kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

আমরা আসলে কেমন!

মোস্তফা মামুন

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আমরা আসলে কেমন!

একটা সময় পত্রিকা দিয়ে মানুষকে বিচার করা হতো। হাতে সংবাদ বা ভোরের কাগজ মানে প্রগতিশীল। ইত্তেফাক মানে ঐতিহ্য বা গতানুগতিকতার প্রতি অনুরাগী। ডেইলি স্টার হাতে থাকলে ইংরেজি বোঝা জ্ঞানী। বাংলার বাণী বা দিনকাল পড়ছে মানে অবশ্যই রাজনৈতিক কর্মী। আশি-নব্বইয়ের দশকের মতো আজকাল অবশ্য আর মানুষকে পত্রিকা দিয়ে চেনা যায় না। পত্রিকাই হারিয়ে যাচ্ছে, ইন্টারনেটে ফ্রি পড়া যায় বলে এখনকার মানুষ আর পত্রিকা কেনার বোকামি করে না। এর ফলে অসুবিধা যেটা হয়েছে, চট করে পথচলতি একটা মানুষের বোধগত অবস্থান অনুমান করা যায় না। এখন সবার হাতে মোবাইল ফোন। সেই মোবাইল ফোনের দাম এবং মান দিয়ে যা যাচাই করা যায়, তা হলো আর্থিক অবস্থান। আর্থিক মানদণ্ডভিত্তিক অবস্থান সব সময়ই নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। কেউ আমার চেয়ে এগিয়ে আছে জানলে নিজেকে ব্যর্থ লাগে। সে হিসেবে আরেকজন পিছিয়ে আছে জানলে আনন্দ হওয়ার কথা। তা হয় না। বরং সে ক্ষেত্রে লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় পিছিয়ে থাকা মানুষটার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা।

মনুষ্যচরিত্রই অত্যন্ত বিচিত্র। এর মধ্যেও আমরা যেন আরো বৈচিত্র্যময়, আরো অদ্ভুত। এবং অত্যন্ত পরস্পরবিরোধীও।

দিন কয়েক আগে সকালবেলা মনটা খারাপ হয়ে গেল। কালের কণ্ঠে কয়েক মাস আগেই ছাপা হয়েছিল, নতুন করে বিষয়টাকে আলোয় নিয়ে এসেছে সম্প্রতি প্রচারিত ইত্যাদি। এডরিক বেকার বা ডাক্তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর হাসপাতালের দায়িত্ব নিতে সুদূর আমেরিকা থেকে এসেছেন এক ডাক্তার দম্পতি। এসবই আনন্দের ব্যাপার; কিন্তু মনটা খারাপ হলো যখন শুনলাম দেশের কোনো ডাক্তার এই সেবানির্ভর হাসপাতালের দায়িত্ব নিতে রাজি হননি (পরে অবশ্য অন্য বক্তব্যও শোনা যাচ্ছে। দেশের ডাক্তাররা চাইলেও ডাক্তার ভাই নাকি রাজি হননি। ফান্ডিং, মিশনারি ইত্যাদি প্রসঙ্গও এসেছে। সত্যাসত্য যাচাই করা খুব মুশকিল। সেই যুক্তিতর্কে এ জন্য যাচ্ছি না যে সেটা এই লেখার মূল বিষয় নয়)। যা-ই হোক, এর কিছুক্ষণ পরেই আরেকটা খবর। বাংলাদেশেরই কয়েকজন পুলিশ সদস্য পরিচয় গোপন করে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কিছু মানুষকে চিকিৎসা দিয়ে চলছেন কয়েক বছর ধরে! ‘পুলিশ মানুষের ক্ষতি করছে না’ এটাই এখনকার বাংলাদেশে মোটামুটি একটা খবর। সেখানে উপকার করছে! চরম মানবতাবাদী মানুষের পক্ষে যা সম্ভব নয়, তা-ই করছেন পুলিশ হাসপাতালের চাকুরে কয়েকজন কনস্টেবল। বৈপরীত্যটা দেখলেন তো!

আরেকটা বৈপরীত্যের গল্প বলি। কয়েক বছর আগে কেনিয়ায় গেছি। সেখানে একদিন এক ট্যাক্সিচালক একটু ইতস্তত করে বলল, ‘যদি কিছু মনে না করো, তাহলে একটা প্রশ্ন করতে চাই।’

‘করো।’

‘তোমরা একেকজন একেক রকম কেন?’

‘একেকজন একেক রকম মানে...’ ঠিক ধরতে পারলাম না প্রশ্ন।

সে হাসতে হাসতে বলল, ‘আমাদের দিকে তাকাও। দেখো, সবার গায়ের রং এক। কুচকুচে কালো। দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে শারীরিক গড়নও কাছাকাছি। কিন্তু তোমরা কত রকম। কী মজা না!’

নিজেদের দিকে তাকালাম। আর তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। আমরা দলে চারজন। একজন এমন মোটা যে দেখলে কুস্তিগীর মনে হয়। তখনকার আমি রীতিমতো ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী’, মানে তাঁর বিপরীত। আরেকজন দীর্ঘকায়, ছয় ফুটেরও বেশি উচ্চতা। আর চতুর্থজন এমন কালো যে ক্ষেত্রবিশেষে আফ্রিকানদেরও হারিয়ে দেয়।

নিজেরা সব সময় দেখি বলে বা এই বৈচিত্র্যে অভ্যস্ত বলে আলাদা করে খেয়াল করিনি। দূর নাইরোবিতে, এক তুচ্ছ ট্যাক্সিওয়ালার মাধ্যমে নিজেদের এভাবে আবিষ্কার করে বিস্মিত। তাইতো! প্রতিটা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শারীরিক গড়নে ঐক্যের একটা ব্যাপার থাকে। আমাদের বৈচিত্র্য তো সেখান থেকেই শুরু। এর পেছনে নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস আছে। নানা জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে আজকের আমরা। প্রাচীনকালে দ্রাবিড়-আর্যরা ছিল। তারপর মধ্যপ্রাচ্য থেকে শাসকরা এসেছেন। আবার ইংরেজদের শ্বেতরক্তের সঙ্গে মিলেছি কোথাও কোথাও। শারীরিক বৈচিত্র্য তাই স্বাভাবিক। কিন্তু মনোগত বৈচিত্র্য বা তীব্রতার কোনো ব্যাখ্যা মেলে না। যেভাবেই আসি শেষ পর্যন্ত এক ভাষায় মিলেছি। সংস্কৃতি-চরিত্রে এমন সৌভাগ্যবান একমুখী দেশ আছে খুব কমই। অথচ সেখানেই বাদ-বিবাদ এত বেশি যে তুচ্ছ ১০ থেকে ২০ টাকার কারণে খুনের ঘটনা ঘটে। কয়েক বছর আগে বাসে একটা তুমুল মারামারি দেখেছিলাম। এক যাত্রী আর কন্ডাক্টর একজন আরেকজনের রক্ত বের করে দিয়েছিল। কিসের জন্য মারামারিটার শুরু জানেন! মাত্র আট আনা। বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে অনেক ভাবলাম। একটা আধুলি, যার কোনো বাজারমূল্যই নেই, তার জন্য এমন নিষ্ঠুরতা সম্ভব। উত্তর পাইনি। যা পেয়েছি পরের কয়েক বছরে, তাতে সমাজে বিরোধ, নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বাবার হাতে ছেলে খুন, কন্যাকে ধর্ষণের চেষ্টা—উফ! লিখতেই হাত কাঁপে। কে জানে, কয়েক বছর পর হয়তো কাঁপবে না। যখন কোনো ঘটনা ঘটতেই থাকে তখন কী হয়! মেনে নিয়ে অন্য কাজে মন দিই।

আরেকটা গল্প বলি। ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের। বাংলাদেশি সাংবাদিক শুনে সেখানকার এক কলেজের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক খুবই কৌতূহলী হয়ে কথা বলতে চাইলেন। এ কথা-সে কথার পর তাঁর নাটকীয় জিজ্ঞাসা, ‘আচ্ছা, এই যে এখানে আমি তোমার সঙ্গে কথা বললাম, একটু পর যদি শোনো বেরিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করেছি, তোমার কেমন লাগবে?’

একেবারে অবান্তর প্রশ্ন। বললাম, ‘কেমন লাগবে মানে...খারাপ লাগবে।’

‘সত্যি খারাপ লাগবে তোমার!’ ভদ্রলোক এমন উত্তেজিত হলেন যেন আমার খারাপ লাগবে শুনে তাঁর ভীষণ ভালো লাগছে। 

আমি স্তম্ভিত। ভদ্রলোক ব্যাখ্যা করলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারতে আমি কয়েকবার গিয়েছি কিছু গবেষণার কাজে। তোমাদের ওখানে হোটেল সোনারগাঁওয়ে ছিলাম। সেখানে মানুষের কী বিলাসী জীবন। অথচ ঠিক ওখান থেকে বেরোলেই দেখতে পেতাম বাচ্চা ছেলেরা খালি গায়ে শুয়ে আছে। ভিক্ষা করছে। তাই আমার কাছে মনে হয়, তোমাদের মানুষের বোধই হয়তো এ রকম। অন্য কারো কথা ভাবো না।’

এত সরলীকৃত উপসংহারে ভদ্রলোকের পৌঁছানো উচিত হয়নি। তাঁদের সমাজ নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে; কিন্তু দৃশ্যটা তো সঠিক। সত্যি তো, পাশের সোনারগাঁওয়ে যখন রঙের খেলা চলে তখন কারওয়ান বাজারের বস্তিতে জীবন স্তব্ধ হয়ে রয়।

অনেক বছর পর রানা প্লাজার আগুনের ধ্বংসাবশেষে যখন বিপন্নদের বাঁচাতে চলল প্রাণ দেওয়ার লড়াই তখন সেই অধ্যাপককে খুব মনে পড়ছিল। একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর গল্পগুলো এত হৃদয়ছোঁয়া ছিল যে মনে হচ্ছিল সেই মানুষটাকে খুঁজে বের করে দেখাই।

কিন্তু হায়, সেই আলোর পেছনেও অন্ধকার ছিল! প্রতিটা নিহতের পরিবারকে দাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার একটা বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। প্রথম দিন সহজেই টাকা মিলছিল। দ্বিতীয় দিন জানানো হলো, যিনি টাকা নিতে যাবেন তাঁর পরিচয় প্রমাণের কাগজপত্র লাগবে। কারণ প্রথম দিন কয়েকজন এই সুযোগে টাকা মেরে পালিয়েছে।

তাহলে আমরা আসলে কেমন! সেই শারীরিক বৈচিত্র্যের মতো বৈপরীত্যে ভরপুর।

দু-তিন বছর আগে একদিন পথে যেতে যেতে দেখি একটা বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে। কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে পানি আনছে আগুন নেভাতে। কেউ কেউ ভেতরে ছুটল আক্রান্তদের উদ্ধার করতে। অনেকে আবার দাঁড়িয়ে আগুন কতটা বাড়ছে সেটা গভীর মনোযোগে দেখছে। কয়েকজন ব্যস্ত হয়ে গেল সেলফি তোলায়। একটা দলকে দেখলাম, সরকারকে দায় দিয়ে ইচ্ছামতো গালাগাল দিচ্ছে। এবং এর মধ্যে বেরিয়ে এসে একজন জানাল ভেতরে নাকি এই সুযোগে কেউ কেউ দোকান লুট করে নিচ্ছে। মোটের ওপর একটা ঘটনায় যত রকম মানবীয় প্রতিক্রিয়া সম্ভব এর সব কিছুই আছে।

শুরু করেছিলাম পত্রিকা দিয়ে। সেই পত্রিকাই আমাদের সমাজের আরেকটা চরিত্রকে এত স্পষ্ট প্রকাশ করে! নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে কয়েক বছর পরপরই বাংলাদেশের এক নম্বর পত্রিকা পরিবর্তন হয়েছে। জনকণ্ঠ ছয় জায়গা থেকে ছাপা শুরু করে ইত্তেফাককে পেছনে ফেলে এক নম্বর হয়ে গেল। আমরা ধরলাম, তাড়াতাড়ি মফস্বলে চলে যাচ্ছে বলে। কয়েক বছর পর বেরোল যুগান্তর। দেড়-দুই বছরের মধ্যে এক নম্বর। কিছুদিনের মধ্যে তাকেও ছাপিয়ে গেল প্রথম আলো। আট-দশ বছর পর আবার বদল। এবার বাংলাদেশ প্রতিদিন। পৃথিবীতে আর কোথাও ২০ থেকে ২৫ বছরে পাঁচবার জনপ্রিয় পত্রিকার স্থান পরিবর্তন হয়েছে বলে জানা নেই। যেমন এটাও বোধ হয় পৃথিবীতে কোথাও ঘটেনি যে দেশের প্রধান খেলাই বদলে গেল। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ফুটবল ছিল প্রবল জনপ্রিয় খেলা। এখন ক্রিকেটের হাওয়ায় ফুটবলের খোঁজই নেই। না, এমন পরিবর্তনশীলতাও পৃথিবীতে কোথাও দেখা যায় না।

আফসোস, এই সমাজটা নিয়ে কেউ সেভাবে ভাবল না, গবেষণা করল না। আমরা হয় আছি বিদেশি অর্থায়নে তত্ত্ব কপচানোতে, না হয় দ্বিদলীয় রাজনীতির হানাহানিতে।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা