kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

‘সবার জন্য অভিগম্য আগামী’ কিভাবে সম্ভব

ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘সবার জন্য অভিগম্য আগামী’ কিভাবে সম্ভব

মার্জিয়ার খুব ইচ্ছা ছিল দেশের কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করবে। সেই ইচ্ছার শেষ সীমানায় পৌঁছেও গিয়েছিল। কিন্তু সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ালো তাঁর পরিবারের আর্থিক দারিদ্র্য নয়; বরং ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ভবন। হুইলচেয়ার ব্যবহাকারী মার্জিয়া জীবনের বন্ধুর পথে যাত্রাবিরতি না টানলেও এবার পিছু হটলেন। কিন্তু কেন? কারণ ছিল শুধু বহুতলবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনে কোনো র‌্যাম্প বা লিফটের ব্যবস্থা না থাকা। বাস্তবতার এ গল্পটা কালের কণ্ঠ পত্রিকায় আজ থেকে চার বছর আগে প্রকাশ হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে শহীদুলের বাস্তবতা আরো কঠিন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড-খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন; কিন্তু ১২ বছর ধরে কোনো চাকরি কিংবা কর্ম জোটাতে পারেননি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শহীদুল। যোগ্যতা কিংবা অর্থের অভাবে নয়। তাহলে কিসের অভাবে? শহীদুল এ বিষয়ে দুঃখ করে বলেছিলেন, দেশে ২১ হাজারের অধিক ওয়েবসাইট রয়েছে, হাজার হাজার পত্রিকা, ম্যাগাজিন রয়েছে; কিন্তু একটিও পড়তে পারি না। তাহলে মেধার বিকাশ আর চাকরির অনুসন্ধান করব কিভাবে? আমরা জানি, শহীদুল আর মার্জিয়ার গল্পের এখানে ইতি না টানলে এ গল্পের সারি আরো লম্বা হবে। যোগ হবে নতুন কোনো মার্জিয়া আর শহীদুল। কিন্তু আমরা ইতি টানতে চাই। যে ইতি আমাদের পৌঁছে দেবে সবাইকে এক জায়গায়, এক পথের এক যাত্রায়। আর তা হলো—সবার জন্য ‘অভিগম্য আগামীর পথ’ বিনির্মাণ। এবারের ২৮তম আন্তর্জাতিক ও ২১তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টিও তাই ‘অভিগম্য আগামীর পথে’।

আজ ৩ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিটি দেশ বেশ গুরুত্ব দিয়ে পালন করে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকেই এ দিবস পালন করে আসছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বাণী প্রদান করেন। তবে প্রতিবন্ধীবান্ধব বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ দিবসে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, তা হলো—জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধী মানুষের মিলনমেলায় নিজে উপস্থিত থেকে তাদের অধিকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা। এরই মধ্যে বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী মানুষের সব ক্ষেত্রে অভিগম্যতা নিশ্চিতকরণে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য হলো—ডিজিটাল টকিং বুক, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীবান্ধব পাঠ্য বই, নতুনভাবে স্থাপিত সরকারি প্রতিটি স্থাপনায় র‌্যাম্প স্থাপন বাধ্যতামূলক এবং ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ। তবে এখনো সরকারি-বেসরকারি ওয়েবসাইটগুলো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। সরকারের ভিশন ২০২১, টেকসই উন্নয়ন ২০৩০, উন্নত বাংলাদেশ ২০৪১ এবং বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এ দেশের সব শ্রেণি-ধরন-বৈচিত্র্যের মানুষের জন্য সব পর্যায়ে সমভাবে অভিগম্যতার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় রাখতে হবে। কিন্তু কিভাবে তা করা যেতে পারে, এ বিষয়ে এখনো সর্বজন গ্রহণযোগ্য কোনো সুপারিশ নেই।

‘অভিগম্য আগামীর পথে’-এর অর্থ হলো—সবার জন্য এমন এক ভবিষ্যৎ পথ রচনা করা, যে পথের যাত্রায় একজন মানুষও কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হবে না। এ যাত্রা শুরু হবে নিজ বাসস্থান থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট, বিনোদনের স্থান, ধর্মীয় উপাসনালয়, কর্মস্থল, সরকারি পরিষেবা অফিস, ডিজিটাল উপকরণ, ই-লার্নিং ডকুমেন্টস, ওয়েবসাইট, পাঠ্যপুস্তক, যোগাযোগসহ সব ক্ষেত্রে। এর উদ্দেশ্য হবে—কোনো মানুষ যেন বুদ্ধিগত, ইন্দ্রিয়গত, স্বাস্থ্যগত কারণে অভিগম্যতায় বাধাপ্রাপ্ত না হয়। তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন কতগুলো সুনির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি নজর রাখা।

প্রতিবন্ধীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুযোগ সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অভিগম্যতার পথ এখনো প্রতিবন্ধীদের জন্য মসৃণ নয়। তিন বছর ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পাস করে বিসিএস পরীক্ষা দিতে বসছেন বিচারক হওয়ার জন্য; কিন্তু সহযোগী (শ্রুত লেখক) নেওয়ার অনুমতি না পাওয়ায় পরীক্ষাই দিতে পারছেন না তিনি। যদিও পাশের দেশ ভারতে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা নেই।

কল্পনা করুন, একজন শারীরিক প্রতিবন্ধীকে এমন একটি অফিসে চাকরি দেওয়া হয়েছে, যেখানে কোনো র‌্যাম্প নেই, লিফট নেই। অথচ অফিস কক্ষ পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায়। কারণ এ তলায় হিসাব শাখা। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, সে কিভাবে নিয়মিত অফিস করবে? যদিও ব্যক্তির প্রতিবন্ধিতা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই; কিন্তু অফিস কক্ষ পরিবর্তনের নিশ্চয়ই সুযোগ রয়েছে। তথাপি প্রতিষ্ঠানপ্রধান তা করবেন কি না, তা নির্ভর করবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা দেশের প্রচলিত আইন কিভাবে দেখছে তার ওপর। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক চাকরিদাতার আইনগত, ন্যায্যতা ও নিজ দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে প্রত্যেক কর্মচারী, প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক ও অংশীজন যেন নিরাপদ, বাধামুক্ত এবং মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ, অফিস কক্ষ, প্রবেশদ্বার, এমনকি পণ্যে সমানভাবে অভিগম্যতা নিশ্চিত করেন। আমরা অফিসে প্রায়ই লিফট ব্যবহার করি। কিন্তু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ কিভাবে একা তা ব্যবহার করবে—এ বিষয় বিবেচনায় রাখি না।

আমরা প্রায়ই এখন অফিস-আদালত, ব্যাংক, বীমা, সরকারি কিংবা বেসরকারি বিবিধ প্রতিষ্ঠান, বিভাগ, ইউনিট ডিজিটাইজেশন করছি। ডিজিটাইজেশন করার সময় আমরা কি দেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষগুলোর কথা মাথায় রাখছি? তা না হলে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে না, যদিও এ ধরনের প্রযুক্তিগুলো একেবারে সহজ। শুধু প্রয়োজন সচেতনতা এবং দায়বদ্ধতা। প্রয়োজন দেশের ডিজিটাইজেশনে সব মানুষের অভিগম্যতার জন্য একটি শক্তিশালী পরিকল্পনা।

আমরা সব ক্ষেত্রে সব সূচকে এগিয়ে যাচ্ছি কি না, তা আজ উন্নয়ন যাত্রাপথের প্রধান নির্দেশক। আমরা কেউ কি ভেবে দেখেছি, উন্নয়নের এ যাত্রাপথে অভিগম্যতা এবং অন্তর্ভুক্তিসূচক সংযোজন অতীব জরুরি? তা না হলে টেকসই উন্নয়নের মূল প্রতিপাদ্য ‘কাউকে বাদ দিয়ে নয় বা কাউকে পেছনে রেখে নয়’, তা সত্যিকার অর্থেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই দেশের উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে গৃহীতব্য কার্যক্রমে সব মানুষের অভিগম্যতা এবং অন্তর্ভুক্তির পৃথক সূচক নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তা না হলে উন্নয়ন মহাসড়কে পেছনের মানুষগুলো, বিশেষত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রগামিতা শুধু কাগজে লিপিবদ্ধ হবে, বাস্তবে নয়।

একটা সময় ছিল, যখন সমাজে প্রতিবন্ধী শিশুদের অবহেলার চোখে দেখা হতো বা অভিশপ্ত মনে করা হতো। অধিকার বলতে শুধু ছিল তার বেঁচে থাকা। তা-ও আবার শুধু পরিবারের মাঝে, বিশেষত মায়ের সান্নিধ্যে। এই নিষ্ঠুর সময়টা বোধ হয় আমরা পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছি। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের প্রতিবন্ধীবান্ধব উদ্যোগগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তবে এখনো এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো সমাজ থেকে একেবারে উবে যায়নি। প্রতিবন্ধী শিশু নিজস্ব পরিসরে—বিশেষত পরিবার, প্রতিবেশী, খেলার সহপাঠী এবং প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনে দৃষ্টিভঙ্গিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এর মূল কারণ, সমাজে একীভূত সংস্কৃতিচর্চার অভাব। তা থেকে উত্তরণের জন্য সবার সহযোগিতা খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি গ্রামের মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডার প্রতিনিধিরা ধর্মীয় আদলে একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন।

প্রতিবন্ধী মানুষের মুক্তির অন্যতম উপায় শিক্ষা। এই শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণে একীভূত-সমন্বিত-বিশেষায়িত নাকি ত্রিমাত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা—এ বিতর্কের শেষ নেই। কিন্তু চরম বাস্তবতা হচ্ছে, এ দেশ একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়নে এখনো প্রস্তুত নয়। এ ছাড়া বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে একীভূত শিক্ষার পাশাপাশি বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষার পথ সুগমকরণে প্রয়োজন একীভূত শিক্ষার সঙ্গে কমপক্ষে প্রতি উপজেলায় একটি করে বিশেষায়িত স্কুল স্থাপন করা। বিশ্বব্যাংক জরিপ ২০০৩ অনুযায়ী দেশে ৩৫ লাখ প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে, যার মধ্যে ১৪ শতাংশ স্কুলগামী। এর মধ্যে মৃদু প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যাই অধিক। বর্তমানে বাংলাদেশে এ সংখ্যা কোনোভাবেই ৩০ শতাংশের অধিক নয়।

দেশে এক কোটি ৬০ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষের ৫০ শতাংশ শিশু (১৪ বছর বয়স) এবং প্রবীণ। অর্থাৎ ৮০ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষ আছে, যাদের কম অংশ শিক্ষার্থী, বেশির ভাগই সক্রিয় শ্রমবাজারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। শ্রমবাজারের জন্য সক্রিয় প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা হবে কমপক্ষে ৬০ লাখ, যাদের মধ্যে ৫০ লাখ প্রকৃত অর্থে কর্মসংস্থানহীন। কর্মসংস্থানহীন এই ৫০ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৪০ লাখই হবে নিরক্ষর (বারকাত, ২০১১)। তথ্যে এটিই প্রতীয়মান যে কর্মক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রতিবন্ধী মানুষ দেশে কর্মহীন। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোটা বরাদ্দ থাকলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হচ্ছে না। সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধীবান্ধব কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষও প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কিছু করার সক্ষমতা রাখে—তা কোনোভাবেই নিয়োগ কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করানো যায় না। এটি আমাদের মানসিকতার চরম দরিদ্রতার বহিঃপ্রকাশ।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন

মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা