kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

এসএ গেমসে উজ্জ্বল বাংলাদেশ

ইকরামউজ্জমান

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এসএ গেমসে উজ্জ্বল বাংলাদেশ

জন্মভূমি নেপালে তৃতীয়বারের মতো ফিরে এসেছে এসএ গেমস (সাউথ এশিয়ান গেমস)। চলমান বৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞের লড়াইয়ে লড়ছেন সাত দেশের দুই হাজার ৭১৫ জন পুরুষ-মহিলা ক্রীড়াবিদ এবং খেলোয়াড় দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়ায় ‘সুপ্রিম্যাসি’ প্রদর্শনের জন্য। ২৬টি খেলায় ৩১৭ স্বর্ণপদকের যুদ্ধ চত্বরে ভারত ও পাকিস্তান বেশ কয়েকটি খেলায় অংশ না নেওয়ায় আন্তর্জাতিক এই ‘মেগা স্পোর্টস কার্নিভালে’ জৌলুস, আকর্ষণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে গেছে! বিগত ১২টি আসরে এ ধরনের অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। বিশেষ করে ভারতের অনুপস্থিতি কয়েকটি খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ম্লান এবং একচেটিয়া রূপ দিতে যাচ্ছে বলেই মনে করছি! ক্রীড়া গবেষক ও বিশ্লেষক যাঁরা ৩৫ বছর ধরে এই গেমস অনুসরণ করছেন, গেমসের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পিছিয়ে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্রীড়াঙ্গনের জন্য এই গেমসে সবার অংশগ্রহণে নিয়মিত আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বাগতিক নেপাল যেভাবে বারবার তারিখ পরিবর্তন করে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল অবস্থা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় শেষ পর্যন্ত গেমসের আয়োজন করতে পেরেছে, এর জন্য তারা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

২০২০ সালে ‘ভিজিট নেপাল’ যেটি দেশের অর্থনীতি ও পর্যটনশিল্পকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য—গেমসের আয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ও জনগণ এখন স্বস্তিবোধ করছে।

এসএ গেমস—শুধু একটি ক্রীড়ানুষ্ঠান নয়। এই গেমসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনীতি, সম্পর্ক মজবুত করার অঙ্গীকার, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহাবস্থান এবং ক্রীড়ার উন্নতিকল্পে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ। বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আকর্ষণ তখনই কমে যায় যখন একের পর এক বিরক্তিকর লম্বা বক্তৃতা হজম করতে হয়। নেপালের দশরথ স্টেডিয়ামে একই অভিজ্ঞতা! সুযোগ আছে আর তাই দর্শক পরিপূর্ণ স্টেডিয়ামে কিছু বলার লোভ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। এখনো আঞ্চলিক পর্যায়ের ক্রীড়া চত্বরেও এই রেওয়াজ চালু আছে বাধ্য হয়ে অথবা কৌশলগত কারণে। আঞ্চলিক সীমানার বাইরে এশিয়ার গেমস বা অন্য কোনো ক্রীড়ানুষ্ঠানে এই ধরনের সংস্কৃতি সমর্থিত হয় না।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর ক্রীড়াঙ্গনের ছবি মোটামুটি এক রকম। কিছু ব্যতিক্রম আছে সেই গল্পও শুনেছি। ক্রীড়াবিদ ও খেলোয়াড়রা সব দেশেই বঞ্চিত প্রাপ্ত ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে। অথচ এদের কাছে প্রত্যাশা অনেক বেশি। নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ নেই। দেশগুলোতে খেলার জাতীয় সংস্থাগুলোর আর্থিক সামর্থ্য নেই। এ ছাড়া নিজেদের মধ্যে কোন্দল, দলাদলি আর একই লক্ষ্যে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা, চিন্তা ও মনমানসিকতার ক্ষেত্রে ফারাক। এ রকম অবস্থায় দেশগুলোতে বছরজুড়ে খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদদের যত্নসহকারে লালন-পালন করা, পরিকল্পনামাফিক কাজ করা তো সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বিরাজমান পরিকাঠামোতে খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদ সৃষ্টি। তা সত্ত্বেও দেশে দেশে খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদরা স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় কারো কারো। তবে এর পেছনে আছে তাদের নিজস্ব উদ্যোগ, অনুশীলন, কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ় সংকল্পবোধ ও আত্মবিশ্বাস।

কোচ, ট্রেনার, ফিজিওথেরাপিস্ট, ম্যাসিওর, ডায়েটেসিয়ান, সাইকিয়াট্রিস্টের সুযোগ কোন দেশের জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদরা সবাই পান! নেপাল থেকে বলা হয়েছে, এগুলো তো ভাবা যায় না। ক্রীড়াবিদ ও খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ কী তা তাঁরা জানেন না। ক্রীড়া এবং ক্রীড়া মানসিকতা তো জীবনের সঙ্গে মিশে নেই এই অঞ্চলের দেশগুলোতে। এটি গায়ের পোশাকের মতো আলগা, খুলে ফেললেই সম্পর্ক শেষ। খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নেই। বছরের পর বছর দেশের জন্য কিছু করার বিরতিহীন চেষ্টার পর একসময় বিদায় নেওয়ার পর লোকচক্ষু থেকে হারিয়ে যাওয়া! কিন্তু এরাই একসময় দেশকে বছরের পর বছর গৌরবান্বিত করেছেন।

অলিম্পিয়ান এবং নেপালের সৈকনিকশন লারসন বলেছেন, ‘এই যে তায়কোয়ান্দো, কারাতেতে প্রথম দিনেই নেপালের সাফল্যের রূপকারদের পেছনের কাহিনি বড় করুণ। মার্শাল আর্টের এই খেলাগুলোতে পৃষ্ঠপোষকতা নেই বললেই চলে। তার পরও নিজ নিজ উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে কঠোর অনুশীলন, পরিশ্রম আর নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে ছেলে ও মেয়েরা দেশকে উজ্জ্বল করেছে। এদের মধ্যে আগেও কেউ কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বর্ণ জিতেছে। এত কিছুর পরও দেশে মার্শাল আর্টের খেলার গুরুত্ব বাড়েনি। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং সাপোর্ট না থাকলে কিন্তু একটি স্তরের পর আর বেশি এগোনো যায় না। ওরা  আনন্দে কেঁদেছে, কেননা ওরা দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছে। প্রেস কাভারেজে সব স্টোরি কখনো স্থান পায় না! শুধু থাকে জয়, আনন্দ আর দিনের উচ্ছ্বাস।

বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা প্রথম দিনই দেশকে স্বর্ণ উপহার দিয়েছেন। ক্রীড়াবিদরা নিজেকে অতিক্রম করার লক্ষ্য নিয়েই লড়ছেন। তাঁরা আত্মবিশ্বাসী, ৯ বছর আগে দেশের মাটিতে ১৮টি স্বর্ণ জিতেছিলেন, সেটি এবার ছাড়িয়ে যেতে। ক্রীড়াবিদ মানেই তো দেশ। ক্রীড়াবিদ স্বর্ণপদক জিতলে তো বাংলাদেশের স্বর্ণপদক জয় হয়।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক, কাঠমাণ্ডু থেকে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা