kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশ্ববিদ্যালয় সচল হলেও শঙ্কা কাটেনি

এ কে এম শাহনাওয়াজ

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



বিশ্ববিদ্যালয় সচল হলেও শঙ্কা কাটেনি

মাসাধিককালের অচলাবস্থা কাটিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। ছাত্র-শিক্ষক সবাই ক্লাসে ফিরে যাওয়ার জন্য উন্মুখ ছিলেন। এবারের এই অচলাবস্থা অনেকটাই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। আন্দোলনের আদর্শিক শক্তি এত কম ছিল যে অনেক চেষ্টায়ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকারীরা পথে নামাতে পারেননি। এসব কারণে মনে হয়েছিল আন্দোলন এমনিতেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে সময়মতো সরকারের ভূমিকা রাখার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় সরকারপক্ষ জল ঘোলা না হওয়ার আগে দর্শকের ভূমিকায় থাকে। ক্ষতি যা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের।

রাজনীতিসংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও ছাত্রদের একাংশের ভিসিবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে প্রশাসনিক ও  একাডেমিক ভবনে তালা লাগান আন্দোলনকারীরা। এখান থেকেই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এরপর একপর্যায়ে উপাচার্যের আবাসিক ভবন ঘেরাও করে একটি নৈরাজ্যিক পরিবেশের সৃষ্টি করা হয়। একসময় ভিসি ভবনের সামনে থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে এগিয়ে আসেন শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই ছিলেন ছাত্রলীগ দলভুক্ত। তাঁদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। যেহেতু আন্দোলনকারীরা সংখ্যায় অল্প ছিলেন, তাই তাঁদের অনেকটা বলপূর্বক হটিয়ে উপাচার্যকে অবরোধমুক্ত করে প্রশাসনিক ভবনে যাওয়ার পথ করে দেওয়া হয়।

এরপর আন্দোলনকারীরা প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করলে পরিবেশ আরেকটু ঘোলাটে হয়। ছাত্রলীগের সঙ্গে আরো সংঘর্ষের আশঙ্কা করতে থাকে অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে সিন্ডিকেট বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে হল খালি করার সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর চূড়ান্তভাবে অচল হয়ে যায় ক্যাম্পাস।

আমরা অনুমান করেছিলাম সরকারের দপ্তরে আন্দোলনকারী এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ অভিযোগ ও প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার পর সরকার দ্রুত তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেবে এবং অবসান ঘটবে অচলাবস্থার। তবে সরকারি সবুজ সংকেত আছে কি না জানি না, কর্তৃপক্ষ শিক্ষাজীবনের গতি ফিরিয়ে আনতে শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত নেয়।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির অঙ্গনে আন্দোলনপ্রিয় দুই-একটি সংগঠন রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে তাদের ক্ষয়িষ্ণু দশা। সাধারণ মানুষের সহানুভূতি থেকে অনেক আগেই ছিটকে পড়েছে এসব সংগঠন। এখন নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে শেষ আশ্রয়স্থল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সরকারি ছাত্রসংগঠন বিএনপি আমলের ছাত্রদল ও আওয়ামী লীগ আমলের ছাত্রলীগ যেমন কৃতকর্মের জন্য সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীর আস্থা হারিয়েছে, একইভাবে বাম সংগঠনের প্রতিও একই রকম আস্থাহীনতা রয়েছে। এ ধারার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সংখ্যায় কম হলেও আন্দোলন সংঘটনের সুযোগ পেলেই সোচ্চার হন। আর তা যুক্তি-প্রমাণের বাছবিচার না করেই। আন্দোলন সংঘটনের পারঙ্গমতায় তাঁরা অভিজাত বলে ‘ছোটখাটো’ ইস্যুতে আন্দোলন করতে যান না। তাঁরা ভিসি তাড়িয়ে আরেক ভিসি বসানো, অতঃপর তাঁকে তাড়িয়ে আরেক ভিসি বসানোর খেলায় আনন্দ পান বেশি। তাই তাঁদের আন্দোলনে কখনো শিক্ষা-গবেষণার অধিকার, শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের সংকট নিয়ে আন্দোলনে আগ্রহ দেখা যায় না। ফলে ভয়ানক দ্বিচারিতা দেখা যায় তাঁদের মধ্যে। একাডেমিক ভবনে তালা দিয়ে পিকেটিং করে শিক্ষা কার্যক্রম রুদ্ধ করে দেন, আবার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে হল খালি করে দিলে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তাহলে কি এই প্রতিবাদ ছাত্রকল্যাণের জন্য, নাকি জনবলের অভাবে আন্দোলন জমবে না বলে?

আমি মনে করি, আন্দোলনকারীরা যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার প্রশ্নে দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ ও প্রমাণপত্র দাখিল করে তদন্তের ফলাফল পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রেখে শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক করায় ভূমিকা রাখতেন। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের পর প্রয়োজনে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। অথচ একদিকে বিচার চাইছেন, আবার অন্যদিকে আন্দোলনের নিত্যনতুন কর্মসূচি দিয়ে গেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় খোলার দিনও আবার মিছিল করেছেন আন্দোলনকারীরা। এখানেও মন্ত্রণালয়ে বিচার চাওয়ার পরও অপেক্ষা করলেন না। একজন প্রত্যক্ষদর্শী সহকর্মী জানালেন, আগের মতোই ২০-২৫ জনের মিছিল ছিল। ছাত্র-শিক্ষকের চেয়ে নাকি বেশি ছিল সাংবাদিক। যাঁদের কল্যাণে আন্দোলন কিছুটা সচল রয়েছে। আর দেশবাসীও একটি ভুল ধারণা পেয়েছে জাহাঙ্গীরনগর পরিস্থিতির অন্তর্নিহিত বাস্তবতা সম্পর্কে। কিন্তু এখন মুশকিল হচ্ছে, ভাঙা হাট আবার জমানো কঠিন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ইস্যু নিয়েই অনেক দিন ধরে ভিসিবিরোধী একটি আন্দোলন তৈরির চেষ্টা চলছিল ভিসির পদপ্রত্যাশী একটি শিক্ষক গ্রুপের। একে একে ইস্যু জমানোর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর একটি অডিওবার্তা সামনে আসায় মোক্ষম ইস্যু তৈরি হয় তাদের। অডিওতে আত্মস্বীকৃত কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতার কণ্ঠ পাওয়া যায়। তাঁরা দাবি করেন, উপাচার্য ও তাঁর পরিবারের মধ্যস্থতায় বিপুল অঙ্কের টাকা কমিশন পেয়েছেন। এতে ক্যাম্পাসে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলো। উপাচার্য মহোদয়কে ব্যক্তিগতভাবে সবাই সৎ ও সজ্জন বলেই জানে। সরকারের সমর্থন থাকায় তিনি হীনবলও নন। তাহলে চাপের মুখে তিনি নতিস্বীকার করবেন কেন! পরে জানা গেল বিশাল বড় উন্নয়ন বাজেটে ভাগ বসাতে ছাত্রলীগের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা ভিসির কাছে এসেছিলেন। তিনি তাঁদের ফিরিয়ে দেন। অবহিত করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। সেই সূত্রে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বড় দুই নেতা অপসারিত হয়। তখন থেকেই তাঁদের একটি প্রতিশোধস্পৃহা ছিল।

ক্যাম্পাসের অনেকেরই প্রশ্ন, অডিও প্রকাশের পর আন্দোলনকারীদের প্রথম দাবি হওয়া উচিত ছিল আত্মস্বীকৃত চাঁদাবাজ ছাত্রলীগ নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার। অথচ অডিও প্রমাণ থাকার পরও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো কথা না বলে দালিলিক প্রমাণপত্র ছাড়াই পরদিন থেকে ভিসিকে দুর্নীতিবাজ বলা হলো এবং তাঁর অপসারণ দাবি করে আন্দোলন শানানো হলো। সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেল ভিসি পরিবর্তন করাটাই আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। ভিসির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রমাণিত হলে এবং তখন এর কাঙ্ক্ষিত বিচার না হলে অবশ্যই আন্দোলন গড়ে তোলা যাবে। আর অমন আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের বেশির ভাগ মানুষই যুক্ত হবেন বলে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের নিশ্চিত করছে। কিন্তু তদন্ত ও বিচার ছাড়াই নিজ উত্থাপিত অভিযোগের ‘শক্তি’তেই আন্দোলনের নামে অরাজকতা তৈরি করা হলো কেন! আন্দোলনের এই বড় দুর্বলতার কারণে দীর্ঘ চেষ্টা করেও সাধারণ সচেতন ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের আন্দোলনে যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন আন্দোলনকারীরা। অথচ ভিসি চেয়ারপ্রত্যাশীরা নেপথ্যে থেকে আন্দোলন তৈরি করে গিনিপিগ বানালেন বৃহত্সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষককে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও অন্যান্য ক্ষতি হলো। অনেক শিক্ষকের বাধাগ্রস্ত হলো গবেষণা।

আমার এক সহকর্মী দুদিন আগে একটু সিরিয়াস মুখ করেই বললেন, জানেন, একটি অডিও ফাঁস হয়েছে। আমি খুব গা করলাম না। কারণ ডিজিটাল যুগের কল্যাণে সকাল-বিকেলেই অডিও ফাঁস হচ্ছে। এসবের কতটা ঠিক, কতটা জাল—সেই খবর কে রাখে। উল্লিখিত অডিওতে নাকি আন্দোলনকারী এক শিক্ষক নেতার সঙ্গে ঢাকার একটি হোটেলে জামায়াত-শিবিরের বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখানে আন্দোলন চালানোর জন্য শিক্ষক নেতাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আমার সহকর্মী বললেন, এ তথ্য আন্দোলনকারী নেতাকে বলায় তিনি খেপে গেলেন। সহকর্মী জানালেন, শিক্ষক নেতাকে যখন বলা হলো এই অডিও ভাইরাল হলে সবার আগে তো আপনার পদত্যাগের দাবি উঠবে। শিক্ষক নেতা জোর দিয়ে বললেন, এটি সত্য হতেই পারে না। আমার বিরুদ্ধে এটি নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র। এবার আমার রসিক সহকর্মী আশ্বস্ত করলেন শিক্ষক নেতাকে। বললেন, আমাকে ক্ষমা করবেন, একটি যুক্তি উপস্থাপনের জন্য পুরোটাই বানিয়ে বললাম আমি। আপনি অন্যায় না করলেও কেউ আপনার বিরুদ্ধে এভাবেই ষড়যন্ত্র করতে পারে। আর তা বুঝে না বুঝে অনেকে আপনার পদত্যাগ দাবি করতেও পারে। এ যদি আপনার প্রতি অন্যায় হয়, তাহলে কোনো অকাট্য প্রমাণ ছাড়া একটি অডিওকে অবলম্বন করে আপনারা ভিসিকে দুর্নীতিবাজ বলছেন, তাঁর সম্মানহানি করছেন এবং অপসারণ দাবি করছেন—তা কেন অন্যায় হবে না?

আন্দোলনের প্রথম দিকে অনেক কিছু ম্যানেজ করা হয়েছিল। গভীরভাবে তলিয়ে যাঁরা দেখেন না তাঁরা বিভ্রান্তও হয়েছিলেন। ভিসির নৈতিকতা নিয়ে অনেকে সমালোচনাও করেছিলেন। টক শো-আলোচনায় অনেক গুণীজনও ভিসি কেন পদত্যাগ করছেন না—এ নিয়ে তির্যক বক্তব্যও রেখেছিলেন। এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের সামনেই যুক্তি তৈরি হচ্ছে। পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে হৈচৈও কমে যাচ্ছে।

আমরা বাস্তবতার উঠানে দাঁড়িয়ে এসব কূট বিতর্ক নিয়ে আর কালক্ষেপণ করতে চাই না। কে রাজা হলেন আর কে রাজা হবেন—তা নিয়ে এই শিক্ষা নিকেতনে নরক গুলজার করতে চাই না। আমরা চাই যৌক্তিক আর প্রামাণ্য সূত্র ছাড়া কেউ যাতে আন্দোলনের নামে ক্যাম্পাসকে আর অস্থিতিশীল করে না তোলেন। এর জন্য সচেতন থাকতে হবে ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে। বিশ্ববিদ্যালয় সচল হলেও শঙ্কা কাটেনি। এ সত্য মনে রাখতে হবে।

আমরা মনে করি সুস্থ পরিবেশ তৈরির জন্য সরকারের ভূমিকাই মুখ্য। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এরই মধ্যে দুই পক্ষেরই কাগজপত্র পৌঁছে গেছে। আমরা অনুমান করতে পারি, এর আগেই গোয়েন্দাদের রিপোর্ট চলে এসেছে সরকারপক্ষের হাতে। আমরা চাইব ধীরে চলা নীতি থেকে সরকার বেরিয়ে আসবে। তা না হলে শিক্ষা গবেষণার ভয়ানক ক্ষতির দায় সরকারকেও নিতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের দাবি থাকবে, তদন্তের ফলাফলে যে রায় হবে তার জন্য বিধি অনুযায়ী নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। সড়ক ব্যবস্থাপনা, বাজার ব্যবস্থাপনার মতো গা বাঁচানোর সমঝোতার নীতি ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরো কঠিন করে তুলবে। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিতে পারলে ভবিষ্যতে আরো বড় অন্যায় মাথাচাড়া দেবে। সেই সময় সামাল দেওয়াটা হবে আরো কঠিন।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা