kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

কারা আওয়ামী লীগের অনুপ্রবেশকারী

ইসহাক খান

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কারা আওয়ামী লীগের অনুপ্রবেশকারী

অনুপ্রবেশ একটি নেতিবাচক শব্দ। অভিধানে বলা হয়েছে, ‘ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে পরের এলাকায় বা দলে গোপনে বা অবৈধ প্রবেশ।’

এখন আমরা দেখব ২০০৮ সালের পর যে বিএনপি ও জামায়াতকর্মীরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে আওয়ামী লীগের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা কি অনুপ্রবেশকারী, নাকি তাঁরা বরণীয়। বরণীয় বলতে আমি বলতে চাচ্ছি, যাঁদের মঞ্চে ফুল দিয়ে হাজার হাজার নেতাকর্মী এবং জনতার সামনে দলে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল।

আমাদের হাতে অজস্র প্রমাণ আছে, এই বরণীয়রা কোনোভাবেই অনুপ্রবেশকারী নন। তাঁদের বরণ করে নেওয়া হয়েছিল ফুলের তোড়া দিয়ে। শুধু বরণ করেই ক্ষান্ত হননি, তাঁদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং পদবি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

এবার তাহলে সেই বরণের পেছনের কাহিনিতে ফেরা যাক। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ খাই খাই ভাব আছে। খাওয়া পেলে তাঁরা হালাল-হারাম বাছেন না। আপন পর বিচার করেন না। স্বার্থপরের মতো একা একা খেতে চান। পাশে যে একজন কর্মী অভুক্ত আছেন, সে কথা তাঁরা মনে করেন না। ভেবেও দেখেন না। পাঠক নিশ্চয় সাম্প্রতিককালের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আমার কথার প্রমাণ দেখতে পেয়েছেন। লেখক আহমদ ছফা একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে জেতে, তখন তারা ভাবে তারা একাই জিতেছে। কিন্তু যখন হারে, তখন গোটা বাংলাদেশ হারে।’ এই যে একাই জেতার মনোভাব তাদের একা ওপরে ওঠার স্পৃহা তৈরি করে। ফলে একা একাই তারা খেয়ে ঢোল হয়। তারা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে এই কথিত অনুপ্রবেশকারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছে। জি কে শামীম রিমান্ডে বলেছেন, ১৭ লাখ টাকা দিয়ে তিনি যুবদল ছেড়ে যুবলীগে যোগ দিয়েছিলেন। বাকিদের হিসাবও তেমনি। মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে তাঁরা লীগে জায়গা পেয়েছেন এবং পদ পেতেও মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন।

পদ পেয়েই তাঁরা তাঁদের আসল চরিত্রে ফিরে গেছেন। তাঁরা দুই হাতে কামাচ্ছেন। চাঁদাবাজি করছেন। দোষ হচ্ছে আওয়ামী লীগের। মানুষ তো জানতে পারছে না এসব লোক অতীতে জামায়াত-বিএনপি ছিলেন। তারা জানছে, এই নেতারা আওয়ামী লীগকর্মী।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের বড় বিজয়ের পর আমরা দেখলাম দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাঁর নিজ এলাকা কুষ্টিয়ায় একজন জামায়াত নেতাকে মঞ্চে ফুলের তোড়া দিয়ে দলে বরণ করে নিলেন। সেই শুরু। বলা যায়, এটাই প্রথম ঘটনা বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের দলে আশ্রয়ের কাহিনি। তিনি কত টাকার বিনিময়ে রাজাকারদের দলে জায়গা দিয়েছিলেন, তাঁকে দলের হাইকমান্ড ডেকে জেরা করলে আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে।

তারপর জোয়ারের পানির মতো দলে ছেয়ে যেতে থাকে বিএনপি-জামায়াত বরণ। সে হিসাব করলে তালিকা হবে সুবিশাল—দীর্ঘ।

সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশের বিষয় এখন দেশময় আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি এ নিয়ে ভীষণ বিরক্ত। এরই মধ্যে তিনি অনুপ্রবেশকারীদের একটি তালিকা সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠিয়েছেন।

এই অনুপ্রবেশের ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেনি। শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে। ঢালাওভাবে হয়েছে ২০১৪ সালের পর এবং সব অনুপ্রবেশই ঘটেছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের হাত ধরে। জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির, বিএনপি, রাজাকার পরিবারের সন্তান, হত্যা মামলার আসামি, নাশকতার মামলার আসামিসহ নানা অপরাধে এলাকার বিতর্কিত লোকদের দলে নিয়েছেন তাঁরা। নির্বিচারে অনুপ্রবেশের কারণে দল থেকে ছিটকে পড়েছেন আওয়ামী লীগের ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাকর্মী। অনুপ্রবেশকারীরা দলের পদ-পদবিও পেয়েছেন। হয়ে উঠেছেন বড় নেতাদের ঘনিষ্ঠ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ছবিতে সাধারণ সম্পাদকের পাশে বিতর্কিত জি কে শামীমকে দেখা গেছে। এই বিতর্কিতরা অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্য বেসাতিও নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। এমন কয়েকজন ত্যাগী নেতাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। অতীতে যখন আওয়ামী লীগের নাম উচ্চারণ করার লোক ছিল না তখন তাঁরাই সাহস করে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন। অথচ আজ তাঁরা নিষ্ক্রিয়। দলে তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। সেই নিষ্ক্রিয়দের একজন দুঃখ ভরা কণ্ঠে বললেন, যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকবে না, তখন সব ঝড় আমাদের ওপর দিয়েই যাবে। তখন এই হাইব্রিডদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। অতীতেও তা-ই দেখা গেছে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে যে আওয়ামী লীগ কর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর লুটপাট করেছে, আজ তাঁরাই অবহেলার শিকার। দল ক্ষমতায় না থাকলে আবার তাঁদেরই ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে।

দলে এ ধরনের ঢালাও অনুপ্রবেশ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কয়েকবারই নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন। ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, জামায়াত-শিবির-বিএনপি থেকে আসা তাদের স্থান আওয়ামী লীগে নয়। তার পরও যোগদানের ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৮৩টি যোগদান অনুষ্ঠান হয়েছে। এর মধ্যে ৬২টি যোগদান অনুষ্ঠান ছিল জামায়াত-বিএনপি মিলিত, আর ২১টি যোগদান অনুষ্ঠান হয়েছে শুধু বিএনপি থেকে আসা নেতাকর্মীদের। দেখা যায়, ৮৩টি যোগদান অনুষ্ঠানের মধ্যে ৬০টি হয়েছে ২০১৪ সালে, বিএনপি আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর।

উল্লেখযোগ্য যেসব নেতার হাত ধরে এসব যোগদান হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর তিন সদস্য, এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাবেক এক মন্ত্রী, বর্তমান এক প্রতিমন্ত্রী, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য, রাজশাহীর পুঠিয়ার সংসদ সদস্য, রাজশাহীর একজন সংসদ সদস্য, জয়পুরহাটের সংসদ সদস্য, পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য, ঝালকাঠির সংসদ সদস্য এবং নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য।

এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে যোগদানের ঘটনাটি বেশ মজার। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক সংসদ সদস্যের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন ‘চার আওয়ামী লীগ নেতা’ হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আবুল কাশেম কাসু। দলীয় পদে বসানোর আগেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে আটক করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।

সংসদ সদস্যদের ঢালাও জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে জায়গা দেওয়ায় দলে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সংসদ সদস্যের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বাড়ছে দলীয় কোন্দল। তৃণমূল নেতাদের কেউ কেউ অভিযোগ করে বলেন, এমপি এলাকায় আওয়ামী লীগকে বিএনপি-জামায়াতে পরিণত করেছেন।

জানা গেছে, তালিকাভুক্ত অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে দল। কিন্তু যাঁরা এই বিতর্কিতদের দলে জায়গা দিলেন, তাঁদের কী হবে? তাঁরাই তো মূল অপরাধী। তাঁরা সুযোগ না দিলে এই রাজাকাররা আওয়ামী লীগে ঠাঁই নিয়ে দলকে বিতর্কিত করতে পারত না। আর ত্যাগী নেতারাও ছিটকে যেতেন না দল থেকে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি, আপনার কাছে নিবেদন, দলের দুঃসময়ের কর্মীদের আপনার পাশে রাখুন। যাঁরা খেয়ে-না খেয়ে, শত নির্যাতন উপেক্ষা করে দলের পতাকা ঊর্ধ্বে ধরে রেখেছেন। প্রয়োজনে তাঁরা জাতীয় চার নেতার মতো জীবন দেবেন, কিন্তু বেইমানি করবেন না।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা