kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

ট্রেন দুর্ঘটনা, দায় কার?

ড. হারুন রশীদ

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ট্রেন দুর্ঘটনা, দায় কার?

নতুন সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে যখন আশার সঞ্চার হচ্ছে তখনই অকাতরে প্রাণ ঝরছে সড়কে। একের পর এক দুর্ঘটনায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। কোনোভাবেই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। এটি খুবই উদ্বেগের বিষয়। রেল দুর্ঘটনাও যেন পিছু ছাড়ছে না। অরক্ষিত লেভেলক্রসিং, অপরিকল্পিত ও অননুমোদিত সংযোগ এবং সচেতনতার অভাবে অকাতরে প্রাণ যাচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১৬ জন। গত মঙ্গলবার ভোর পৌনে ৩টার দিকে কসবা উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১৬ জন নিহত ও শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনায় শোক জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ট্রেনচালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এ ছাড়া রেলসংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তূর্ণা নিশীথার চালকসহ লোকোমোটিভ মাস্টার ও সহকারী মাস্টারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

গত আড়াই বছরে রেল দুর্ঘটনায় (নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-গাজীপুর) মারা গেছেন আট শতাধিক। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন আরো ছয় শতাধিক। শুধু রেলওয়ে পুলিশের হিসাব মতে মৃত্যুর সংখ্যা ৭০০। বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) কমলাপুর থানা সূত্র মতে, ২০১৫ সালে রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৪৮ ও নারী ৪৪ জন। অপমৃত্যু (ইউডি) মামলাসহ মোট মামলার সংখ্যা ২৮৫টি। ২০১৬ সালে রেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৩০৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৪৪ ও নারী ৬১ জন। ইউডি মামলাসহ মোট মামলা ৩০৫টি। গত বছর জানুয়ারি থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত মারা গেছেন ১০৩ জন। এর মধ্যে শুধু জানুয়ারিতে ৩২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৫, মার্চে ২৩ ও এপ্রিলে ২২ জন মারা যান।

অরক্ষিত লেভেলক্রসিং, অপরিকল্পিত সংযোগ সড়ক এবং সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি রেলে দুর্ঘটনার পেছনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অব্যবস্থাপনাও দায়ী। রেলওয়ের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন কারণে রেল দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে লেভেলক্রসিং দুর্ঘটনা, সিগন্যাল লাইনে ত্রুটি এবং উন্নয়নকাজ চলা অবস্থায় ট্রেন লুপ লাইন কিংবা সাইডলাইনে চলে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হয়।

রেল যোগাযোগ অনেকটা সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হওয়ায় লোকজন রেলে যাতায়াত করে থাকে। সরকারও রেলের প্রভূত উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। মেট্রো রেলের যুগেও প্রবেশ করতে যাচ্ছে দেশ। ভবিষ্যতে রেলপথও বাড়বে। কিন্তু সেই তুলনায় নিরাপদ হয়নি রেল যোগাযোগ। রেলপথের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে লেভেলক্রসিং। দেশের দুই হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথে প্রায় দুই হাজার ৫৪১টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এর বেশির ভাগেই কোনো গেট নেই। কোনো সংকেতবাতি দূরের কথা, নেই যান নিয়ন্ত্রণের কোনো কর্মীও। জেলা শহরের বাইরে বহু ব্যস্ততম লেভেলক্রসিং রয়েছে। যার দুই-একটি স্থানে গেটম্যান ও প্রতিবন্ধক রয়েছে। বেশির ভাগ ক্রসিংয়ে নেই গেটম্যান ও প্রতিবন্ধক। মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক, গ্রাম্য সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে রয়েছে এসব লেভেলক্রসিং। ট্রেনের টাইম অনুযায়ী অনেক সময় লেভেলক্রসিং এলাকায় থাকা সাধারণ জনগণ নিজ দায়িত্বে গেটম্যানের কাজ করে। কিন্তু তার পরও ঘটছে ট্রেন দুর্ঘটনা। নিয়ম অনুযায়ী কোনো রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নিয়ে যেতে হলে গেট নির্মাণ, কর্মী নিয়োগসহ আনুষঙ্গিক সব স্থাপনা নির্মাণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থার। এসব দেখার যেন কেউ নেই।

সর্বশেষ মঙ্গলবারের দুর্ঘটনায় ১৬ জন মারা গেছেন। নিহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখে কারো কোনো অবহেলা থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। রেল যোগাযোগ নিরাপদ করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালাতে হবে।

দুই.

নতুন পরিবহন আইন হয়েছে। এটি নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কমছে না। একটি ঘটনার রেশ না কাটতেই আরেকটি ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর থাকছে। এসব ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও অনেক। এর প্রতিকার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক ও ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে ওই পরিবারকে। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি প্রাণ হারায়। তখন ওই পরিবারের যে কী অবস্থা হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যারা পঙ্গুত্ববরণ করে তাদের পরিবারের অবস্থা আরো করুণ, আরো শোচনীয়।

এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে গড়ে বাংলাদেশের জিডিপির দেড় শতাংশ  নষ্ট হয়, যার পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। বিগত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫৫ হাজার মানুষ। আর দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার। এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা এখন অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংগত কারণেই এই সমস্যা থেকে মানুষজনকে মুক্ত রাখার সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।

দুর্ঘটনার কারণগুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাই কমবেশি জানে। এর মধ্যে রয়েছে দেশে সড়ক অবকাঠামো এবং স্থলভাগের আয়তন অনুপাতে জনসংখ্যার চাপ বেশি। সড়কের তুলনায় মোটরযানের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। একই সড়কে চলছে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, রিকশাসহ নানা রকম মিশ্র যানবাহন। উপরন্তু সড়ক ও মহাসড়কগুলো ত্রুটিপূর্ণ। দেশব্যাপী মহাসড়কের অনেক স্থানেই রয়েছে বিপজ্জনক বাঁক। এসব বাঁকের কারণে প্রায়ই সেসব জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

এ ছাড়া অবকাঠামোগত কারণেও দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি খুব বেশি বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সম্প্রতি দুর্ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করার জন্য যেসব কারণকে দায়ী করা হচ্ছে তার অন্যতম হচ্ছে চালকের অসতর্কতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো। এই সমস্যা বারবার চিহ্নিত হলেও এর কোনো প্রতিকার নেই।

প্রতিবার দুর্ঘটনার পরপরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত প্রতিবেদন কোনো দিন আলোর মুখ দেখে না। আর সংগত কারণেই দোষীদের শাস্তিও হয় না। সমাজের সব শ্রেণির মানুষ—যারাই দুর্ঘটনার শিকার হোক না কেন, কোনো একটি ঘটনার বিচার হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত মেলা ভার। আর বিচারহীন, প্রতিকারহীন অবস্থায় কোনো কিছু চলতে থাকলে সেটির পুনরাবৃত্তিও তো ঘটবেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কত প্রাণ গেলে, মৃত্যুর মিছিল কত দীর্ঘ হলে তবে থামবে এই হত্যাযজ্ঞ?

সড়ক দুর্ঘটনা হয় না এমন দেশ নেই। কিন্তু দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি যত কমিয়ে আনা যায়, সেটিই লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভালো যান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক, সড়কব্যবস্থা উন্নতকরণ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিক ও যুগোপযোগী করার বিষয়গুলো তো রয়েছেই। এর সঙ্গে দুর্ঘটনায় পতিতদের ত্বরিত চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় আইনি জটিলতার কারণে আহতদের চিকিৎসা দিতে সমস্যা হয়। এ সমস্যাটি সমাধানেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিন.

দেশে রেল ও সড়কপথে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ছে। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও বাড়ছে। মেট্রো রেল হচ্ছে। রেলের আধুনিকায়ন এখন দৃশ্যমান। অন্যদিকে উড়াল সড়ক, মহাসড়কগুলো কোথাও চার লেন, কোথাও আট লেন করার কাজ এগিয়ে চলছে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা। যেকোনো ব্যবস্থার উন্নয়ন হয় সেখান থেকে যাতে সুফল পাওয়া যায় সে জন্য। রেল ও সড়কপথ নিরাপদ হওয়াটাই এখন দেশের মানুষের চাওয়া। লাশের সারি আর দেখতে চায় না দেশের মানুষজন। রেল ও সড়ক নিরাপত্তায় নতুন করে ভাবতে হবে। দায় নিতে হবে কাউকে না কাউকে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা