kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

স্বচ্ছতা থাক শুদ্ধি অভিযানে

সারওয়ার-উল-ইসলাম

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বচ্ছতা থাক শুদ্ধি অভিযানে

শুদ্ধি অভিযান চলছে, শুদ্ধি অভিযান চলবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি এমনটাই বলেছেন। বলেছেন, আগে নিজের ঘর থেকেই এ অভিযান চালাতে হবে। তেমনটাই চলছে। নিজের দলের ভেতর যাঁরা গত ১০-১১ বছরে ফুলেফেঁপে উঠেছেন অবৈধভাবে টাকা-কড়ি কামিয়ে, তাঁদের দিয়েই শুরু করেছেন। বাংলাদেশে সম্ভবত এই প্রথম এমন অভিযান নিজের দল থেকে শুরু হওয়া।

এরই মধ্যে অনেক হোমরাচোমরা নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে যাঁরা আছেন। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সেই নেতাকর্মীরা, যাঁরা ক্ষমতার মোহে ‘যাচ্ছেতাই’ করেছেন নিজ নিজ এলাকায়।

কী করেননি তাঁরা? অবৈধভাবে জায়গা দখল করে, দোকানপাট তুলে ভাড়া দেওয়াসহ ফুটপাতে দোকান বসিয়ে বছরের পর বছর চাঁদাবাজি করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অনেকের ঘরে ভাত রান্না পর্যন্ত হতো না, এমন অনেক সরকারদলীয় কর্মী আজ গাড়ি-বাড়ি করে, হজ করে একেবারে সহি মানুষে রূপান্তরিত হয়েছেন—এমন গল্প অনেক এলাকায় চালু রয়েছে। ভেবেছিলেন, কোনো দিন এসব বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে না—পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন দেখলেন, দেয়ালে একেবারে পিঠ ঠেকে গেছে, দলের ইমেজ রক্ষার জন্য হলেও শুদ্ধি অভিযান জরুরি, ঠিক সেই সময় নিজের ঘর থেকেই শুরু করলেন শুদ্ধি অভিযান। একে একে বের হলো থলের বিড়াল।

আর যাঁরা গত ১০-১১ বছরে ক্ষমতার খুব কাছে থেকে যা ইচ্ছা তা-ই করেছেন তাঁরা অনেকে এখন নিজেকে ধোয়া তুলসীপাতা হিসেবে প্রচার করার জন্য সরকারের অনেক প্রভাবশালীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

কথাটি অপ্রিয় হলেও সত্য যে এখন যাঁদের থলের বিড়ালের খবর বের হচ্ছে তাঁদের খবর আগে কেন মিডিয়ায় আসেনি? কেন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের ব্যাপারে মুখ খোলেননি? খুবই যুক্তিসংগত প্রশ্ন, কোনো সন্দেহ নেই।

এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে যাওয়া সরকারের জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের বাঁচাতে মিডিয়ায় কথা বলছেন শুদ্ধি অভিযান নিয়ে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে খুব হিসাব করে চলতে হবে। যাঁরা একসময় ফুটপাত দখল করে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেট এবং এর আশপাশের এলাকায় দোকানপাট বসিয়ে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন তাঁরা মিডিয়ায় কথা বলছেন শুদ্ধি অভিযান নিয়ে। যাঁরা বাড়ি দখল থেকে শুরু করে মানুষকে নির্যাতন করেছেন জনপ্রতিনিধি হওয়া ক্ষমতার বলে তাঁরা নিজেকে সাধু সাজানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

শুদ্ধি অভিযানে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে সরকারের এই উদ্যোগও মাঠে মারা যাবে।

শুদ্ধি অভিযান হোক সবার জন্য। শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয়, সমাজের সব ক্ষেত্রে এই শুদ্ধি অভিযান হলে একজন সরকারি কর্মকর্তার থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। একজন সাংবাদিকের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। একজন আইনজীবীর থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে, যাঁরা অবৈধভাবে টাকা কামিয়েছেন মানুষকে জিম্মি করে।

মানুষকে কতটা হয়রানিই না পোহাতে হয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে বড় কর্মকর্তাকে ঘুষ না দিলে। ভূমি অফিসের বড়কর্তাকে ঘুষ না দিলে ফাইলই নড়ে না। এই কাগজ আনেন, ওই কাগজ আনেন—এভাবে হয়রানি করা হয়। একইভাবে বিদ্যুৎ, তিতাস, গ্যাস, ওয়াসা অফিসের ছোট কর্মচারী থেকে শুরু করে বড়কর্তাকে খুশি করতে না পারলে কাজই হয় না। কই, এই শুদ্ধি অভিযানে তো এ রকম একজন ঘুষখোর বড়কর্তার ছবি দেখা গেল না মিডিয়ায়! তাঁরা কি তাহলে ধোয়া তুলসীপাতা, নাকি তাঁদের খুঁটির জোর অনেক শক্ত? আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো বলেছেনই কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। চুনোপুঁটি থেকে শুরু করে সবাইকে এই শুদ্ধি অভিযানের আওতায় আনা হবে।

আমরা চাই সেই শুদ্ধি অভিযান, যাঁরা এত দিন জনগণকে জিম্মি করে টাকা কামিয়েছেন। যাঁরা সরকারি জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি তুলে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। যাঁরা জনপ্রতিনিধি হয়ে ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে ফুটপাত দখল করে, দোকানপাট বসিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

ঢাকা শহরে গত চার-পাঁচ বছরে আরেকটি টাকা কামানোর পথ তৈরি করেছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা নেওয়ার জন্য প্রতিটি বাড়ির মালিক সিটি করপোরেশনকে কর দিচ্ছেন প্রতিবছর। কিন্তু লোকবল কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে কাউন্সিলররা নিজেদের সংগঠনের লোক দিয়ে ময়লা-আবর্জনা তুলে নিয়ে মাসে মাসে বাসাবাড়ি থেকে পরিবারপ্রতি ১০০ টাকা করে নিচ্ছেন। বহুতল ভবনে ২০০ টাকা করেও নেওয়া হয়। এই ময়লা নিয়ে দলাদলি আর মারামারির ঘটনা ঘটেছে অনেক জায়গায়। কারণ এতে একটা বড় ফান্ড কালেকশন হয়, যেটার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দলীয় কর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই। কারণ এই ময়লা নেওয়া টাকার ভাগ স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে কাউন্সিলর এবং ওয়ার্ড কমিটির নেতারাও পান।

শুদ্ধি অভিযান কোথায় প্রয়োজন নেই, সেটা এখন ভাবা দরকার। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে দুর্নীতি। প্রধানমন্ত্রী তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়ার কথা বলেছেন। কারণ তিনি জেনেছেন সবখানেই আজ কলুষিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আর এটা নিজের দলের ভেতরেই বেশি। তাই তাঁর চিন্তা আগে নিজের ঘর, পরে অন্যের ঘর। যাঁদের ওপর এই শুদ্ধি অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁদের উচিত ঢাকা শহরের প্রত্যেক কাউন্সিলরের ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে তালিকা প্রণয়ন করা। কে কত দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, কে কত টাকার মালিক হয়েছেন গত ১০-১১ বছরে—সেটা বেরিয়ে আসবে। এখন অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে। আর এই সাহস দিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাইতো দেখা যাচ্ছে, কোনো ওয়ার্ড কাউন্সিলর যখন গ্রেপ্তার হচ্ছেন তখন এলাকার লোকজনের ভেতর কী আনন্দ কাজ করে। অনেকেই মুখ খুলতে চায়। শুধু প্রয়োজন দেশকে ভালো রাখার বোধটুকু।

কারণ এই দেশের জন্য কত মানুষই না প্রাণ দিয়েছেন একাত্তরে। সেই চিন্তাটা মাথায় রেখে শুদ্ধি অভিযানের নেতৃত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের ইচ্ছাশক্তিটাই যথেষ্ট। প্রয়োজন শুদ্ধি অভিযানে স্বচ্ছতা। সেটা থাকলেই কোনো সাংবাদিককে বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে হাতে রেখে বা প্রভাবশালী সরকারদলীয় মন্ত্রী-নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থেকেও রেহাই পাবেন না সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার চিন্তায় যাঁরা অবৈধভাবে ধন-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা