kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

পেঁয়াজ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

আব্দুল বায়েস

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পেঁয়াজ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

বিশ্ববিখ্যাত চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদাকে একবার তাঁর বন্ধু মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানালেন। সেই বন্ধুটি খেয়ালি কবিকে নিয়ে গেলেন তাঁর বাগান দেখাতে। বাগানে তো অনেক কিছুর চাষ থাকে—ফুল, ফলফলাদি, শাকসবজি কিংবা মসলা; কিন্তু তাঁর দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হলো একটি খুবই পরিচিত এবং অতি সাধারণ পণ্যের ওপর। পণ্যটির নাম পেঁয়াজ। পেঁয়াজ সম্পর্কে তাঁর তেমন কোনো ধারণা ছিল না বললেই চলে; কিন্তু পেঁয়াজের পরতে পরতে ভাঁজ ও এর ঝাঁজ নিয়ে লিখে ফেললেন সাড়া জাগানো এক কবিতা ঙফব ঃড় ঃযব ঙহরড়হ. লিখলেন—পেঁয়াজ, তুমি একটি উজ্জ্বল পালকবিশিষ্ট পাখির চেয়েও সুন্দর; তুমি আঘাত না করেও আমাদের কাঁদাও ইত্যাদি অনেক কিছু।

কিন্তু কবি সম্ভবত বুঝতে পারেননি যে পেঁয়াজ মূলত রান্নাঘরে নারীকে কাঁদায়। আবার এই পেঁয়াজ আঘাত দিয়েও পুরুষ মানুষকে কাঁদায়। মানুষ অর্থনীতিক জীব, দাম বা মূল্য অর্থনৈতিক একটি বিষয় বিধায় পেঁয়াজের দাম মানুষকে যেমন হাসাতে পারে, তেমনি পারে কাঁদাতে। এখানে মানুষ বলতে দরিদ্র কিংবা সীমিত আয়ের মানুষের কথা বলা হচ্ছে। তার অর্থ এই নয় যে বেশি বা কম দাম সচ্ছল ভোক্তাকে স্পর্শ করে না, তবে তারা সামলে নিতে সক্ষম হয় বলে আপাতত আলোচনার বাইরে রাখছি। যা-ই হোক, খুব অল্প দামে পণ্য ক্রয় করতে পারলে ভোক্তা ধন্য হয়, তার মুখের চওড়া হাসি কান ছুঁয়ে যায়। অন্যদিকে উচ্চমূল্য সীমিত বাজেট আরো সংকুচিত করে প্রান্তিক ভোক্তার ভোগান্তি বাড়ায়, তার চোখে জল ঝরায়।

একবার দিল্লিতে পেঁয়াজের দাম চূড়ায় উঠল। স্মর্তব্য যে ভারত কিংবা পাকিস্তানে পেঁয়াজ খাদ্যতালিকায় প্রথম কাতারে থাকে। আমরা যে পেঁয়াজ ব্যবহার করি তা দেখতে ছোট সাইজের, মোট খাদ্য বাজেটে এর অংশ বেশ কম বিধায় দামের উঠানামা খুব একটা ঘাম ঝরায় না। এর বিপরীতে দিল্লি কিংবা লাহোরে অথবা বেলুচিস্তানে বড় বড় রুটির সঙ্গে আপেল মার্কা বড় বড় পেঁয়াজ, অর্থনীতির নিরেট অর্থে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। কারণ রুটি প্রধান খাদ্য। তো, পেঁয়াজের উচ্চমূল্যে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিল্লিবাসী, যার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল ক্ষমতাসীন দলকে।

বাংলাদেশে গেল কয়েক দিন ধরে পেঁয়াজ না হলেও পেঁয়াজের দাম সবার মুখে মুখে। ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ হুড়হুড় করে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়! বর্তমানে এক কেজি পেঁয়াজের দাম গত বছরের পাঁচ-ছয় কেজি পেঁয়াজের দামের সমান। অর্থাৎ গেল বছর একটি পাঁচ সদস্যের পরিবার প্রয়োজনীয় পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনেছিল ২০০ টাকায় আর এখন কিনতে হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকার মতো। সরকার সংকট সমাধানে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সত্য, কিন্তু উড়োজাহাজে উড়িয়ে আনার পরও কেজিপ্রতি ২২০ টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাকে।

পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার এই সংকটের মূলে কী উপাদান কাজ করে? প্রথমত, চাহিদা ও জোগানের ফারাক বা ঘাটতি। বাংলাদেশে পেঁয়াজের যে পরিমাণ চাহিদা, সরবরাহ তার চেয়ে কম। এই ঘাটতি মোকাবেলায় ভারত থেকে আমদানি করতে গিয়ে বাধল বিপত্তি। কারণ ওই দেশটিতে  অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে রপ্তানি সীমিত অথবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সালে চালের সংকটের সময় ঠিক এমনটি করেছিল ভারত। চাল রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ বিপাকে পড়েছিল। বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় একজনের হাঁচিতে অন্যজনের জ্বর হয়। ভারত তার নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে—এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, সিন্ডিকেট। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে সিন্ডিকেট যত শক্তিশালী, সরকারও বোধ হয় ততটা শক্তিশালী নয়। এর প্রধান কারণ আজকাল ব্যবসায়ী রাজনীতি করেন আর রাজনীতিবিদ করেন ব্যবসা। শুধু পণ্যের বাজারে নয়, সিন্ডিকেট আছে শেয়ারবাজারে, টেন্ডারে এবং অন্যান্য জায়গায়।

প্রায় ৩০০ বছর আগে অ্যাডাম স্মিথ বলেছিলেন, যখন দেখবে দুজন ব্যবসায়ী কানে কানে কথা বলছেন তখন ধরে নেবেন যে তাঁরা ভোক্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। নিন্দুকেরা বলে, এসব সিন্ডিকেট যত দক্ষভাবে কার্যকর, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট যদি এমন হতো, তাহলে তো কথাই ছিল না। তৃতীয়ত, গুজব। যেকোনো পণ্যের চাহিদার অনেক নিয়ামক থাকে, যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে ভবিষ্যতের দাম সম্পর্কে প্রত্যাশা। ভোক্তা যদি ভাবে যে পেঁয়াজের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে, তাহলে সে আজই বেশি করে কিনে রাখবে। আবার ‘বুদ্ধিমান’ সিন্ডিকেট যদি খবর পায় যে ভারত কিংবা পাকিস্তানে পেঁয়াজের ঘাটতি আছে বলে বাংলাদেশের ঈশানকোণে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, তাহলে টনকে টন পেঁয়াজ বাজার থেকে অল্প দামে কিনে পরবর্তী সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা স্ফীত করবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। চতুর্থত, নিয়মিত বাজার পরিদর্শন ও বাজারমূল্যের পরিবীক্ষণের অভাব। মুক্তবাজারের প্রবক্তা অ্যাডাম স্মিথ যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, দক্ষ মনিটরিং না থাকলে বাজার অর্থনীতি যথাযথ কাজ করবে না। বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থাপনা অনেকটা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো, শুধু দুর্যোগ মুহূর্তেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়; তারপর যেই লাউ সেই কদু। সব শেষে সুশাসনের অভাব। পঞ্চমত, সময় এসেছে যখন চালমুখী নীতিমালা ও অবকাঠামো থেকে দৃষ্টি চালবহির্ভূত শস্যের ওপর দেওয়া উচিত। কিভাবে এসব পণ্যের সাপ্লাই চেইন উন্নীত করা যায়, কী করে এসব পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে আর্থিক ও গবেষণামূলক প্রণোদনা দেওয়া যায় সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি। শামুকে যেমন পা কাটে, আপাতদৃষ্টে এমন সব ক্ষুদ্র পরিমাণে উৎপাদিত পণ্য, যথা—আদা, রসুন, পেঁয়াজ জীবন জেরবার করার ক্ষমতা রাখে। এবং সব শেষে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আমাদের প্রথাগত চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে পরিবর্তন জরুরি। কথায় আছে, নেসেসিটি ইজ দ্য মাদার অব ইনভেনশন। দৈনিক পাঁচ কেজির জায়গায় চার কেজি পেঁয়াজ খেলে তেমন স্বাস্থ্যহানি ঘটবে বলে মনে হয় না। পেঁয়াজসংকটের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই যে আমারা পণ্যটির জন্য একটি দেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিলাম।

পেঁয়াজ কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ে অত হৈচৈ করার কিছু নেই। কৃষিপণ্যের দাম বাড়া মানে কৃষকের আয় বাড়া। জাপানিরা আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে তাদের কৃষকের উৎপাদিত চাল খায়, আমদানি করে না। এর কারণ তারা মনে করে, জাপানের আজকের অবস্থানে আসতে কৃষি তথা কৃষক যে ভূমিকা রেখেছে, সেই ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশে এই অনুভূতি প্রকটভাবে অনুপস্থিত। পেঁয়াজের চলমান অস্বাভাবিক দামের কথা আপাতত বাদ দিলাম, এমনিতেই চালের দাম, সবজির দাম কেজিপ্রতি দু-এক টাকা বেড়ে গেলে আমাদের বুকে জ্বালা ধরে যায়। অথচ কথায় কথায় বলে থাকি যে আমরা কৃষকের সন্তান, কৃষক জাতির মেরুদণ্ড ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে হৈচৈ করার ক্ষেত্র একটি আছেও বেশ জোরেশোরে। আর সেটি হলো খুচরা দামের কত অংশ কৃষকের ঘরে যায়। এই যে ৪০ টাকার পেঁয়াজ ২০০ টাকার ওপরে উঠল অর্থাৎ কেজিপ্রতি অতিরিক্ত ১৬০ টাকার কতটুকু কৃষক তথা উৎপাদক পেয়েছে? বস্তুত কিছুই পায়নি। লাভের গুড় যেমন ইঁদুরে খায়, কৃষকের কপাল পুড়ে সিন্ডিকেট। এটি চিরায়ত যে কৃষক তার ন্যায়সংগত হিস্যা থেকে বঞ্চিত থাকে।

পত্রিকায় প্রকাশ, ইদানীং অন্যান্য পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগেই বলেছি, মূল্যবৃদ্ধি পাবেই, পাবে। কারণ কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। একমাত্র অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, যার ওষুধ নিয়মিত বাজার তদারকি, চাহিদা-জোগানের যথাযথ হিসাবের পর জোগান বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিন্ডিকেটের কারসাজির বিপক্ষে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা।

অতি শিগগির পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক হবে এবং একই সঙ্গে সদ্য সংকট থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাটাও হারিয়ে যাবে। বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের বাজার ঠিকমতো কাজ করে না। এর প্রধান কারণ চালের কিংবা পেঁয়াজের বাজারে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ভূমিকা। সিন্ডিকেট নামধারী এদের জন্য শেয়ারবাজারে ধস নামে, ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে যায়, মানুষ বেঘোরে রাস্তায় প্রাণ হারায় এবং টেন্ডার ছিনতাই হয়। নিন্দুকেরা বলে, এরা নাকি সরকারের চেয়েও শক্তিশালী। শক্ত হাতে এই অপশক্তি মোকাবেলা করতে না পারলে চোখের জল ঝরতেই থাকবে।

বাট হু উইল বেল দ্য ক্যাট—বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা