kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ক্রিকেটে টেকসই উন্নতির উদ্যোগের বিকল্প নেই

ইকরামউজ্জমান

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ক্রিকেটে টেকসই উন্নতির উদ্যোগের বিকল্প নেই

বাংলাদেশের ক্রিকেটের সার্বিক অবস্থা ভালো নয়। মাঠের পারফরম্যান্স, পরিচালনা, সব দিক থেকেই। এরই ছাপ পড়েছে সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে। সবশেষ ক্রিকেটারদের আন্দোলন-ধর্মঘটের ঘটনায় তা প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ১১ দফা দাবি পূরণ না হলে ক্রিকেটাররা সব ধরনের ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কেন? ক্রিকেটসংশ্লিষ্টদের জরুরি ভিত্তিতে তা ভেবে দেখা দরকার।

এক ধরনের টালমাটাল অবস্থার মধ্যে আছে ক্রিকেট। অস্বস্তি, অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তা ক্রিকেটে ভর করেছে। সার্বিকভাবে ক্রিকেটারদের নিজের অনুভূতির ওপর বিশ্বাসের পারদ নিম্নগামী। মনোসংযোগের বিষয়টি দুর্বল। গত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল সম্মিলিতভাবে পারফরম করতে ব্যর্থ হয়েছে। এরপর শ্রীলঙ্কা সিরিজে বাজে পারফরম্যান্স। দেশের মাটিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হূদয়ভাঙা পরাজয়। মাঠে মৌলিক কাজগুলো করতে ব্যর্থ হয়েছেন ক্রিকেটাররা। প্রশ্ন উঠেছে, ক্রিকেটারদের সামর্থ্য এবং মাঠে তার প্রয়োগ নিয়ে; দলীয় সংহতি ও ঐক্য নিয়ে। ক্রিকেটারদের মধ্যে জয়ের মানসিকতা, জয়ের ক্ষুধা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে ঘাটতি নিয়ে। বলা হয়েছে সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন ‘কোয়ালিটি’ খেলোয়াড়। সেই কোয়ালিটি খেলোয়াড় কোথায়। দল গঠনের ক্ষেত্রে নির্বাচকদের ‘অপশন’ সীমাবদ্ধ। অতএব বিভিন্নভাবে জোড়াতালি দেওয়া ছাড়া উপায় নেই! ‘ব্যাড প্যাচ’ থেকে উত্তরণের উপায়? হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না। দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছার তীব্রতা তো সবাই মিলে বাড়াতে হবে।

গত কয়েক বছর পাঁচজন ক্রিকেটার জাতীয় দলকে উল্লেখ করার মতো সার্ভিস দিয়েছেন। তাঁদের প্রয়াসে দল জয়ের স্বাদ পেয়েছে। এই ক্রিকেটাররা দলের জন্য সব সময় প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়েছেন। জীবনের নিয়মে একটি সময় সবাইকে ভাটার টানের স্বাদ পেতে হবে। ক্রিকেটাররা এর ব্যতিক্রম নন। ‘অপরিহার্য’ ক্রিকেটাররা যখন একে একে বিদায় নেবেন—তাঁদের ‘রিপ্লেসমেন্ট’ কিভাবে হবে, এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হয়নি। গত ছয়-সাত বছরে তাঁদের রিপ্লেসমেন্ট দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। জাতীয় দল পুনর্গঠনের কাজ সব দেশকেই করতে হয়। ভাবা হয়েছিল আরো দুই-তিন বছর পর এই শক্ত কাজটি নিয়ে মাথা না ঘামালেও হবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে তাঁদের রিপ্লেসমেন্ট বিষয়টি নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে। দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে হবে এখন থেকেই।

বাংলাদেশ তিন যুগের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলছে। টেস্ট খেলছে দুই যুগ ধরে। খেলছে টি-টোয়েন্টিও। এই দীর্ঘ সময়েও সম্ভব হয়নি পৃথক তিনটি সংস্করণের জন্য পৃথকভাবে দল তৈরি করা। সব দেশেই দুই-তিনজন ক্রিকেটার মোটামুটি সব সংস্করণে থাকেন প্রয়োজনীয়তার তাগিদে। অন্যদের কথা না হয় বাদই দিলাম, টেস্ট ক্রিকেটে নবাগত আফগানিস্তান কিন্তু প্রথম থেকেই সঠিক পথে হাঁটার চেষ্টা করছে। আর আমাদের ক্রিকেট সব সময়ই ‘জগাখিচুড়ি’—যিনি টেস্ট খেলছেন, তিনি আবার টি-টোয়েন্টি দলেও আছেন। ক্রিকেটার তো নেই। এতে করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সময়টা যে এখন ‘স্পেশালাইজ’ এবং সামর্থ্যের অধিকারীদের।

দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি খেলার উন্নয়নের জন্য সহায়ক নয়—এটাই সত্যি। টেকসই উন্নতির কোনো বিকল্প নেই। যত সময় গড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। প্রতিটি দেশ ক্রিকেট উপযোগী সুষুম পরিবেশে ধারাবাহিকতার সঙ্গে কাজ করছে। আমরা সেখানে সাময়িক সাফল্য নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি, যেটা আগেই উল্লেখ করেছি। ধাক্কা খাওয়ার পর কিছুদিন চুপ করে থাকা। ভুলগুলো সংশোধন এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এতে করে এগিয়ে চলার বিষয়টি সব সময় উপেক্ষিত হচ্ছে।

ক্রিকেট বোর্ড চেষ্টা করছে না—এটা কেউ বলছেন না। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দল, এ দল, এইচপি দলের খেলা বিদেশি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দেশে আয়োজন করা হচ্ছে। বিদেশে দল খেলতে যাচ্ছে। এগুলোর প্রয়োজনীয়তা সবাই বোঝেন। খেলতে খেলতে অভিজ্ঞতা বাড়বে, সাহস বাড়বে, নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ মিলবে। জাতীয় দলের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে এই পর্যায়ে খেলা যেকোনো ক্রিকেটারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁদের নিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ভাবতে হবে।

দেশের ক্রিকেটের ভিত দুর্বল। মজবুত ভিতহীন একটি ঘরকে বারবার শুধু চুনকাম করে দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না। ধীরে ধীরে এটি ভেঙে পড়বেই। দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে ২০০০ সালে। এত বছরেও দেশের ক্রিকেট একটি সুষুম কাঠামোর মধ্যে আসেনি। এতে করে ঘরোয়া ক্রিকেট সব সময়ই দুর্বল ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ত্রুটিপূর্ণ ঘরোয়া দুর্বল ক্রিকেট নিয়ে কখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিকতার সঙ্গে ভালো করা সম্ভব নয়। ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতিফলন লক্ষণীয় হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।

ঘরোয়া ক্রিকেটের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। দেশজুড়ে তো ক্রিকেট লিগ ও অন্যান্য টুর্নামেন্ট নিয়মিতভাবে জেলা পর্যায়েও অনুষ্ঠিত হয় না। ঘরোয়া ক্রিকেটে ‘ফার্স্ট ক্লাস’ ক্রিকেটের অবস্থাও করুণ। এই ক্রিকেট কোন ধরনের উইকেটে অনুষ্ঠিত হয় আর তাতে খেলে সেঞ্চুরি আর ডাবল সেঞ্চুরি করার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নামার পর ১০-১৫ রান করতে ক্রিকেটাররা খাবি খান—এটা তো আমরা সব সময় দেখছি। গত ২০ বছরেও আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থাগুলোর কাজ শুরু হয়নি। তারা পারবে না বললে তো হবে না। তাদের তো কাজ করতে দিতে হবে। তাদের কাজের নজরদারি করার তো সুযোগ আছে। আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্থাই পারে দেশজুড়ে ক্রিকেট চর্চাকে প্রসারিত করতে। তারাই আঞ্চলিক পর্যায়ে খেলা পরিচালনা করবে, খেলোয়াড় খুঁজে বের করবে, তাঁদের তৈরি করবে, তাঁদের জাতীয় পর্যায়ের জন্য মনোনীত করবে। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ক্রিকেট দিয়ে তো এগোনো যাবে না। ক্রিকেটে হঠকারিতা, ব্যক্তি ও সমষ্টির ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব বড় বেশি বিভিন্ন কারণে। এতে কিন্তু দেশের ক্রিকেট সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার নেই। বাংলাদেশে এই খেলাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবোধ, এটা মনে রাখা উচিত।

ক্ষমতা কুক্ষিগত, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, বৈরিতা, বিদ্বেষ, হিংসা, অসহিষ্ণুতা, একনায়কতন্ত্র, দলাদলি ক্রিকেটকে অক্টোপাসের মতো আটকে রেখেছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কাজ হয় না বলেই দেশের ক্রিকেটে এখনো স্থিতি আসেনি। একটি সহনীয় অবস্থায় আসতে পারেনি। সম্মিলিত প্রচেষ্টা, ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় জাতীয় চেতনা কখনো ব্যর্থ হয় না। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ তার প্রমাণ।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা