kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

আজকের বাংলাদেশ ও আমাদের সশস্ত্র বাহিনী

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আজকের বাংলাদেশ ও আমাদের সশস্ত্র বাহিনী

প্রতিবছরের মতো এবারও ২১ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালিত হচ্ছে। প্রত্যেক জাতি-রাষ্ট্রের কিছু দিনক্ষণ থাকে, যা সময়ের বিবর্তনে কখনো গুরুত্ব হারায় না; বরং রাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং অগ্রযাত্রায় তার মাহাত্ম্য আরো বৃদ্ধি পায়। জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। আমাদের এই স্বাধীনতা আলাপ-আলোচনা, দেন-দরবার বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের মধ্যস্থতার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। তা অর্জিত হয়েছে ৩০ লাখ মানুষের  জীবনের বিনিময়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তা সম্ভব হয় মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে, অভাবনীয়। চূড়ান্তভাবে পরাজিত এবং লাখো জনতার সম্মুখে  জয় বাংলা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত আজকের  সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবনত মস্তকে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের ইতিহাসে  অনন্য ঘটনা। আমেরিকা তাদের স্বাধীনতা অর্জনে প্রায় ছয় বছর যুদ্ধের পরও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। ১৭৮৩ সালে যুদ্ধবিরতি ও প্যারিস চুক্তির মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সরকার  আমেরিকার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নেয়। ভিয়েতনাম ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। দীর্ঘ ২৮ বছর যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার স্বীকৃতি পায়। তবে চূড়ান্তভাবে দখলদার আমেরিকান সেনারা ভিয়েতনাম ত্যাগ করে ১৯৭৫ সালে।

আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণ জয়ন্তী আর মাত্র দুই বছর পর ২০২১ সালে। তার আগে ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, যাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশ কখনো স্বাধীন হতো না। সময়ের এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে স্বাধীনতার ৪৮ বছরের মাথায় কোথায় অবস্থান করছে বাংলাদেশ এবং তার সশস্ত্র বাহিনী। সব অফিস, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্বজুড়ে সশস্ত্র বাহিনীকে রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অন্য রকম একটি বিশেষত্ব রয়েছে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর জন্ম হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাঠে, যার সঙ্গে একান্তভাবে জড়িত ছিল এ দেশের সর্বস্তরের জনগণ। একাত্তরের যুদ্ধের মাঠে জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। একই সঙ্গে রক্ত ঝরছে বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে এবং পথে প্রান্তরে। তাই জন্মের শুরু থেকে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি জনগণের একটা ভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে আসছে। বিগত ৪৮ বছরে জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষা সর্বদাই প্রতিপালিত হয়েছে তা বলা যাবে না, দুঃখজনক হলেও ব্যত্যয় ঘটেছে। ১৯৭৫ সালে জাতির জনকের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় ১৫ বছর দুজন সামরিক শাসক জনগণ থেকে সেনাবাহিনীকে আলাদা করে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাতে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, বাধাগ্রস্ত হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রায়ন ও উন্নতি। তবে আজকে যখন সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালিত হচ্ছে তখন একথা নিশ্চিত করে বলা যায় আজ সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণ একই কাতারে কাতারবন্দি। জাতির পিতার অনেক স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ বিশ্ব অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হবে। তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র, ১৯৭২ সালে তিনি শূন্য হাতে যে যাত্রা শুরু করলেন তার প্রারম্ভেই সেনাবাহিনীর মর্যাদার প্রতীক বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করলেন। প্রথম অফিসার ব্যাচের পাসিং আউট প্যারেডে নিজে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে গর্বেভরা চোখে-মুখে ক্যাডেটদের সালাম গ্রহণ করলেন। তারপর ভাষণে বললেন, ‘তোমরা আমার সন্তান, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, তোমাদের মনে যেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেন্টালিটি না আসে, তোমরা হবে আমার জনগণের সেনাবাহিনী।’

আজ পাকিস্তানের দিকে তাকালে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু সেদিন কত বড় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কথা বলেছিলেন। মোল্লা আর মিলিটারির কবলে পড়ে পাকিস্তান আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৭৫ সালের পরে বাংলাদেশ এক অশুভ শক্তির কবলে পড়েছিল। সে ছিল এক অন্ধকার যুগ। অনেক ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত উতরিয়ে বাংলাদেশ আজ জাতির পিতার স্বপ্ন পুরানোর পথে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে তাঁরই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীও একই তালে এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সবচেয়ে বর্ধনশীল দেশের মধ্যে একটি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বড় বড় গবেষণা সংস্থা থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান ধারা বজায় থাকলে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৮তম অর্থনীতির দেশ হবে। কিন্তু কয়েক বছর আগে ২০০১-২০০৬ মেয়াদের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মিডিয়া হাউস থেকে বলা হচ্ছিল পরবর্তী আফগানিস্তান হবে বাংলাদেশ। একাত্তরের পরাজিত ও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের সীমাহীন দাপট। একসময়ে তারা বলা শুরু করল, এ দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম জীবিত থাকতে এত বড় স্পর্ধা দেখিয়ে তারা পার পেয়ে গেল কাদের সমর্থনে, কাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। সেই কালো অন্ধকার সময় থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি, এটাই বড় কথা। এখন আমাদের সামনে এগোনোর পালা।

বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল, জঙ্গি দমনের উদাহরণ। ১৭ কোটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যেভাবে বাড়ছে তাতে আগামী এক দশকে বাংলাদেশ হবে ওয়ালমার্টের মতো বিশ্বের বড় বড় খুচরা বিক্রেতা হাউসের অন্যতম আকর্ষণ। দেশের সম্পদ যত বৃদ্ধি পাবে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে জাতীয় স্বার্থের পরিধি। তাই জাতীয় স্বার্থের প্রতিরক্ষার জন্য সশস্ত্র বাহিনীকেও একইভাবে সমৃদ্ধ হতে হবে। সেই লক্ষ্যে ফোর্সেস গোল ২০৩০ অনুসারে সব বাহিনীকেই যুগোপযোগী করে তোলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রখর দূরদৃষ্টিপূর্ণ পরিকল্পনার আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সব শাখার ব্যাপক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের কাজ চলছে। সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন ডিভিশন, ব্রিগেড ও ইউনিট গঠন করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ট্যাংক, গোলন্দাজ বাহিনীর কামান এবং উন্নতমানের মিসাইল। সেনাবাহিনীর এভিয়েশন শাখা এখন পরিপূর্ণ ডিভিশন পর্যায়ে উন্নত হয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পেশাগত দক্ষতা ও সিনিয়র অফিসারদের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলগত জ্ঞান অর্জনের যত রকম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, একাডেমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন, তার সবই এখন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে রয়েছে। আছে নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় এবং অর্ধডজনের মতো মেডিক্যাল কলেজ। নৌবাহিনী এখন ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। আধুনিক সাবমেরিন এখন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গর্ব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সাহস এবং কৌশলী বিদেশ নীতির কারণে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের প্রায় সমান আয়তনের সমুদ্র অঞ্চলের ওপর এখন বাংলাদেশের নিষ্কণ্টক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীতার পর এটিই এ যাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। এই সমুদ্রের পানির নিচে যে পরিমাণ অঢেল ও অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বিপুলভাবে সম্পদশালী করবে। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য বিশাল ও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। অন্য কিছুর কথা না বললেও শুধু সমুদ্রসীমার দ্বন্দ্ব মীমাংসা এবং ছিটমহল সমস্যার সমাধান—এই দুটি ঐতিহাসিক কর্ম শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে দেবে। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সঙ্গে বিমানবাহিনীও সমানভাবে এগিয়েছে। সম্প্রসারণসহ নতুন নতুন বিমান ঘাঁটি গঠন করা হয়েছে। যোগ হয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিমান এবং রাডারসহ উন্নতমানের সরঞ্জাম। আজকে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে বলতে পারি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রতিরক্ষায় পরিপূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করেছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী। বাংলাদেশ যেমন বিশ্ব অঙ্গনে মর্যাদাশীল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনি সশস্ত্র বাহিনীও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের অধীনে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখে চলেছে। উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়তই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির চিত্রে নতুন নতুন উপাদান যোগ হচ্ছে। নতুন মেরুকরণ হচ্ছে এবং সমীকরণের পরিবর্তন ঘটছে। এই চলমান পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে বাংলাদেশ ও তার সশস্ত্র বাহিনীকে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে শত্রু-মিত্রের বিবেচনা ও মূল্যায়ন আগের ধাঁচে করলে চলবে না। চলমান বিশ্বে শত্রু-মিত্রের কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নেই। সুতরাং ২০৩০ এবং ২০৪০ সালে বাংলাদেশ যে রকম সম্পদশালী হবে ও সমৃদ্ধির জায়গায় যাবে সেটিকে বিবেচনায় রেখেই সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা ও উন্নয়ন চলমান রাখতে হবে, যাতে সময়ের বিবেচনায় আমাদের সশস্ত্র বাহিনী পিছিয়ে না থাকে। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি আমাদের সশস্ত্র বাহিনী যেন সর্বদাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনায় সমৃদ্ধ থাকে।

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

নিউ অরলিনস, ইউএসএ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা