kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

টেলিভিশনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

ফরিদুর রহমান

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টেলিভিশনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে বিশ্বব্যাপী শতকোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে গেছে টেলিভিশন। অগণিত মানুষের জন্য সহজলভ্য বিনোদন, সার্বক্ষণিক তথ্য প্রবাহ এবং অনুুপ্রেরণার অসংখ্য কাহিনি সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবন সম্পর্কে মানুষের ধারণা প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। টেলিভিশন সম্প্রচারের কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু নিয়ে দর্শকের ক্রমবর্ধমান কৌতূহল, আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় পৌঁছে যেতে টেলিভিশন পরিণত হয়েছে এক অঙ্গীকারবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে। এ বছরের বিশ্ব টেলিভিশন দিবসের প্রতিপাদ্যে তাই বিষয় বৈচিত্র্যের মাধ্যমে দর্শকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ এবং টেলিভিশনের শক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ ও সমৃদ্ধি অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

মানবজাতির সভ্যতার ইতিহাস দীর্ঘকালের হলেও দেশে দেশে বিবেচনাহীন মানুষের শুভবুদ্ধির অভাবে পৃথিবীজুড়ে যুদ্ধবিগ্রহ, সংকট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা থেমে নেই। মানব কল্যাণের ক্ষেত্রে এ ধরনের যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে টেলিভিশনের প্রভাব প্রতিপত্তি বিবেচনায় রেখে জাতিসংঘ নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই গণমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনের জন্য একটি স্বীকৃতির কথা ভাবতে শুরু করে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং মানুষেরই তৈরি নানা ধরনের মানবিক বিপর্যয় ও বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশে টেলিভিশনের সংবাদ ও তথ্যচিত্র জনমত গঠন এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রে যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে তা জাতিসংঘের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এ ছাড়া সামাজিক অগ্রযাত্রায় এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও মূল্যবোধ সংরক্ষণে, এমনকি অনগ্রসর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও টেলিভিশন সম্প্রচারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এই বিবেচনাবোধ থেকেই ১৯৯৬ সালের ২১ ও ২২ নভেম্বর জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বিশ্বের প্রধান প্রধান মিডিয়া ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত প্রথম টেলিভিশন ফোরামে ২১ নভেম্বরকে বিশ্ব টেলিভিশন দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করা হলে একই বছর ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

জাতিসংঘ বিশ্ব টেলিভিশন দিবসকে যেভাবে অনুধাবন ও উপস্থাপন করতে চেয়েছে,  তা জাতিসংঘ ঘোষিত অন্যান্য দিবসের মতো জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ বা আনুষ্ঠানিকতামাত্র নয়; বরং এই দিবসটি একটি দর্শনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিশ্বায়নের এই যুগে সমগ্র মানবজাতিকে একটি সুদৃঢ় বন্ধনে একত্র করার ক্ষেত্রে টেলিভিশন একটি প্রতীকের মতো। ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, শরণার্থী সংকট মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্ব নেতৃত্বকে প্রভাবিত ও ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, বিশেষ করে টেলিভিশনকে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ব্যাপারেই গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘ।

এরপর থেকে প্রতিবছরই অ্যাসোসিয়েশন অব কমার্শিয়াল টেলিভিশন, ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন এবং অ্যাসোসিয়েশন অব টিভি অ্যান্ড রেডিও সেলস হাউস জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে বিশ্বের টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সঙ্গে একযোগে কাজ করে চলেছে। টেলিভিশনে প্রচারিত কনটেন্ট বা বিষয়বস্তুর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিষয় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি প্রচারিত বিষয় যেন স্থানীয়ভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে কোনোভাবেই আহত না করে। জনকল্যাণমুখী অবদান রাখতে পারে সে ব্যাপারেও জাতিসংঘের ঘোষণায় দেওয়া হয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। কারণ জাতিসংঘ মনে করে টেলিভিশন তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি রেখে চলেছে জনকল্যাণমুখী কাজের ক্ষেত্রে। ভূমিকম্প বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে, যুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো মানবিক বিপর্যয়ে, জরুরি তৎপরতা ও ত্রাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে টেলিভিশন। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, দুর্নীতি ও শোষণ নিপীড়নের স্বরূপ সন্ধানে, দুর্বল জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে, এমনকি ভোটাধিকার বা গণতন্ত্রের সুরক্ষায়ও কাজ করে যাচ্ছে এই গণমাধ্যম। তবে সম্প্রতি সারা বিশ্বেই বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে টেলিভিশনের মতো শক্তিশালী এবং বিপুল ক্ষমতার অধিকারী প্রতিষ্ঠানটিও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।       

২০১১ সালে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত ‘সপ্তম এশিয়া মিডিয়া সামিট’-এ বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা সেই প্রথমবারের মতো জানতে পারেন ‘নিউ মিডিয়া’ পরিচয়ে একটি নতুন গণমাধ্যম দ্রুত এগিয়ে আসছে। এশিয়া-পেসিফিক ইনস্টিটিউট অব ব্রডকাস্টিং ডেভেলপমেন্ট আয়োজিত এই শীর্ষ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, বর্তমানে টেলিভিশন বলতে যা বোঝায়, পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে তা ভীষণভাবে বদলে যাবে, এমনকি একপর্যায়ে টেলিভিশনের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আমরা যারা মিডিয়া সামিটে উপস্থিত ছিলাম তারা  সম্ভবত বিষয়টি বুঝতে পারিনি অথবা বুঝতে পারলেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করিনি।

ভবিষ্যৎ টেলিভিশনের যে রূপরেখা হ্যানয় সম্মেলনে উপস্থাপিত হয়েছিল, ১০ বছর পার হওয়ার আগেই তার আলামত আমরা দেখতে শুরু করেছি। সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতা ও ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রথাগত টেলিভিশনের সামনে প্রকৃতপক্ষেই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দর্শক এখন গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা পেতে চায়, তারা ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছে ‘ইন্টার্যাক্টিভ মিডিয়ার’ দিকে। টেলিভিশনে এবং টেলিভিশনের বাইরে যে মাধ্যমে দর্শক তার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে তা বিপুলসংখ্যক দর্শককে আকৃষ্ট করতে পেরেছে। দর্শকদের এক বিরাট অংশ প্রথাসিদ্ধ টেলিভিশনের নিজস্ব প্রচারসূচির বাধ্য-বাধকতায় আটকে থাকতে চায় না। ফলে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ছোট ছোট ওয়েব চ্যানেল এবং ইউটিউবসহ ভিন্ন ধারার সম্প্রচার মাধ্যম। এ ছাড়া দর্শকের নিজস্ব ভাবনা যেমন  টেলিভিশন কনটেন্ট হিসেবে যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমের চাপে বদলে যাচ্ছে খোদ টেলিভিশনের বিষয়বস্তু।

টেলিভিশন সৃষ্টির আদি থেকে দীর্ঘকাল দর্শকের জন্য একমুখী সম্প্রচার ব্যবস্থায় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের সুযোগে দর্শককে যা ইচ্ছা তাই দেখতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক চ্যানেলগুলো তাদের লভ্যাংশের বাইরে জনকল্যাণমূলক কিছুই ভাবেনি। এখন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ক্রমেই দর্শক তথা জনগণের হাতে চলে আসছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং আমাদের বাণিজ্যিক টেলিভিশন চ্যানেলগুলো জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিনোদন ও কল্যাণমুখী সম্প্রচার নিশ্চিত করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে তাদের শুধু টিকে থাকাই চরম সার্থকতায় পরিণত হতে পারে।

 

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান), বাংলাদেশ টেলিভিশন

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা