kalerkantho

শনিবার । ২৩ নভেম্বর ২০১৯। ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাবরি মসজিদ মামলার রায়

মো. জাকির হোসেন

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাবরি মসজিদ মামলার রায়

অযোধ্যার ২.৭৭ একর জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটাতে রায় ঘোষণা করেছেন ভারতের শীর্ষ আদালত। বাবরি মসজিদ আর রাম জন্মভূমি নিয়ে বিতর্ক কয়েক শতাব্দী ধরে। হিন্দুদের একটি অংশের দাবি, অযোধ্যা ভগবান রামচন্দ্রের জন্মভূমি। মসজিদের জায়গাটিতে আগে রামের মন্দির ছিল। পরে মন্দিরের ভগ্নাবশেষের ওপর মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ তৈরি করেন। বাবরের নাম অনুসারে মসজিদের নামকরণ হয় বাবরি মসজিদ। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনামলে ফৈজাবাদ জেলা আদালতে বাবরি মসজিদের বাইরে চাঁদোয়া টাঙিয়ে রামলালার (শিশু রাম) মূর্তি স্থাপনের আবেদন জানান মহন্ত রঘুবীর দাস। আদালতে আবেদন নাকচ হয়ে যায়। ভারত স্বাধীনের বছর দেড়েক পর ১৯৪৯ সালে মসজিদের মূল গম্বুজের নিচে রামলালার মূর্তি স্থাপন করা হয়। মন্দিরপন্থীরা দাবি করেন, ‘রামলালা প্রকট (আবির্ভূত) হয়েছেন। ১৯৪৯ সালে মসজিদের ভেতর রামের মূর্তি রাখার প্রতিবাদ জানায় মুসলিমরা। সরকার জমিটি বিতর্কিত ঘোষণা করে তালাবদ্ধ করে দেয়। ১৯৫০ সালে রামলালার পূজার অধিকারের আবেদন জানিয়ে ফৈজাবাদ জেলা আদালতে আবেদন করেন গোপাল শিমলা বিশারদ ও পরমহংস রামচন্দ্র দাস। ১৯৫৯ সালে বাবরি মসজিদের ওই স্থানের অধিকার চেয়ে মামলা করে নির্মোহী আখড়া। ১৯৮১ সালে নির্মোহী আখড়ার দাবির বিরোধিতা করে জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করে উত্তর প্রদেশ সেন্ট্রাল সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ড। ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফৈজাবাদের আদালত মসজিদ চত্বরে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের উপাসনার প্রবেশাধিকার দিতে তালা খুলে দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন। ১৯৮৯ সালের ১৪ আগস্ট এলাহাবাদ হাইকোর্ট বিতর্কিত স্থানে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।

১৯৯০ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি গুজরাটের সোমনাথ থেকে রথযাত্রা শুরু করেন অযোধ্যার বাবরি মসজিদের উদ্দেশে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর করসেবকরা বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়। এ অবস্থায় ১৯৯৩ সালে সংসদে আইন পাস করে অযোধ্যার বিতর্কিত জমির দখল নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেন, বিতর্কিত জমি সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালা বিরাজমান—এর মধ্যে সমবণ্টন করে দেওয়া হোক। এই রায়ে তিন বিচারপতি সহমত পোষণ করেননি। ২-১ ভিত্তিতে রায় দান হয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টে ২০১০ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উভয় পক্ষ আপিল করে। ২০১১ সালের ৯ মে অযোধ্যা জমি বিতর্কে হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্ট। এদিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালে বিতর্কিত স্থানে রাম মন্দির তৈরির অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। ২০১৭ সালে প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর যুযুধান পক্ষগুলোকে আদালতের বাইরে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে সব দেওয়ানি মামলার আবেদনের শুনানি শুরু হয়। ১৪ মার্চ সুব্রহ্মণ্যম স্বামীসহ সব অন্তর্বর্তী আবেদন (যারা এই মামলার পক্ষ হতে চেয়েছিল) নাকচ করেন সুপ্রিম কোর্ট।

৮ জানুয়ারি ২০১৯ সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ ঘোষণা করেন। বিচারপতি রঞ্জন গগৈসহ অন্য বিচারপতিরা হলেন—এস এ বোবদে, এন ভি রামানা, ইউ ইউ ললিত এবং ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়। ১০ জানুয়ারি বিচারপতি ইউ ইউ ললিত নিজেকে মামলা থেকে সরিয়ে নেন। ২৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের নতুন সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করেন। নতুন বেঞ্চের সদস্যরা হলেন—বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এস এ বোবদে, ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ এবং এস এ নাজির। সুপ্রিম কোর্ট আদালতের বাইরে সব পক্ষকে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু তা ব্যর্থ হওয়ায় মামলাটি বিশেষ বেঞ্চ শুনানি শুরু করেন। ২৬ বছর আইনি যুদ্ধ চলে। শুধু সুপ্রিম কোর্টেই মামলা চলছে প্রায় আট বছর ধরে। টানা ৪০ দিন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের পর পরে রায় লেখার জন্য মাসখানেক সময় নেন বেঞ্চ। অবশেষে গতকাল রায় ঘোষণা হলো। অযোধ্যায় বিতর্কিত জায়গায় মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেওয়া হয়েছে। ২.৭৭ একর বিরোধপূর্ণ জমিতে মন্দিরের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে ট্রাস্ট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। ওই জমিতেই বাবরি মসজিদ ছিল। আর মসজিদ নির্মাণে সরকারকে অন্যত্র পাঁচ একর জমি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের রায়ে বলা হয়, মসজিদের নিচে স্থাপনা থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এটি মন্দির কি না, তা নিশ্চিত নয়। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, মসজিদটি ফাঁকা জায়গায় নির্মাণ হয়নি। এর নিচে অন্য কাঠামো ছিল। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার খননের ফলে যেসব জিনিস পাওয়া গেছে, এতে বোঝা গেছে সেগুলো ইসলামী নয়। আদালত আরো বলেছেন, বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্য দিয়ে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে।

রায়টি পরস্পরবিরোধী ও বিতর্কের ক্ষেত্রে ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। রায়ে বলা হলো স্থাপনার ওপর মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কিন্তু স্থাপনার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না এটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ কি না। তাহলে যে যুক্তিতে এখানে মসজিদ পুনর্নির্মাণ যৌক্তিক নয়, একই যুক্তিতে মন্দির নির্মাণও যুক্তিসংগত নয়। এটি উভয় ধর্মের তীর্থস্থান ঘোষণা করে এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উভয় ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ট্রাস্ট গঠন করা অধিকতর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারত। এই রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডের আইনজীবী জাফর আইব জিলানি বলেন, ‘আমরা রায়কে সম্মান জানাই। কিন্তু এতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তাভাবনা করব।’ তবে এ নিয়ে তাঁরা কোনো রকম বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ করবেন না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশেও এ রায় নিয়ে যেন প্রতিক্রিয়া না হয়, আমরাও তেমনটি প্রত্যাশা করব। এখনো রিভিও দায়ের করার আইনি লড়াই বাকি রয়েছে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ দেশে স্মরণাতীতকাল থেকে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক নর ও এক নারী থেকে। সুতরাং সব মানুষ শত বৈচিত্র্য সত্ত্বেও একই বংশের, একই মা-বাবার সন্তান। আর আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তাকওয়া। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে; পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব খবর রাখেন’ (সুরা হুজুরাত : আয়াত ১৩)। অথচ আল্লাহর ঘোষণা ভুলে মানুষ কত বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে এবং জাতপাতের কত ব্যবধান রচনা করেছে! প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই বিভেদ-বিভ্রান্তিকেই সত্য মনে করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। অবশেষে ওই সত্যের দিকেই মানুষকে প্রত্যাবর্তন করতে হচ্ছে, যা মহাজ্ঞানী আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন। এখানেই মুমিনের জিত, ঈমানের মাহাত্ম্য। কোনো জাতি বা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সামাজিক সংহতি অপরিহার্য।

মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরতের পর সেখানে সামাজিক সংহতি স্থাপন ও তা সংরক্ষণে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি মদিনার বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে নিয়ে এক সাধারণ জাতি গঠন করেন। সেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণ মাত্রায় ভোগ করেছিল। রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করে, তবে রোজ কিয়ামতে খোদ নবী (সা.) তার বিপক্ষে লড়বেন বলে হাদিসে এসেছে। একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘সাবধান! যদি কোনো মুসলিম কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে তার অধিকার খর্ব করে, তার ক্ষমতার বাইরে কষ্ট দেয় এবং তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক নিয়ে যায়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপন করব’ (আবু দাউদ)। আসুন, মহানবীর মহানুভবতা এবং ইসলামের উদারতাকে অনুসরণ করে জীবনের প্রতিটি স্তরে সৃষ্টিকর্তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা