kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

মাননীয় মন্ত্রী ভনে, শোনে অভাজন...

শফিক আশরাফ

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাননীয় মন্ত্রী ভনে, শোনে অভাজন...

একদিন সকালে ঘুম ভেঙে পিঁপড়া দেখতে পায় বনের সব পশু লাইন ধরে কোথায় যেন চলেছে! পিঁপড়া অবাক বিস্ময়ে জানতে চায় : এই সকাল সকাল তোমরা কোথায় চলেছ? শিয়াল উত্তর দেয় : তুমি জানো না গত রাতের ঝড়ে বাঘ দুই গাছের চিপায় আটকা পড়েছে! আমরা যাচ্ছি তাকে একটি করে লাত্থি মারতে, খুব জ্বালিয়েছে বেটা। কথা শুনে পিঁপড়াও লাইনের শেষে দাঁড়িয়ে যায়। শিয়াল বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে : তুমি আবার কোথায় যাবে! পিঁপড়া বলে কেন! সুযোগ যখন পেয়েছি, আমিও বেটাকে দুটি লাথি মেরে আসি। পেঁয়াজ নিয়ে সরকারের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সরকার চিপায় পড়েছে আর সবাই কথা শোনাচ্ছে। কিন্তু একটি জিনিস মনে রাখা দরকার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এই দেশে একসময় অসম্ভব মনে করা হতো; কিন্তু বর্তমান সরকার অসীম সাহসিকতায় সেটি করে দেখিয়েছে। জামায়াত-শিবিরের মতো সুসংগঠিত দল আওয়ামী লীগের কৌশল-প্রচার ও দাপটে বিলুপ্তির পথে। আর কয়েকবার সরকার চালানোর অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ দল বিএনপি টিকে থাকার জন্য নাভিশ্বাস তুলছে। সরকারের সদিচ্ছায় ক্যাসিনো ব্যবসায়ী, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কেউ অপকর্ম করে পার পাচ্ছে না। এসব কথা বাদ দিলেও নানা কারণে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ বিশ্বের সামনে উঠে আসছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের অসহযোগিতা সত্ত্বেও পদ্মা সেতু তৈরির কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসছে।

আর সামান্য পেঁয়াজের দাম সরকার কমাতে পারছে না! কোথায় যেন বড় একটি কিন্তু রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘মানুষ পায় সোনার খনি, রুপার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি!’ পেঁয়াজের আগুনে ঘি ঢালতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়রা বড় বেশি কথা বলছেন। এক মন্ত্রী বলছেন—পেঁয়াজের দাম নাগালের মধ্যে আছে। ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ ২৪০ টাকা হওয়ার পরও কী করে নাগালের মধ্যে থাকে, সেটি  কারো বোধগম্য নয়। তিনি এটি বলে সরকার কিংবা জনগণ কার পক্ষে সাফাই গাইছেন, সেটি পরিষ্কার নয়। যাঁরা এই পেঁয়াজ সিন্ডিকেট চক্রের হোতা, তাঁদের যদি বক্তব্য নেওয়া যায়, তাঁরা সম্ভবত পেঁয়াজের দাম খুব বেশি বাড়েনি, এ কথাই বলবেন। সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে আমাদের নারী নানা ধরনের নিগৃহের শিকার হচ্ছে, এমনকি তিন শর বেশি লাশ ফেরত এসেছে। এক মন্ত্রী বলে বসলেন—এই লাশ খুব বেশি না, এটি সামান্য! এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত। বিগত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নানা সফলতার চিত্র ঢাকা পড়েছিল একটি বক্তব্যে। ব্যাংক ঋণখেলাপিদের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকাকে সামান্য টাকা বলে ব্যাপক বিতর্কিত হয়ে শেষ পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসকরা আমাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের এ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ, এই জাতীয় চেতনার বিস্ফোরণ। সরকার এ দেশকে ডিজিটাইজেশনের চূড়ান্ত দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে মানুষ। আর যেটি হচ্ছে, পৃথিবীর তাবৎ তথ্য এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। কাজেই ইউরোপে পেঁয়াজের কেজি কত আর বাংলাদেশে কত, সেটি কোনো মন্ত্রী বলার আগেই তারা জেনে যাচ্ছে আর এ বিষয়ে বিভিন্ন ভার্চুয়াল মিডিয়ায় মতামত প্রকাশ করতে পারছে। আমাদের দেশের মন্ত্রীরা কি জানেন তাঁদের বক্তব্য নিয়ে সাধারণ মানুষ কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে? সম্ভবত জানেন না, জানলে অবিবেচনাপ্রসূত কথা বলার আগে ভাবতেন। আমাদের নিকট-স্মৃতিতে মনে আছে, এ দেশে চালের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় বিএনপি সরকারের এক অর্থমন্ত্রী মানুষকে ভাতের বদলে আলু খেয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের ব্যর্থতা স্বীকার করেননি, উল্টো জনগণের ভেতর দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন! সম্ভবত, ক্ষমতা মানুষের ইগোকে নতি স্বীকার করতে বাধা দেয়। ভুল বা ব্যর্থতা স্বীকার করাও এক ধরনের যোগ্যতা আর এই যোগ্যতা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। আমাদের মন্ত্রী-আমলারা বিষয়টি ভুলে যান। সব সরকারের আমলে মন্ত্রীদের কথাবার্তার ধরন প্রায় একই রকম। অথচ এটি হওয়ার কথা নয়। এটি সত্য যে আমাদের প্রবীণ প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদের সংখ্যা কমে আসছে! তাঁদের মধ্যে এখনো যে কয়জন জীবিত, তাঁদের বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনীতির বড় অংশ এখন ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদের হাতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উচিত এসব ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদের কার্যক্রমে সুতীক্ষ নজর রাখা। তিনি এর আগে একবার তাঁর মন্ত্রীদের কথাবার্তায় সংযত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁর সতর্কবার্তা কিছুটা কাজে লেগেছিল। আবার এসব লাগামছাড়া কথাবার্তার প্রতি নজর দেওয়ার সময় এসেছে। সরকারের সাফল্য মন্ত্রীদের কথাবার্তার কারণে কেউ অন্যদিকে ডাইভার্ট করার সুযোগ পাক, সেটি কারো কাম্য নয়।

জর্জ অরওয়েল তাঁর ‘পলিটিকস অ্যান্ড দি ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মিথ্যাকে সত্য, হত্যাকে শ্রদ্ধাপূর্ণ আর শান্তিময় পরিবেশকে ভৌতিক করে তোলার জন্য আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে গলাবাজির রাজনীতি বজায় রাখি।’ আর গলাবাজির রাজনীতি অযোগ্যদের হাতিয়ার। আর যোগ্যদের অস্ত্র বিশ্বাস, দূরদর্শিতা, বিবেচনা এবং দেশ ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা। আমাদের মন্ত্রীদের কাজের মাধ্যমেই জনগণ তাঁদের যোগ্যতা দেখতে হবে। কোন যোগ্যতায় মন্ত্রী করা হয়েছে, সেটি তারা জানে না!

আমাদের বর্তমান পেঁয়াজ সমস্যার হয়তো দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কার্যকর সমাধান আসবে। কিন্তু আমাদের মন্ত্রীদের বলে ফেলা কথাবার্তা ফেরত যাবে না। এগুলো দীর্ঘ সময় চর্চিত হবে মানুষের মুখে। তাঁদের কথার কারণে সাফল্যকেও ব্যর্থতা বলে মনে হবে। কাজেই সেই দিন আসার আগেই কথাবার্তায় সংযত হওয়া উচিত; উচিত লাগাম টানা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা