে মে ২০১৯-এর মধ্যে অন্তত ৩০টি রোহিঙ্গা গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ Independent International Fact-Finding Mission on Myanmar-এর সতর্কবার্তার বরাত দিয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারে অবস্থান করা প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা গণহত্যার হুমকির মুখে রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদনে গাম্বিয়া ICJ-এর কাছে যেসব প্রতিকার চেয়েছে, তা হলো—এক. রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় আদালতের আদেশ অতি জরুরি। দুই. গণহত্যা প্রতিরোধে আশু ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে আদেশ দান। তিন. মিয়ানমার সেনাবাহিনী যাতে আর কোনো গণহত্যামূলক কাজ করতে না পারে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করতে মিয়ানমারকে আদেশ প্রদান। চার. গণহত্যার আলামত যাতে ধ্বংস করা না হয় কিংবা আলামত সংগ্রহকে যাতে অনভিগম্য করা না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আদেশ প্রদান।

আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। নেপথ্যে থেকে গাম্বিয়াকে বাংলাদেশ, কানাডা ও নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা জোগানো উৎসাহব্যঞ্জক। তবে এই মামলার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গাদের প্রতি নজিরবিহীন নিষ্ঠুর-নির্মম আচরণ করা হয়েছে। রোহিঙ্গা মানবতার ভয়ংকর অবমাননা করেছে মিয়ানমার। কিন্তু মনে রাখতে হবে, গতানুগতিক অর্থে যাকে আমরা ‘গণহত্যা’ বলে থাকি, অনেক ক্ষেত্রে তা গণহত্যা নয়। কম্বোডিয়ায় ১.৮ মিলিয়ন মানুষের হত্যাকে গণহত্যার সংজ্ঞায় বাঁধা যায়নি। তা বিবেচিত হয়েছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে। গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলাটি গণহত্যা চুক্তির বিধান লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে। চুক্তি অনুযায়ী গণহত্যা বলতে জনগোষ্ঠীর আংশিক বা সম্পূর্ণ বিনাশের ‘অভিপ্রায়’ প্রমাণ করতে হবে। জাতিগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মগত নিধনের অভিপ্রায়ে যদি একাধিক লোককেও হত্যা করা হয়, সেটা গণহত্যা। গণহত্যার অভিপ্রায় প্রমাণ খুবই জটিল ও কষ্টসাধ্য। মিয়ানমার হয়তো হত্যাকাণ্ডকে অস্বীকার করবে না। কিন্তু তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করবে, এটি মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর রোহিঙ্গাদের (মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে স্বীকার করে না) সন্ত্রাসমূলক কাজের পাল্টা ব্যবস্থা, কোনোভাবেই গণহত্যা নয়। এ মামলায় গাম্বিয়া জিতলেও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের মতো কোনো অপরাধীকে ব্যক্তিগতভাবে দণ্ডিত করার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক আদালতের নেই। মামলাটি মিয়ানমার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, গাম্বিয়া জিতলে রায়ও হবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন হলো, আদালত কী প্রতিকার দিতে পারেন? আন্তর্জাতিক বিচারিক ক্ষেত্রে একটি বহুল পরিচিত প্রতিকার হলো Reparation, যাকে ভুল করে কেউ কেউ ক্ষতিপূরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু প্রতিকার হিসেবে Reparation অনেকগুলো প্রতিকারের সমষ্টি। উদাহরণস্বরূপ, আর্থিক ক্ষতিপূরণ, অপরাধ সংঘটন বা অধিকার লঙ্ঘনের আগের অবস্থায় ফেরত নেওয়া, দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনা ইত্যাদি। রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান হলো, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফেরত প্রদান ও মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে ফেরত নেওয়া, রোহিঙ্গাদের কেড়ে নেওয়া জায়গাজমি ফেরত প্রদান এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি। গণহত্যা চুক্তির দায়দায়িত্ব লঙ্ঘনের মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত নাগরিকত্ব ইস্যু ও জায়গাজমি ফেরতদান, বিতাড়িতদের ফেরত নেওয়ার বিষয়াবলিকে রায়ে প্রতিফলন ঘটাবেন কি না তা সময়ই বলে দেবে। তবে ইচ্ছা করলে আদালত সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করে গণহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারের আইন সংস্কারের বিষয়ে রায়ে উল্লেখ করতে পারেন। আদালতের বিচারকদের মধ্যে এশিয়া মহাদেশ থেকে ভারত, চীন, জাপান ও লেবাননের বিচারক রয়েছেন। তাত্ত্বিকভাবে তাঁরা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নন, স্বাধীনভাবে বিচারকাজ করবেন বলে আইনে উল্লেখ রয়েছে। তবে মানুষ হিসেবে যে রাজনৈতিক ও আইনগত মূল্যবোধ তাঁরা ধারণ করেন, লালন করেন তার প্রভাব রায়ে পড়বে না—এ কথা হলফ করে বলা যায় না।

গাম্বিয়ার পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী আইনজীবী দল রয়েছে। দলের সদস্যরা আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা পরিচালনায় আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে অভিজ্ঞ ও গণহত্যা বিষয়ে আইনবিশারদ। আদালতে উপস্থাপনের জন্য রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা রয়েছেন। গণহত্যার পক্ষে জাতিসংঘের একাধিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের জোরালো প্রতিবেদন রয়েছে। স্যাটেলাইট ইমেজসহ একাধিক মানবাধিকার এনজিওর হাতে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের প্রামাণ্য দলিল রয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃক গণহত্যার আলামত ধ্বংসের প্রমাণ গচ্ছিত রয়েছে। মামলায় গাম্বিয়ার জয়ের সম্ভাবনা প্রবল। জাতিসংঘ সনদের ৯৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ও গণহত্যা চুক্তির পক্ষ হিসেবে মামলার উভয় পক্ষই রায় মেনে চলতে বাধ্য। কোনো পক্ষ রায় না মানলে তা কার্যকর করার দায়িত্ব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের। আন্তর্জাতিক আদালত এ মামলার আগে গণহত্যা সম্পর্কিত আরো দুটি মামলার রায় দিয়েছেন এবং তার বাস্তবায়নও হয়েছে। আদালতের নজির আন্তর্জাতিক আইনের উৎস, তা আন্তর্জাতিক আদালতের সংবিধিতে উল্লেখ রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকারের আবেদনে আন্তর্জাতিক আদালত কিভাবে সাড়া দেন তা দেখতে কয়েক মাস, আর মূল মামলার রায় কী হয় তা জানতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। আদালতের রায় মেনে মিয়ানমার ব্যবস্থা না নিলে নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘভুক্ত কয়েকটি রাষ্ট্র, বিশেষ করে চীন, রাশিয়া কী ভূমিকা পালন করে, তার জন্য শুধুই অপেক্ষার পালা। তবে মামলার শুনানির আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফর তাৎপর্যপূর্ণ।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা