kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক রচনায় সমন্বয়হীনতা

রুমানা আফরোজ

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক রচনায় সমন্বয়হীনতা

অনেক দিন থেকে ভাবছি আমাদের বাংলা বিষয়ের বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্য বইগুলো নিয়ে লিখব। কিন্তু নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বারবারই বাধাগ্রস্ত করেছে মনকে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে যেন সত্যিকারের নির্ভুল কিছু পাঠ্য বই আমরা শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে পারি—সেই সময় এসেছে। আমি আমার দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে লেখাটা লিখতে বসেছি। এই আশায় যে লেখাটা যেন যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।

প্রথমেই বলে রাখছি, আমাদের বিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী গত কয়েক বছর আগে যখন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে বাংলা প্রথম পত্রের ওপর বিভিন্ন শ্রেণির বই ঢালাওভাবে সাজিয়ে নতুন করে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিলেন, বইগুলো আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। বইগুলোতে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন গল্প-কবিতার মান খুবই ভালো। লেখার ভঙ্গিও চমৎকার। খুব ছোট ছোট কিছু ত্রুটি ছিল, যা এই কয়েক বছরে একটু একটু করে সংশোধনও করা হয়েছে।

কিন্তু আসলে সমস্যা এখানে নয়, অন্য জায়গায়। প্রথমেই খুব ছোট্ট একটি বিষয় নিয়ে শুরু করছি। ‘যুক্তবর্ণ’। প্রথম শ্রেণির বইয়ের শেষের দিক থেকে এবং দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত আমার ‘বাংলা বই’-এ যুক্তবর্ণগুলো শিক্ষার্থীদের চেনানো হয়েছে এভাবে—

কন্যা  ন্য   ন   ্য  (য-ফলা)

ঊর্ধ্ব  র্ধ্ব   র্ধ    ব 

সূর্য   র্য   র্     য

কিন্তু হঠাৎ করেই পঞ্চম শ্রেণির আমার ‘বাংলা বই’-এ যুক্তবর্ণের কোনো নাম-নিশানাই নেই। অথচ পঞ্চম শ্রেণির ‘প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা’য় যুক্তবর্ণের ওপর আলাদা করে ৫ নম্বর রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের যুক্তবর্ণ বিশ্লেষণ করতে বলা হয় এবং শব্দ গঠন করতে বলা হয়।

অন্য একটি জায়গায়ও আপত্তি রয়েছে। বাংলা বিষয় নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে গিয়ে আমরা শিখেছি যুক্তবর্ণ বিশ্লেষণ করতে গেলে হস্ ( ্ ) চিহ্ন দিতে হবে। যেমন—

ন্য = ন্ + য-ফলা (্য)

র্য =র্  (র-রেফ) + য

ন্দ  = ন্ + দ্ + র-ফলা ( ্র)

অথচ এর প্রয়োগ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো বাংলা বইতেই নেই। সহজভাবে শিক্ষার্থীদের বোঝালেই হয় যে ব্যঞ্জনবর্ণ কখনো একা উচ্চারিত হয় না। তাই হস্ ( ্্্) চিহ্ন দিতে হয়। বইতে না থাকার ফলে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই ভাবে তাদের বইতে ভুল আছে। অনেক শিক্ষকেরও বিষয়টি বইতে না থাকায় পড়াতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।

এবারে আসি পঞ্চম শ্রেণির ‘প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা’র বিষয়ে। পঞ্চম শ্রেণির আমার ‘বাংলা বই’-এর সঙ্গে ‘প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী’ পরীক্ষার প্রশ্নের ধরনের কতখানি মিল পাওয়া যায়? উত্তর হচ্ছে—শূন্য (০)%। প্রায় ১০ বছর হয়েছে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে প্রশ্নের ধরনের অদল-বদলও হয়েছে। কিন্তু বইয়ের কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে? উত্তর হচ্ছে—না। কিন্তু কেন জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় বসতে গিয়ে শিক্ষার্থী হিমশিম খাচ্ছে। বইয়ের অনুশীলনীর সঙ্গে তাদের পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নের ধরনের মিলের ছিটেফোঁটাও নেই। এতে করে দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। শিক্ষকদের প্রশ্ন করতে সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই ছুটে যাচ্ছে গাইড বইগুলোর কাছে। কাটতি বাড়ছে গাইড বইয়ের।

শুধু তাই নয়, কোনো এক বছর পঞ্চম শ্রেণিতে তিনবার প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন করা হলো। সেই বছর ইংরেজি প্রশ্নের ধরন সমাপনী পরীক্ষার এক মাস আগেও পরিবর্তিত হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক সবাই বিভ্রান্ত এবং বিরক্ত।

ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণির বাংলা প্রথম পত্র বইয়ের অনুশীলনীগুলোতে অনেক জায়গায়ই উদ্দীপকের ‘গ’ (প্রয়োগ) এবং ‘ঘ’ (উচ্চতর দক্ষতায়) নম্বর প্রশ্ন একই ধরনের। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা নয়। সৃজনশীল প্রশ্নের ধরন আমাদের যে শিক্ষা দেয় তাতে করে চারটি প্রশ্ন চার ধরনের হওয়ার কথা। কিন্তু পাঠ্য বইয়ের অনুশীলনীতে এমন ধরনের নমুনা প্রশ্ন শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের বিভ্রান্ত করে।

এবারে আসি অষ্টম শ্রেণির বিষয়ে। আমার প্রথম আপত্তি—কেন ২০১৮ সালে বাংলা প্রথম এবং দ্বিতীয় পত্র সমন্বিত করে দেওয়া হলো? যেখানে নবম-দশম শ্রেণিতেই একজন শিক্ষার্থীকে ১০০+১০০=২০০ নম্বরের বাংলা পড়তে হয়, সেখানে অষ্টম শ্রেণিতে দুই পত্রকে একত্র করার উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট নয়। অল্প কয়েকটি অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যেও ভুল ছিল। পরিবর্তিত সিলেবাসে ‘বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি’তে ৪.৬ অধ্যায় লিখে অধ্যায়ের নাম দেওয়া হয়েছে ৪.৭ নম্বর অধ্যায়ের।

‘আনন্দপাঠ’ বইটি বাতিল করা হলো। কিন্তু তাতে কি শিক্ষার্থীদের পড়ার চাপ খুব কমেছে? বাংলা ব্যাকরণ অংশে অধ্যায়গুলো সাজানো হয়েছে স্বল্প পরিসরে। কিন্তু আমরা শিক্ষকমণ্ডলী কি স্বল্প পরিসরে তা পড়াতে পারি? পড়া বোঝাতে গেলে তখন ব্যাপকভাবেই বোঝাতে হয়। এতে করে নম্বর এবং ক্লাস সংখ্যা কমে গেলেও শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সিলেবাস ভালোভাবে শেষ করতে গিয়ে কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাকরণ অংশে বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় ভুলও আছে। যেমন—ধাতু, কাল, শব্দ গঠন—এসব অধ্যায়ে ভুল আছে। এখানেই শেষ নয়। ২০১৯ সালে অষ্টম শ্রেণির উভয় পত্রের বই-ই হুবহু ২০১৮ সালের মতো করেই ছাপানো হয়েছে। এখানে গত বছরের পরিবর্তিত সিলেবাসের মতো করে বই সাজানো হয়নি। আর বাদ দিয়ে দেওয়া ‘আনন্দপাঠ’ বইটি এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর ঘরে শোভা পাচ্ছে। এত বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় কেন? যথাযথ কর্তৃপক্ষ কি এ বিষয়ে ওয়াকিফহাল? আমার মনে হয় এখানে একটি সমন্বয়হীনতা কাজ করছে। যদি বইগুলো আগের মতোই ছাপা হয় তার অর্থ কী এই যে সিলেবাস আবারও পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে? এত অস্থিতিশীলতা কেন? যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সর্বস্ব ত্যাগ করে দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, স্বপ্ন দেখছেন সোনার বাংলা গঠনের—সেখানে শিক্ষার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কেন এত অরাজকতা? আমার কাছে মনে হয়েছে বিভিন্ন সেক্টরের সমন্বয়হীনতাই এর একমাত্র কারণ।

কোনো ভালো কাজেরই যেমন একক কৃতিত্বের অংশীদার হয় না, কোনো খারাপ কাজের ক্ষেত্রেও তাই। সরকার তো শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নন। দেশের প্রত্যেক জনগণের, প্রত্যেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। তাহলে এই দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করছে কে বা কারা? মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। স্কুল পর্যায়ের ছোট ছোট সমস্যা শিক্ষার্থীদের মনে তাদের দেশ, দেশের কর্ণধার সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এসব সমস্যার সমাধান দ্রুত প্রয়োজন। আমরা সবাই মিলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে চাই এবং গড়ব ইনশাআল্লাহ।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা