kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

অভিবাসীবান্ধব অভিবাসন পদ্ধতি প্রয়োজন

এ কে এম আতিকুর রহমান

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অভিবাসীবান্ধব অভিবাসন পদ্ধতি প্রয়োজন

কালের কণ্ঠে কিছুদিন আগে ‘সৌদিতে কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থা ফের প্রশ্নবিদ্ধ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। গত ২৮ অক্টোবর একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘সৌদি আরব থেকে বিতাড়নের ফলে দরিদ্র শ্রমিকরা আরো দরিদ্র হচ্ছে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী দুই ধরনের কর্মী বাংলাদেশে ফিরে আসছেন। প্রথম দলে রয়েছেন সেসব কর্মী, যাঁদের সেখানে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আইনি সমস্যা রয়েছে এবং অন্য দলের কর্মীদের বৈধ কাগজপত্র থাকলেও তাঁদের সৌদি আরব ত্যাগ করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। দ্বিতীয় ধরনের প্রধান অংশটি হলো আমাদের মহিলা কর্মীরা, যাঁরা প্রায় প্রতিদিনই নানা নির্যাতন, বিশেষ করে তাঁদের নিয়োগকর্তাদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতন বা যৌন হয়রানির শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

তবে প্রতিবেদনে ভিন্ন একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন যে সৌদি আরবে বেশির ভাগ বাংলাদেশি মহিলা কর্মী ভালোভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন এবং যাঁরা দেশে ফিরে আসছেন তাঁরা স্থানীয় পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই ফিরে আসছেন। বিষয়টি এ রকম হলে অবশ্যই দুশ্চিন্তার তেমন একটা কারণ আছে বলে মনে হয় না। অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে সৌদি আরবের পরিবেশ ও সংস্কৃতির বাস্তবতা নিয়ে। যাক, সে এক ভিন্ন কথা। কাজ করতে গেলে এসব তো মানিয়ে নিতেই হবে।

প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে যে সৌদি আরবের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সে দেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের ব্যাপক ধরপাকড়ের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বাংলাদেশি দরিদ্র কর্মী বিতাড়িত হওয়ার পর আরো দারিদ্র্যের কবলে পড়ছেন। প্রকৃতপক্ষে বিদেশে যাওয়ার আগে সেসব কর্মীর স্বপ্ন ছিল না যে তাঁরা খালি হাতে ফিরে আসবেন, বরং বিদেশে কর্মকাল সমাপনান্তে ফিরে আসার পর তাঁদের আরো উন্নত জীবনের স্বপ্ন ছিল। আমরা জানি, বিদেশে যাওয়ার জন্য এই কর্মীরা সাধারণত তাঁদের সম্পত্তি বিক্রি করে বা খুব উচ্চ সুদে ধার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে থাকেন। কিন্তু যখন তাঁরা এ ধরনের হয়রানিমূলক পরিস্থিতিতে পড়েন তখন তাঁদের পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় থাকে না। ধার করা অর্থ ফেরত দেওয়ার কোনো সংগতি থাকে না। বিষয়টি বাস্তবিক অর্থে যে অত্যন্ত অমানবিক হয়ে দাঁড়ায়, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর দায়ভার নেওয়ার মতো কেউ নেই। ভুক্তভোগী ওই পরিবারটি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি থাকে না।

২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল কালের কণ্ঠ’র এ কলামেই আমাদের নারী গৃহকর্মীদের বিদেশে প্রেরণের আগে তাঁদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে পাঠানোর আবশ্যকতা নিয়ে লিখেছিলাম। ওই সময় শুধু সৌদি আরব থেকেই কয়েক শ নারী গৃহকর্মীর বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘটনাকে নিয়ে ওই পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল। আমি আমার লেখায় নারী কর্মীদের নির্যাতন রোধের ব্যাপারে বেশ কিছু সম্ভাব্য পদক্ষেপ গ্রহণের কথা উল্লেখও করেছিলাম। এক বছর পরও সেই চিত্রের ব্যতিক্রম কিছু ঘটানোর জন্য তেমন কোনো পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় গত বছরের জুন মাসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নির্যাতিতা নারী কর্মীর দেশে ফেরত আসার ঘটনা ঘটেছিল। এ নিয়ে ২৭ জুন ২০১৮ এ কলামেই আরেকটি প্রতিবেদন লিখি। কিন্তু প্রবাহিত ধারা অব্যাহতই থাকে। এ ছাড়া পুরুষ কর্মীদের গ্রেপ্তারের বা বিতাড়নের ঘটনা তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এটি ঘটছে এবং কিভাবে? আমরা জানি, আমাদের অভিবাসী কর্মীদের দেখভাল করার জন্য সরকারের একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে। তাদের হাতে রয়েছে প্রয়োজনীয় আইন-কানুন আর বিধি-বিধান।

কিন্তু কেন যেন মনে হয় সেসবের মর্যাদাপূর্ণ অনুসরণ আর যথাযথ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোথাও না কোথাও একটি বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। কর্মী অভিবাসনের বিষয়টি জটিলতর হওয়ার পেছনে কর্মীদের সচেতনতা ও অজ্ঞতাও অনেকটা দায়ী। এ ছাড়া এ বিষয়ে অন্যতম ভূমিকা রয়েছে আমাদের হাজারখানেক রিক্রুটিং এজেন্সির, যারা অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে থাকে। সর্বোপরি নিয়োগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং সে দেশের সরকারের ভূমিকাকেও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। অর্থাৎ বিষয়টিতে জড়িত সব ব্যক্তি আর সংস্থার যথাযথ সমন্বয় এবং দায়িত্ব পালনের মধ্যেই অভিবাসী কর্মীদের কল্যাণ বা দুর্ভোগ নির্ভর করে। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী রিক্রুটিং এজেন্সি আর নিয়োগদাতা, যাদের এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত, তারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যায়। এমনকি আমরা ওই সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে তাদের প্রেরিত কর্মীদের এসব বিপদে দায়িত্ব নিতে দেখি না। অথচ এই কর্মীদের কাছ থেকেই তারা লাখ লাখ টাকা উপার্জন করেছে। বাংলাদেশে কি এমন কোনো আইন বা রীতি নেই, যার আশ্রয়ে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে এসব অবস্থায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য জবাবদিহির মঞ্চে আনা যায়? 

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেসব এজেন্সির মাধ্যমে আমাদের কর্মীরা বিদেশে যাচ্ছেন, তাঁদের নাম এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাসহ কর্মীদের যথাযথ তথ্যাদিসংবলিত তালিকা সংরক্ষিত রাখছে। যদি এ রকম তালিকা রেখেই থাকে, তবে এসব ঘটনায় জড়িত পুরো চক্রটি খুঁজে পাওয়া কঠিন হওয়া উচিত নয়। বিদেশে কোনো কর্মীকে তাঁর নিজের অপরাধের জন্য গ্রেপ্তার করা হলে আমাদের সরকার বা দূতাবাস স্থানীয় আইন অনুযায়ী তাঁকে সহায়তা করার চেষ্টা করবে। কোনো কর্মীকে, বিশেষ করে মহিলা কর্মীকে, যদি কোনো নিয়োগকারী কর্তৃক শারীরিক নির্যাতন বা যৌন নির্যাতন বা চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে ফিরে আসতে হয়, তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও নিয়োগকর্তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। যেভাবেই এ ধরনের বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি হোক না কেন, বিদেশে আমাদের দূতাবাসের মাধ্যমে এই ঘটনাগুলোর যথাযথ তদন্তের গুরুত্বকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ওই সব কর্মী সৌদি আরব বা অন্য দেশে গিয়ে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, তাদের জবাবদিহির সম্মুখীন করার ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো।

গত কয়েক বছর যে হারে বাংলাদেশের কর্মীরা বিদেশে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তা আর চলতে দেওয়া ঠিক হবে না। এর ফলে বিদেশে একদিকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেমন বিনষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে নানা অনীহা এবং প্রতিবন্ধকতার উদ্ভব হচ্ছে। এমনকি মাঝেমধ্যেই কোনো না কোনো দেশ আমাদের কর্মী নেওয়া বন্ধই করে দিচ্ছে। অবৈধ পথে কর্মী প্রেরণ যেমন ভয়াবহ, তেমনি বৈধভাবে গিয়ে কর্মীর বা নিয়োগকর্তার কারণে অবৈধ হয়ে পড়াটাও দুঃখজনক। এসব থেকে মুক্তি পেতে হলে অর্থাৎ অভিবাসী কর্মীদের জীবন নিরাপদ করতে হলে প্রয়োজন অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়ন। আর ওই স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দিতে পারে শুধু একটি সুষ্ঠু ও নিরাপদ অভিবাসন প্রক্রিয়া। এ ধরনের প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা গেলেই তা হয়ে উঠবে অভিবাসীবান্ধব। বর্তমানে যেভাবে কর্মী প্রেরণ করা হচ্ছে, যত দিন তা চলতে থাকবে তত দিন আমাদের এ ধরনের নির্যাতন আর হয়রানিকে মোকাবেলা করতেই হবে। এর ব্যত্যয় ঘটার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই, অন্তত এ নিশ্চয়তা দেওয়া যায়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক অভিবাসী কর্মী (পুরুষ ও মহিলা) কর্মরত রয়েছেন সৌদি আরবে। সংগত কারণেই ওখান থেকেই অধিক সমস্যার কথা আসবে। আর মহিলা কর্মীদের ক্ষেত্রেও তাই। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইনের শাসন যদি কঠোর না হয়, তাহলে অপরাধীর পার পাওয়াটা খুবই সহজ হয়ে যায়। এ ছাড়া কর্মী নিয়োগের চুক্তির ধারায় কর্মীর নিরাপত্তা বিধানসহ ন্যায্য অধিকারের নিশ্চয়তাসংক্রান্ত ধারাগুলো না থাকলে কর্মীর বঞ্চনার আর শেষ থাকে না। এই যে সৌদি আরব থেকে শত শত মহিলা কর্মী শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত দেশে ফিরে আসছেন, এযাবৎ কয়জন সৌদি নিয়োগকর্তার এ অপরাধে শাস্তি হয়েছে আমার জানা নেই। অথচ সে কারণে সৌদিতে আমাদের মহিলা কর্মী প্রেরণ কি বন্ধ হয়েছে? আসলে এসব ঘটনা আমাদের অনুভূতিকে তেমন একটা নাড়া দেয় না বলেই মনে হয়। তাহলে অন্তত কিছু একটা পদক্ষেপ নিতে তো দেখা যেত। আমরা বোধ হয় কানেও শুনি না, চোখেও দেখি না।

যা-ই হোক, আমাদের কর্মপন্থায় সার্বিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় আনা উচিত বলেই মনে হয়। আর সে রকমটি ভাবা গেলে বোধ হয় অভিবাসী কর্মীদের জীবন আরো উন্নত ও নিরাপদ করা যেত। আমরা আর কিছু না হোক, অন্তত গোটা চারেক বিষয়কে যদি গুরুত্ব দিতে পারতাম, তাহলে এ ক্ষেত্রে একটা সন্তোষজনক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হতো। প্রথমত, অভিবাসনপ্রক্রিয়াটি অভিবাসীবান্ধব, নিরাপদ ও সুষ্ঠু করতে হবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সবাইকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তৃতীয়ত, কর্মী ও নিয়োগকারীর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিটি হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের, যাতে কর্মীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থাকবে।  চতুর্থত, মহিলা কর্মীদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া যেসব দেশ আমাদের নারী কর্মীদের জন্য অধিকতর নিরাপদ এবং মানবিক, সেসব দেশে অধিকসংখ্যক মহিলা কর্মী পাঠানোর বিকল্প চিন্তা করা যেতে পারে। জানা মতে, এ ক্ষেত্রে কাছাকাছি সিঙ্গাপুর, হংকং বা ম্যাকাও অনেক বেশি নিরাপদ এবং বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও তুলনামূলকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে ভালো।

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা