kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

স্মরণ

শহীদ নূর হোসেন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন

মুশতাক হোসেন

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শহীদ নূর হোসেন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন

এবার নূর হোসেনের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। নূর হোসেন ছিলেন সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এরশাদের অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে ৯ বছরের লাগাতার সংগ্রামে সর্বস্তরের ও সব শ্রেণির মানুষ অংশ নেয়। নূর হোসেনের মতো শ্রমজীবী, মেহনতি, বিত্তহীন মানুষের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি। তাঁরা নিজ উদ্যোগে, মহল্লা ভিত্তিতে সংগঠিত হয়ে কিংবা কর্মস্থলে শ্রমিক সংগঠনভিত্তিক জমায়েত হয়ে দল বেঁধে আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতেন।

নূর হোসেন হোসেন গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকা মিনিবাস সমিতি চালিত বাসের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন বেশ কিছুদিন। তাঁর বাবা মজিবর রহমান কাঞ্চন মিয়া ছিলেন বেবি ট্যাক্সি (এখন যা সিএনজিতে চলে) চালক, মা গৃহিণী মরিয়ম বেগম। নূর হোসেনের জন্ম ১৯৬১ সালে ঢাকার নারিন্দায়। তাঁরা ছিলেন ছয় ভাই-বোন, নূর হোসেন ছিলেন তৃতীয়। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের ঝাটিবুনিয়া গ্রামে। স্বাধীনতার পরে গ্রাম থেকে ঢাকার বনগ্রাম রোডে নূর হোসেনের মা-বাবা বসবাস শুরু করেন। নূর হোসেন প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন বনগ্রামের রাধাসুন্দরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ঢাকার গ্র্যাজুয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে সেখানে আর পড়তে পারেননি, জীবন-জীবিকার জন্য মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেন, কিছুদিন কাজ করেন মোটর মেকানিক হিসেবে। তবে কাজের ফাঁকে নিজ উদ্যোগে নূর হোসেন সদরঘাটের কলেজিয়েট নৈশ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। বনগ্রাম রোডের ছোট একটি কক্ষে সব ভাই-বোনের জায়গা না হওয়ায় নূর হোসেন রাত কাটাতেন মতিঝিলের ডিআইটি ভবনের মসজিদের পাশের একটি ছোট্ট ঘরে।

নূর হোসেন নিয়মিত স্বৈরাচারবিরোধী কর্মসূচিগুলোতে অংশ নিতেন। ১০ নভেম্বর ১৯৮৭ ছিল তিন জোটের (আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আটদলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে সাতদলীয় জোট, জাসদের নেতৃত্বে পাঁচদলীয় জোট) ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি। ভোট ডাকাতির সংসদ বাতিল করে দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সর্বাগ্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে অবরোধ ডাকা হয়েছিল। এরশাদ সরকার অবরোধ কর্মসূচির আগের দিন থেকেই ঢাকার সঙ্গে সব যানবাহনের যোগাযোগ বন্ধ করে কার্যত ঢাকাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। প্রতিবাদী নূর হোসেন পরিকল্পনা করেন কিভাবে অভিনব উপায়ে অবরোধে অংশ নেওয়া যায়!

নূর হোসেন বুকে-পিঠে আন্দোলনের স্লোগান লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। নূর হোসেনের পূর্বপরিচিত ইকরাম হোসেনের ব্যানার ও সাইন বোর্ড আঁকার দোকান ছিল মতিঝিল বিসিআইসি ভবনের পাশে। অবরোধের আগের দিন নূর হোসেন ইকরামের কাছে আসেন তাঁর বুকে-পিঠে স্লোগান লিখে দেওয়ার অদ্ভুত অনুরোধ নিয়ে। এর দুই দিন আগে ইকরামের কাছে এসে নূর হোসেন তাঁকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু কাজের ধরনটা তখন বলেননি। সাদা রং নিয়ে যখন ইকরামকে তাঁর সঙ্গে যেতে বললেন নূর হোসেন, তখন ইকরাম ভেবেছিলেন হয়তো কোথাও কোনো রঙের কাজ করতে হবে। কিন্তু যখন নূর হোসেন তাঁর নিজের জামা খুলে বুকে-পিঠে আন্দোলনের স্লোগান লিখে দিতে বললেন তখন প্রথম ইকরাম অবাক হলেন, পরে পেলেন পুলিশের ভয়। কারণ স্লোগানটি ছিল—‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’। ইকরাম কিছুতেই নূর হোসেনের গায়ে স্লোগানটি লিখে দিতে চাইছিলেন না। কারণ এরই মধ্যে এরশাদ সরকার অবরোধকে বেআইনি ঘোষণা করে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল করা, তা-ও আবার বুকে-পিঠে স্লোগান লেখা! নির্ঘাত পুলিশ স্লোগানকে টার্গেট করে গুলি করবে! নূর হোসেনের জোরাজুরিতে ইকরাম বুকে-পিঠে স্লোগান লিখতে বাধ্য হলেন। নূর হোসেন মিছিলে গেলেন। ইকরাম যে আশঙ্কা করেছিলেন তা-ই ঘটল। শুধু ইকরাম কেন? বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যাঁরাই নূর হোসেনকে খালি গায়ে দেখেছেন, তাঁরাই তাঁকে দ্রুত জামা পরে বুকে-পিঠে লেখা স্লোগান ঢেকে রাখতে বলেছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার গাড়ির কাছে যখন নূর হোসেন আশীর্বাদ নিতে আসেন, তখন তিনিও তাঁকে জামা পরে নিতে বলেছিলেন। স্বৈরাচারের পুলিশ প্রতিবাদী যুবকের গায়ে লেখা শিল্পিত স্লোগানের জবাব দিল লেখা টার্গেট করে গুলির মাধ্যমে। গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে যখন তাঁর বন্ধুরা ধরাধরি করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাচ্ছিলেন, পুলিশ সেই রিকশা থামিয়ে নূর হোসেনকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা পুলিশ করেছে কি না জানা যায়নি। সম্ভবত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বা হৃৎপিণ্ড বিদীর্ণ করা বুলেটে নূর হোসেনের মৃত্যু ঘটে। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়—‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’।

শোকে বিহ্বল নূর হোসেনের মা-বাবা পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে গিয়ে ছেলের খোঁজ করেন। পুলিশ কোনো কিছুই জানায়নি। আজিমপুর কবরস্থানসহ বিভিন্ন কবরস্থান ঘুরে মা-বাবা জুরাইন কবরস্থানে আসেন। এখানে কবরস্থানের শ্রমিকরা বলেন যে একটি লাশের গায়ে পেইন্টের রঙে বাংলায় লেখা ছিল। লাশ গোসলের সময় তাঁরা কেরোসিন তেল দিয়ে ঘসে ঘসে তা ওঠানোর চেষ্টা করেও পারেননি। এভাবেই নূর হোসেনের কবরটি চিহ্নিত হয়।

পুলিশ ওই দিন অনেক লাশ সরিয়ে ফেলে। এক স্কুলছাত্রের লাশ আমরা কয়েকজন পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসি। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন ছাত্রলীগ (বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র) নেতা এনামুল, মঞ্জুর প্রমুখ কিশোর ছেলের লাশটি প্রথমে ইউকসু ভবনে রাখেন। কোনো ব্যক্তি খোঁজখবর নিতে আসেন কি না তার অপেক্ষা করি আমরা। ছেলেটির পিঠে স্কুলের ব্যাগ ছিল। কয়েকটি ছবি তুলেও রাখা হয়। এরই মধ্যে কারফিউ শুরু হয়ে যায়। তখন আমরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামের পেছনে অজানা কিশোরটিকে দাফন করি। খোঁজ পেয়ে কয়েক দিন পরে পুলিশ পোস্টমর্টেমের কথা বলে লাশটি নিয়ে যায়। কোন পরিবারের ছেলে ছিল সেটি আর জানা যায়নি। ওই স্থানে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছিল। সম্ভবত সেটি এখনো আছে। ওই সময় সরকারি বাহিনীর গুলিতে প্রতিবাদীরা নিহত হন সারা দেশেই। যুবলীগ নেতা নুরুল হুদা বাবুল, সিপিবির ক্ষেতমজুর নেতা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের আমিনুল হুদা টিটো ওই সময় শহীদ হন।

নূর হোসেনসহ অজানাসংখ্যক মানুষকে হত্যার প্রতিবাদে ও এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে ১১-১২ নভেম্বর পালিত হয় দেশব্যাপী হরতাল। এর পরও লাগাতার হরতাল-অবরোধ চলতে থাকে। আন্দোলনে এবারেই ছাত্রদের ছাপিয়ে শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো সংগঠিতভাবে অংশগ্রহণ করে। ১৯৮৭ সালে শ্রমিক-পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ এত সংগঠিত ছিল যে পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালেও এত সংগঠিত অংশগ্রহণ ছিল না। তবে ১৯৯০ সালে নতুন মাত্রা যোগ করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের সংগঠিত আন্দোলন, যা ডা. শামসুল আলম খান মিলনের হত্যাকাণ্ডে চূড়ান্ত গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। আন্দোলনে আরেকটি মাত্রা যোগ হয় শেষ পর্যায়ে ৩ ডিসেম্বর ১৯৯০ সচিবালয় থেকে কর্মকর্তাদের রাজপথে বেরিয়ে চিকিৎসক-ছাত্র-জনতার মিছিলে যোগদান। এ ঘটনা এরশাদের অবৈধ শাসনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। পরদিন ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

এরশাদ পতনের পরে শহীদ নূর হোসেনের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মরণে দুই টাকা মূল্যের ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। যে স্থানে নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন সেটা ছিল ঢাকা মহানগরের শূন্য বিন্দু (জিরো পয়েন্ট)। শহীদের নামে তার নামকরণ হয় নূর হোসেন চত্বর। প্রতিবছর ১০ নভেম্বর সেখানে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সংগঠন ও ব্যক্তিরা পুষ্পাঞ্জলির মাধ্যমে নূর হোসেনকে স্মরণ করে এবং নতুন করে শপথ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নূর হোসেনের একটি ভাস্কর্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নূর হেসেনের ম্যুরাল রয়েছে।

লেখক : স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ জাসদ সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ডাকসু

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা