kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জাতিসংঘ হোক আরো শক্তিশালী এবং কার্যকর

এ কে এম আতিকুর রহমান

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জাতিসংঘ হোক আরো শক্তিশালী এবং কার্যকর

প্রতিবছরের মতো এবারও সারা বিশ্বে ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো : ‘আমাদের গ্রহ—আমাদের ভবিষ্যৎ’। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ প্রথমবারের মতো এ দিবসটি পালন করে। সেই যে যাত্রা শুরু, এবার নিয়ে ৭২ বার দিবসটি পালিত হলো। জাতিসংঘ দিবসটি পালনের এই দীর্ঘ পথযাত্রায় বিশ্বসমাজের তথা তার সদস্য দেশগুলোর মানুষের কতটুকু কল্যাণ সাধন করতে পেরেছে সে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই আসে। একেক বছর একেকটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয় এবং সেসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার জন্য আলোচনাসভা ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের ফলাফলই বা কী, তাও আমাদের দেখা উচিত বলে মনে হয়। যদি তা থেকে বিশ্ববাসীর মঙ্গল, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার উন্নয়ন ঘটে থাকে, তাহলে দিবসটি পালনে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। আর যদি কোনো প্রাপ্যতা না আসে, তাহলে নিছক এসব দিবস পালনের কোনো অর্থ হয় না।

আমরা জানি, পর পর দুটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ নৃশংসতা বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনে এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। শান্তিপ্রিয় মানুষ ধ্বংস আর মৃত্যুর ভয়াবহতা থেকে বিশ্ব এবং বিশ্ববাসীকে বাঁচানোর জন্য উচ্চকিত হলো, প্রতিবাদে সোচ্চার হলো। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতাই তাদের ধ্বংসের লীলাখেলা থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে সক্রিয় করে তোলে। আর যেন কোনো বিশ্বযুদ্ধের অবতারণা না ঘটে, সে ব্যাপারে বিশ্বনেতারা একমত হন। এ ব্যাপারে নেতৃত্বে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৮ সালে বলেন যে বিশেষ অঙ্গীকারের (চুক্তির) মাধ্যমে বৃহৎ ও ছোট রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য পারস্পরিক নিশ্চয়তা বিধানের উদ্দেশ্যে জাতিগুলোর একটি সাধারণ সমিতি গঠন করা উচিত। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘ভার্সাই চুক্তি’। অনেক দেশ মিলে গঠিত হলো ‘লীগ অব নেশনস’।

ভবিষ্যতে যুদ্ধের প্রকোপ থেকে রেহাই পেতে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য কূটনৈতিক সমাধানকে উৎসাহ করাই ছিল লীগ সৃষ্টির মূল লক্ষ্য। লীগের কর্মকাণ্ডের প্রতি উৎসাহী হয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র এর সদস্য হতে শুরু করল এবং ১৯২৬ সাল নাগাদ সদস্য সংখ্যা দাঁড়াল ৫৬-তে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাপান (মাঞ্চুরিয়া ও চীন), ইতালি (আবিসিনিয়া), জার্মানি (পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া), রাশিয়া (ফিনল্যান্ড) প্রভৃতি দেশের আগ্রাসন এবং দেশ দখলের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত গড়াল। ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে লীগের বিলুপ্তি ঘটে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির মধ্যেই ‘লীগ অব নেশনস’-এর পরিবর্তে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ অর্থাৎ ‘জাতিসংঘ’-এর ধারণাটি এসে গিয়েছিল।

১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের মাধ্যমে সংস্থাটির জন্ম হয়। সংগত কারণেই ২৪ অক্টোবর তারিখটি ‘জাতিসংঘ দিবস’ হিসেবে পালন করার যুক্তি রয়েছে এবং সেটিই করা হচ্ছে। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হলেও ১৯৭১ সাল থেকে জাতিসংঘ দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে ছুটির দিন হিসেবে সব সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক পালনের জন্য সুপারিশ করে। বাংলাদেশে এ দিনটি সরকারিভাবে ছুটি না থাকলেও বিভিন্ন আয়োজনে মুখরিত হয়ে ওঠে দেশের জনপদ, বিশেষ করে রাজধানী শহর ঢাকা।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করা হয়। এ দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সরকার, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অনুষ্ঠানসূচি যেমন—আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, প্রদর্শনী, মেলা, ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। ছাত্র, শিক্ষক, চাকরিজীবী, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী মানুষের অংশগ্রহণে দিবসটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। 

এসব আয়োজনের পেছনে অবশ্য একটি লক্ষ্য থাকে, সেটি হলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে পারস্পরিক সমঝোতা ও কল্যাণের জন্য একাত্মতা প্রকাশ করা। এ আয়োজন বিশ্ববাসীকে একত্র করে একটি সুন্দর, শান্তির আর নিরাপদ বিশ্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায়। এ আয়োজন নিপীড়িত, ক্ষুধার্ত, আশ্রয়হীন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে সবাইকে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করে। এ আয়োজন বিশ্ব থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, হানাহানি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উৎপাটনের জন্য সোচ্চার হতে, ঐক্যবদ্ধ হতে সাহস জোগায়। এ আয়োজন সারা বিশ্বে মনুষ্যত্ব, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও মুক্তচিন্তা প্রকাশের পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। এ আয়োজন বিশ্বের বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর অন্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, অংশীদারত্ববোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে আরেকবার জাগ্রত করতে সাহায্য করে। এ আয়োজন মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও উন্নয়নের সংগ্রামকে সমর্থনদানে বিশ্ববাসীকে উজ্জীবিত করে। আর এসবের অর্থই হচ্ছে মানবকল্যাণে এবং বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে জাতিসংঘকে আরো শক্তিশালী, কার্যকর ও প্রয়োজনীয় করে তোলা।

এ কথাও সত্য যে ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারের ফলে বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ মেলাতে গিয়ে অনেক সময়ই জাতিসংঘকে হোঁচট খেতে হয় বা ন্যায়সংগত কর্মপন্থা গ্রহণের জন্য ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে ব্যর্থ হতে হয়। আসলে নানা কারণেই জাতিসংঘ তার পরিকল্পনা বা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে যে শুধু বৃহৎ বা শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোই মুখ্য ভূমিকায় থাকে তা নয়, অনেক রাষ্ট্রকেই এ ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়। ফলে, জাতিসংঘের পক্ষে যেটি হওয়া উচিত সেটি করা হয়ে ওঠে না। বিশ্বনেতারা এ সীমাবদ্ধতা থেকে কবে বের হয়ে আসতে পারবেন আর বিশ্ববাসী এ বিড়ম্বনাটি থেকে কবে পরিত্রাণ পেয়ে একটি শান্তির-প্রস্রবণধারায় সিক্ত বিশ্বের নাগরিক হিসেবে বসবাস শুরু করতে সক্ষম হবে সেই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

তবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে উপলব্ধি, লীগ অব নেশনস সৃষ্টি ও হতাশা এবং সর্বশেষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাতিসংঘ সংস্থাটির উপস্থিতি নানা সময়ের দোদুল্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সাক্ষী। যুদ্ধের ভয়াবহতায় প্রকম্পিত বিশ্বের মানুষ হয়তো যে স্বপ্ন দেখে জাতিসংঘের আবির্ভাব কামনা করেছিল, সেই স্বপ্ন থেকে তারা এখনো অনেকটাই পেছনে পড়ে আছে। কিন্তু আশাহত হয়ে মনের সাহস আর আস্থা হারিয়ে ফেললে আর কিছুই যে অর্জন করা যাবে না। একদিন এভাবেই তো লীগ অব নেশনসের বিলুপ্তি ঘটেছিল। কিছুতেই আমাদের এ প্রত্যাশা হতে পারে না যে একদিন জাতিসংঘেরও তা-ই হোক। আমাদের এ প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে এবং তা শক্তিশালী ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর করে। আর এ জন্য জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণে সব দেশকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যেকোনো রাষ্ট্রীয় প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ রেখে জাতিসংঘকে তার নিজস্ব ধারায় চলতে দিতে হবে। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই যেন এর ব্যত্যয় ঘটাতে জাতিসংঘকে বাধ্য করতে না পারে সেদিকে সবাইকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হবে। জাতিসংঘ হবে সবার বিশ্বাস ও আস্থার স্থান, নির্ভরতার স্থান।       

এ বছর এ দিবসটি পালনে জোর দেওয়া হয়েছে পৃথিবী নামক আমাদের এই গ্রহটিকে আমরা কিভাবে দেখতে চাই, যার ওপর নির্ভর করবে আমাদের ভবিষ্যৎ। বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান, মানবাধিকার ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধ ও হানাহানি বন্ধ, সন্ত্রাস নির্মূল, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণসহ অন্যান্য মানবিক দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে এবং সে জন্য ভেটো ক্ষমতাপ্রাপ্ত দেশগুলোসহ সব দেশকে একত্র হয়ে সমতার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া কোনো কালেই কোনো অর্জনই সম্ভব হয়নি। আজকের দিনে এ প্রতিজ্ঞাই আমাদের তথা বিশ্বের সব রাষ্ট্র ও জনগণকে নির্দ্বিধায় সততার সঙ্গে করতে হবে। একদিন বিশ্বশান্তির সেই সূর্যটা উঠবেই।

আমরা অবশ্যই আশাবাদী, জাতিসংঘ দিবসটি পালন করতে করতেই হয়তো একদিন আমাদের সামনে সে সুযোগটি এসে যাবে। অনাবিল শান্তির শুভ্রতায় ভরে যাবে আমাদের এই গ্রহ, সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনায়—জাতিসংঘ দিবসে সেই প্রত্যাশাই রইল।

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা