kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাড়ি আর ভাড়াটের গল্প

মোস্তফা মামুন

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাড়ি আর ভাড়াটের গল্প

ব্যাচেলর অবস্থায় ঢাকা শহরে কাটিয়েছেন এবং বাড়িভাড়া নিয়ে কোনো বিড়ম্বনার শিকার হননি এমন মানুষ আর অমাবস্যার চাঁদ দুটিই প্রায় সমান দুর্লভ। প্রায় প্রত্যেকেরই কোনো কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। সেসব তিক্ততা থেকে তৈরি হয়েছে নানা গল্প।

নব্বইয়ের দশকের একটি হিট গল্প ছিল এ রকম। বাড়িওয়ালা জানতে চাইছেন, ‘ব্যাচেলর না ফ্যামিলি?’

হবু ভাড়াটে, ‘জি ব্যাচেলর।’

‘হবে না। বিবাহিত লোক ছাড়া আমি ভাড়া দিই না।’

ভাড়াটে এই কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত। বললেন, ‘ব্যাচেলরদের যখন এত অপছন্দ তখন আপনার মেয়েকে কোনো ব্যাচেলরের কাছে বিয়ে না দিয়ে বিবাহিতের কাছে দিয়েন।’

এ রকম তিক্ত না হলেও নিজেরও কিছু অভিজ্ঞতা আছে। হল ছাড়ার পর বাসা খুঁজতে গিয়েছি, ব্যাচেলর বললে খারিজ হয়ে যাব জেনে আমাদের দুই বন্ধুর কিছু প্রস্তুতিও নেওয়া আছে।

দুজন তরুণ বয়সী ভাড়াপ্রার্থীর কাছে অবধারিত প্রথম প্রশ্ন, ‘ব্যাচেলর?’

বন্ধুটি বলল, ‘ঠিক ব্যাচেলরও না, আবার ফ্যামিলিও না।’

বাড়িওয়ালা বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। ফ্যামিলিও নেই, আবার ব্যাচেলরও না, এমন পদের মানুষ আগে না দেখারই কথা।

‘ব্যাচেলর বলতে আপনারা যা বোঝেন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আড্ডা দেওয়া, ঘর নোংরা করা—সে রকম সমস্যা আমরা করব না। কাজেই সেই অর্থে আমরা ব্যাচেলর নই। আবার আমরা বিয়ে করিনি, সেই অর্থে আমাদের ফ্যামিলিও নেই।’

এই আলোচনা শুনে রাগী ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলো এক তরুণ। বাসা নিতে এসে কথা বাড়ানো লোকদের একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার মনে হচ্ছে তার। আমাদের দেখেই রাগ বদলে পানি হয়ে গেল। বন্ধুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, ‘দোস্ত...।’ জানা গেল, এরা একজন আরেকজনের কলেজজীবনের বন্ধু। ওর বোনের বাসা। ব্যাচেলরকে ভাড়া না দেওয়া যেতে পারে কিন্তু ‘দোস্ত’কে দেওয়া যায়। বাসা পেয়ে গেলাম। আর গল্প শুনে বাকি বন্ধুরা বিষণ্ন হয়ে গেল। ওদের জীবনেও যদি এ রকম ‘দোস্তের’ আবির্ভাব ঘটত। এখন ব্যাচেলরদের ভাগ্য কতটা বদলেছে জানি না, তবে তখন সত্যিই বড় দুর্দিন ছিল।

পরিবারের খুব বেশি দুর্দিন তখনো ছিল না। আর এখন দারুণ সুদিন। শহর বড় হচ্ছে। আধুনিক সব বাড়ি দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। অর্থনৈতিক উন্নতির চাকচিক্যময় প্রকাশ। জিনিসটা খেয়াল করলাম বহু বছর পর বাসা বদলাতে গিয়ে। বহু বছর বলতে ২২ বছর। সেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবন ছেড়ে যে এলাকায় উঠেছিলাম সেখানেই এতকাল স্থির। অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এমনটা দেখতে পাই। যে এলাকায় জীবন শুরু করে সেই এলাকার অভ্যস্ততা এমন চেপে বসে, এর অনেক সমস্যাও চোখে পড়ে না। ইদানীং অবশ্য এই ভালোবাসায় আর মত্ত থাকা যাচ্ছে না। শহর বিস্তৃত হচ্ছে, কাজের ক্ষেত্র দূরে চলে যাচ্ছে। আবার উন্নয়নকাজের প্রভাবে বিভিন্ন এলাকায় যে অশেষ জ্যাম তাতে নিজের প্রিয় এলাকাকে কোরবানি দিতে হচ্ছে। আর এই এক জায়গায় ভাড়াটে থাকাকে ভাগ্যবান মনে হয়। যার নিজের বাড়ি তার তো সরে যাওয়ার উপায় নেই।

এবার বাসা বদলানোর সময় একজন আফসোস করে বললেন, ‘যান, আপনাদের তো তবু সুযোগ আছে। আমরা যারা বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে বসে আছি তাদের তো সেই সুযোগ নেই।’

কথাটা গায়ে লাগল। আমরা সাধারণত বাড়ির মালিকদের সুবিধার দিকই দেখে আসি। ওদেরও যে কত হেপা সামলাতে হয় সেদিকটা নজরই এড়িয়ে যায় সাধারণত।

অনেক বছর আগে পরিচিত একজন ভাড়া নিতে গেছেন। বাড়িওয়ালা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফার্নিচার কী আছে?’

নামধাম জানতে চান না, পেশা-পরিচয় নিয়েও কোনো আগ্রহ নেই, সরাসরি ফার্নিচারের প্রশ্ন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘ফার্নিচার অল্পবিস্তর আছে। জায়গা হয়ে যাবে আপনার বাসায়।’

‘অল্প ফার্নিচার হলে হবে না। বেশি ফার্নিচার লাগবে।’

বাড়িভাড়া নিতে গিয়ে এমন অবিশ্বাস্য শর্তের মুখে পড়ে তিনি খেই হারিয়ে বললেন, ‘আপনি তো ভাড়া দেবেন আমাকে। কিন্তু কথা শুনে মনে হচ্ছে ভাড়া দেবেন ফার্নিচারকে।’

বাড়িওয়ালা বললেন, ‘না রে ভাই। আমার আগের ভাড়াটিয়া তিন মাসের ভাড়া বাকি রেখে হঠাৎ করে একদিন নেই। সকালে যাওয়ার সময় দেখলাম কাঁধে একটা বড় ব্যাগ। সালাম দিয়ে বলল, কয়েক দিনের জন্য রাজশাহী যাচ্ছি। কিছু টাকা পাব। এসেই আপনার ভাড়া মেটাব।’

ভাড়া মেটাতে রাজশাহী যাচ্ছে শুনে উনি প্রীত বোধ করেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন পরও যখন খোঁজ নেই তখন চিন্তিত হলেন। জানা গেল, ব্যাগে সব সম্পদ ভরে মানুষটি পালিয়েছে। তাঁর কোনো ফার্নিচার ছিল না। ফ্লোরে একটা ম্যাটে ঘুমাত। সেটারও ব্যাগে জায়গা হয়ে গেছে।

অতএব এখন এই বাড়িওয়ালার চাই ফার্নিচার। দোষের কিছু নেই বোধ হয়।

জাভেদ ভাই গল্পটা শুনে বলল, ‘অথচ দেখো এই নতুন বাড়ি, নিজের বাড়ি করে কত মানুষ যে নিজের আয়ু কমিয়েছে।’

‘তা ঠিক। নিজের বাড়ির স্বপ্ন এ দেশের মানুষের সবচেয়ে আরাধ্য স্বপ্ন। সত্যি করার জন্য মানুষ যেকোনো কিছু করতে পারে।’

‘নব্বইয়ের দশকের দিকে মানুষের স্বপ্ন হয়ে দাঁড়াল শহরে নিজের বাড়ি। এই সময়ই বাংলাদেশ আমলে জীবন শুরু করা মানুষেরা পেনশন পেতে শুরু করল। এবং বেশির ভাগই এই পেনশনের টাকাটা ব্যয় করল এখানে। একে তো পেনশনের টাকা আজকের মতো অঢেল নয়, লোন পাওয়াও অত সুলভ ছিল না। ফলে বেশির ভাগ লোকই বাড়ি শুরু করেন কিন্তু আর শেষ করতে পারেন না। তার ওপর ওদের বয়সও অনেক, শরীরও অত চাপ নিতে পারত না। বাড়ি শেষের আগেই জীবন শেষ—এমন কত যে ট্র্যাজেডি হয়েছে।’

‘বাড়িটা বড় ঝামেলা। এখন অবশ্য অনেক সহজ হয়ে গেছে। ফ্ল্যাট কেনো! কিস্তি সুবিধা মেলে আর পেনশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না।’

‘তা ঠিক। ফ্ল্যাট কালচার আসায় অনেক সুবিধা হয়েছে। আর অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে আট-দশ বছর চাকরি করার পরই মানুষ ফ্ল্যাটের চিন্তা করতে পারে। কিন্তু সেখানেও সমস্যা আছে। ফ্ল্যাট লাভজনক বিনিয়োগ কি না, এই নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে। এ জন্যই এখন ফ্ল্যাটের মার্কেটটা অনেক পড়ে গেছে।’

‘কী রকম?’

‘ঢাকা শহরে ভালো একটা জায়গায় মোটামুটি সাইজের ফ্ল্যাটের দাম কত? কোটিখানেক হবে। সেই টাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনে তুমি যদি ভাড়া দাও, তাহলে পাবে কত? ত্রিশ-চল্লিশ হাজার। অথচ এই কোটি টাকা ব্যাংকে রাখলেও এর চেয়ে দ্বিগুণ টাকা।’

‘এভাবে তুলনা করলে হয়! ফ্ল্যাট তো একটা সম্পদ।’

‘সম্পদ না বোঝা সেটা নিয়ে এখন একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সম্পদ তো সেটাই, যেটার বিক্রয়মূল্য সব সময় উঁচু থাকে। কিন্তু কয়েক বছর পর ফ্ল্যাট বিক্রি করতে গিয়ে মানুষ দেখছে এর আর তেমন মূল্য নেই। কারণ ফ্ল্যাটশিল্পের আধুনিকায়ন হচ্ছে। তা ছাড়া কিস্তিটিস্তির সুবিধায় এসব নতুন ফ্ল্যাট কেনাই বরং সহজ। পুরনো ফ্ল্যাটে কারো বিশেষ আগ্রহ নেই।’

হয়তো ঠিক। বাড়ি-ফ্ল্যাট সবই ঝামেলা। কিন্তু এসব বস্তুগত হিসাব ছাপিয়ে বাড়ির সঙ্গে নাড়িরও তো একটা ব্যাপার আছে। এবং শুধু নিজের নয়, ভাড়া ফ্ল্যাট বা বাড়িতেও তৈরি হয় সম্পর্ক আর জীবনের কত গল্প।

অনেক বছর ভাড়া থেকে ছেড়ে আসার সময় হয়তো মনে পড়ে, এখানেই আমার ছেলেটার জন্ম হয়েছিল। এই দেয়ালে ধরেই তো সে দাঁড়াতে শিখল!

খোলা বারান্দাটা গৃহিণীর এত পছন্দ ছিল যে সাজিয়েছিলেন বাগানের মতো করে।

আবার এই বাড়িতেই হয়তো ঘটেছিল সেই দুঃখের ঘটনা। বাবা পাড়ি জমিয়েছিলেন অনন্তের পথে। এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়া মানে তো বাবাকেও ছেড়ে যাওয়া। নতুন চকচকে বাড়িতে সব থাকবে। বাবা থাকবেন না!

মাসের শুরুতে তাই পিকআপ বা ভ্যানে করে যখন মালামাল স্থানান্তর হতে দেখি তখন এই জড় জিনিসগুলোর সঙ্গে যেন আনন্দ-উচ্ছ্বাস-বেদনা-বিষণ্নতাও বয়ে চলে।

একটু ভারী হয়ে গেল শেষ দিকে এসে। ভার দূর করতে একটা কৌতুক শোনাই।

কয়েক মাস ভাড়া দিতে না পারা ভাড়াটে বাড়িওয়ালাকে বলছেন, ‘শোনেন, এখন ভাড়ার জন্য এত লজ্জা দিচ্ছেন, অথচ একদিন গর্ব করে বলবেন অমুক আমার বাসায় ভাড়া থাকত।’

বাড়িওয়ালা হেসে বললেন, ‘ভাড়া আজ না দিতে পারলে কালই লোকে সেটা বলবে।’

লেখক : সাংবাদিক, কথাশিল্পী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা