kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাম্প্রদায়িক চক্রান্ত সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে

মিল্টন বিশ্বাস

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাম্প্রদায়িক চক্রান্ত সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে

ভোলা জেলায় ফেসবুক মেসেঞ্জারে যে আইডি থেকে ধর্ম নিয়ে ‘অবমাননাকর’ বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেটি ‘হ্যাকড’ হয়েছিল বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মেসেঞ্জারে ওই বক্তব্যের ‘স্ক্রিনশট’ ব্যবহার করেই বোরহানউদ্দিনে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। ২০ অক্টোবর রবিবার বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে ‘মুসলিম তাওহিদি জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ হয় এবং এক পর্যায়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায় শত শত মানুষ। সকাল পৌনে ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপজেলা সদরে দফায় দফায় ওই সংঘর্ষে এক মাদরাসাছাত্রসহ চারজন নিহত এবং আহত হয় ১০ পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক। ১৮ অক্টোবর রাতে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামের ২৫ বছর বয়সী এক যুবক বোরহানউদ্দিন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। সে জানায়, তার ফেসবুক আইডি ‘বিপ্লব চন্দ্র শুভ’ হ্যাক করা হয়েছে। এ জন্য ভোলার পুলিশ সুপার ধর্ম অবমাননার গুজবের বিষয়টি নিয়ে ১৯ অক্টোবর স্থানীয় আলেমদের শান্ত রাখার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু তার পরও পরের দিন ওই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজনে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক জড়ো করা হয়। এরই মধ্যে বোরহানউদ্দিনের ওই হিন্দু যুবকের ফেসবুক আইডি হ্যাক করার অভিযোগে দুই মুসলমান যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কক্সবাজারের রামুর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনার মতোই অন্যের ক্ষতি করার জন্য, অন্যকে ফাঁসানোর জন্য এই ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু উপজেলায় হামলা চালিয়ে লুটপাটসহ ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও ৩০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ নামে এক হিন্দু মৎস্যজীবীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনে লোকজনকে খেপিয়ে তুলে ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়।

বর্তমান সরকারের সম্প্রীতি রক্ষার শত চেষ্টা সত্ত্বেও এ দেশে ধর্ম নিয়ে এখনো খেলা চলছে। মনে রাখতে হবে, এই খেলা ২০১৬ সালে শুধু নয়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও চলেছে। সে সময় গ্রামের পর গ্রামে অমুসলিম জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হয়েছে। বীভৎস অত্যাচার আর লুটপাটের শিকার হয়েছে সাধারণ সহজ-সরল নারী-পুরুষ। আহত ও নিহতের সংখ্যা দিয়ে সেই নিপীড়ন বিবেচনা না করে বরং ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অস্তিত্ব সংকটের বাস্তবতা পর্যালোচনা করা দরকার। আমরা কথায় কথায় বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু অত্যাচার থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয় না সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে। ২০১২ সালে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের পর সংবাদপত্র লিখেছিল, ‘দেশ ও জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হলো। গত শনি ও রবিবার কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার কয়েকটি স্থানে যে নারকীয় ঘটনা ঘটেছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ দেশে এ ধরনের জঘন্যতম ঘটনার উদাহরণ আর একটিও পাওয়া যাবে না। অন্য দেশের সাম্প্রদায়িক ঘটনার সুযোগ গ্রহণ করে অতীতে কুচক্রী মহল বিচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ঘটালেও গত শনি ও রবিবারের ঘটনা নজিরবিহীন।’ বৌদ্ধ সম্প্রদায় যে এ দেশেরই ভূমিসন্তান, অনেক আগে থেকেই বসতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছে, তারও অনুপুঙ্খ পর্যালোচনা উপস্থাপন করে তাদের ওপর জঘন্য হামলার নিন্দা ও বিচারের দাবি জানানো হয়েছিল সে সময়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য এ দেশের মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা আমাদের মতো খ্রিস্ট ধর্মবিশ্বাসীদেরও আশ্বান্বিত করে তুলেছে। তবে ২০০১ সালে নির্বাচনোত্তর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের সময় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মদদপুষ্ট কয়েকটি পত্রিকার নেতিবাচক আচরণ সবার স্মরণে আছে নিশ্চয়। সেসব পত্রিকার নেতিবাচক আচরণ বাদ দিলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মিডিয়ার যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সে সময় দেখেছিলাম, তা-ও ছিল গণতন্ত্র ও মানবতার পক্ষের শক্তির জাগরণের অবদান হিসেবে তাৎপর্যবহ। বর্তমান সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগে একমাত্র মিডিয়াই জনগণের পক্ষে কথা বলছে। আর সেই কথা যদি হয় সম্প্রীতি, শান্তি ও মঙ্গলের পক্ষে তখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনে বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়। তবে বিস্ময়কর হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর তাণ্ডবের মতো বিএনপি-জামায়াতের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস হয়েছে। ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত দেশে এক হাজার ৮০০টি মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩০২ জন হত্যা এবং ৩৯২ জন ধর্ষণের শিকার হয়। দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর জঘন্যতম হামলা হয়েছে। তার আগে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির ৯ ও ১০ তারিখে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং অগ্নিসংযোগ আর সাতক্ষীরার মতো ঘটনা যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল সাতক্ষীরার অগ্নিসংযোগ ও তাণ্ডবের ঘটনায় ছিল জামায়াতের প্রত্যক্ষ ইন্ধন।

অতীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষ হত্যা ও নারী ধর্ষণ মুখ্য ঘটনা ছিল। কিন্তু কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শনিবার দিবাগত রাতের পরিস্থিতি ও হামলার ধরন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা। দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে উন্নতি ঘটেছে, সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধি পেয়েছে—এসবই ধ্বংস করতে চায় মৌলবাদী জনগোষ্ঠী। আসলে মুসলিমদের সঙ্গে হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সাম্প্র্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ফায়দা লুটতে চায় কেউ কেউ। তবে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে যাঁরা সোচ্চার হয়েছেন, তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সব ধর্মের মানুষ। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ হতে হবে দল-মত-নির্বিশেষ মানুষের দ্বারা; তাহলে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ সম্মিলিতভাবে বেঁচে থাকার প্রয়াস সফল ও সার্থক হয়ে উঠবে।

মূলত পরিকল্পিতভাবে যারা আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করছে তারা দেশ, জাতি ও সব ধর্মের শত্রু। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এই শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। দেশবাসীকেও গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। যার যার ধর্ম তার তার কাছে। সব ধর্মের মানুষ এ দেশে বাস করবে। সেভাবেই তিনি দেশটিকে গড়ে তুলতে চাইছেন। দেশে একটি অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। ফেসবুকে নানা ধরনের অপপ্রচার করা হচ্ছে। একটি শ্রেণি নানাভাবে একটি অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে। এ জন্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

 

লেখক :  অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা