kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আবরার হত্যা ও ছাত্ররাজনীতি

এ কে এম শহীদুল হক

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



আবরার হত্যা ও ছাত্ররাজনীতি

বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে (২১) নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র। খুনিদের পরিচয় তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। আবরারকে যেভাবে শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, তা দেখলে যেকোনো ব্যক্তিরই হৃদয় কেঁপে না উঠে পারবে না। হৃদরোগের রোগী বা দুর্বল মানসিকতাসম্পন্ন কেউ দেখলে তো অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। যাঁরা আবরারকে হত্যা করেছেন তাঁরাও নিশ্চয় মেধাবী ছাত্র। কিন্তু কিভাবে এই ছেলেরা মায়া-মমতা, মনুষ্যত্ব, মানবিকতা, নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে দানব সমতুল্য হলেন তা বোধগম্য নয়। যাঁর মধ্যে ন্যূনতম মায়া-মমতা বা মানবিকতা থাকে তিনি কখনো একজন ব্যক্তিকে এভাবে নির্মমভাবে দীর্ঘক্ষণ শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করতে পারেন না। আবরারের করুণ চিৎকার আর আহাজারি তাঁদের হৃদয়কে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করেনি। শিক্ষার্থীদের এ নির্মমতা, মানবিক ও মনুষ্যত্ববোধের চরম অবক্ষয় কেন? বুয়েটে ভর্তি হওয়ার আগে প্রত্যেকেই মেধাবী সুবোধ বালকের মতো ছিলেন। মেধাবী হলেই যে ভালো মানুষ হবেন এটা হয়তো সত্য। কিন্তু একজন সহপাঠী আর একদল সহপাঠী কর্তৃক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হবেন, তা কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না। এর কোনো সমীকরণে সমাধানই পাওয়া যাবে না। আমরা যে মনুষ্যত্ব সমাজে বসবাস করি তার এত অধঃপতন কেন? সমাজ বিকাশে ইতিবাচক ও সুস্থ ধারায় পরিবর্তনের প্রত্যাশাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে তার বিপরীত ঘটছে। নৈতিকতা, মানবিকতা তথা সব মূল্যবোধের ক্রমাগত অবক্ষয়ে এ ধরনের পাষণ্ড ও বর্বর ঘটনা ঘটে, যা সমাজে জনমনে আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

আবরারকে কেন হত্যা করা হলো? কী তাঁর অপরাধ? জানা যায় তাঁকে শিবির সন্দেহে নির্যাতন করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নানা মত, নানা আদর্শ ও ভিন্নমত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় তো প্রচলিত বিধি-বিধানের মধ্যে মুক্তচিন্তা চর্চারই জায়গা। শিবির তো নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন নয়। তাঁদের এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশলে মোকাবেলা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এভাবে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে নয়। নিষিদ্ধ সংগঠন হলেও তাঁদের নির্যাতন করা ছাত্রদের কাজ নয়। তাঁরা তাঁদের পুলিশের কাছে তুলে দিতে পারেন। ছাত্রলীগের কিছু নেতা যাঁরা মেধাবীও বটে, তাঁদের কেন এত অধঃপতন। ছাত্রলীগের অতীত গৌরবময় ইতিহাস আছে। স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন, ঔপনিবেশিক শাসকদের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান; সর্বোপরি বাঙালির স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগ তথা ছাত্রসমাজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আজও সচেতন মহল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনেও এ দেশের ছাত্রসমাজের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সেই ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা এ রকম জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন তা খুবই দুঃখজনক। তাঁরা ছাত্ররাজনীতির অতীত ঐতিহ্যের ওপর কালিমা লেপন করে দিলেন।

মেধাবী আবরার তাঁর মা-বাবার কোল খালি করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কোনো মা-বাবাই সন্তানের এ নির্মম হত্যাকাণ্ডকে সহ্য করতে পারেন না। জানি না ছেলেহারা মা-বাবা কিভাবে বেঁচে আছেন। আর যাঁরা হত্যাকারী তাঁদের মা-বাবারাও কী অবস্থায় আছেন, তা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। অভিযুক্তরা প্রায় সবাই এর মধ্যে পুলিশ কর্তৃক ধৃত হয়েছেন। কেউ কেউ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদালতে দিয়েছেন। অভিযুক্ত এ মেধাবী ছাত্রদের জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষাও শেষ হয়ে গেল। বিচারে কী হবে সেটা পরে জানা যাবে। কিন্তু দোষী কেউ যে রেহাই পাবেন না সেটা সবাই প্রত্যাশা করে। কাজেই তাঁদের মা-বাবার স্বপ্ন যেমন ভঙ্গ হয়েছে, তেমনি তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে গভীর উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে। এতগুলো মেধাবী ছেলের জীবন থেমে গেল এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্যে।

এ নির্মম ও লোমহর্ষক ঘটনার পর অনেক বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সমাজবিশ্লেষক নানাভাবে ঘটনার বিশ্লেষণ করছেন। একটি খ্যাতিমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীদের এমন অধঃপতনের কারণ কী, এর দায়িত্ব কার, কিভাবে মেধাবী ছাত্ররা দানবে পরিণত হলেন—এসব প্রশ্ন এখন সবার। এর সরল ও এককথার উত্তর—নষ্ট রাজনীতি। অর্থাৎ যে রাজনীতি একজন ব্যক্তিকে মানুষ করার পরিবর্তে অমানুষ করে তোলে। ছাত্রসংগঠনকে মূল রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠন বলা হলেও তাঁরা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকেন মূল রাজনৈতিক দলের নেতাদের দ্বারাই। মূল রাজনৈতিক দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের আশীর্বাদ ব্যতীত কেউ সহযোগী সংগঠনের সদস্য হতে পারেন না। সহযোগী সংগঠনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ মূলত মূল রাজনৈতিক দলের ওপরই থাকে। যেহেতু সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা মূল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের আশীর্বাদ বা সমর্থনে নিয়োগ পান, সেহেতু এই সংগঠনের কর্মকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব সহযোগী ও মূল রাজনৈতিক দলের নেতারা একেবারে এড়াতে পারেন না। আসলে সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ড তদারক বা মনিটরিং কিংবা তাঁদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার তেমন কোনো পদ্ধতি, কৌশল ও তৎপরতা মূল রাজনৈতিক সংগঠনে অনুপস্থিত। যার ফলে তাঁদের কারো কাছে জবাবদিহি তেমন একটা নেই। আস্তে আস্তে তাঁরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নানা রকম কুকর্ম, অপরাধ ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।

প্রতিটি সরকারের আমলেই সরকারি দলের সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের ছাত্রনেতারা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। বিএনপি আমলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হল ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের দখলে ছিল। ক্যাম্পাসে তাঁদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠানেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হলে ঢুকতে পারতেন না। কোনো কোনো হলে কিছু থাকলেও একেবারে কোণঠাসা হয়ে থাকতেন। মাঝেমধ্যে তাঁদের ওপর নির্যাতনও হতো। আহত-নিহত হওয়ার ঘটনাও আছে। একইভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আবাসিক হল ও ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নানা রকম অপকর্ম ও অপরাধে জড়িয়ে যান। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাবোধ সৃষ্টি করে।

ছাত্ররাজনীতির এ অধঃপতনের কারণ যদি খুঁজি তাহলে আমাদের তাকাতে হবে জিয়া ও এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের শাসনের দিকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক সরকাররা নিজেদের অবৈধ শাসনকে পাকাপোক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি এবং নীতি ও আদর্শ বিসর্জনকারী সুবিধাবাদী গোষ্ঠীকে নিয়ে লোভ-লালসার মাধ্যমে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। সামরিক শাসকরা ছাত্ররাজনীতিকেও কলুষিত করেন। টাকা-পয়সা ও অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করে তাঁদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও ওই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের বেপরোয়া হওয়ার পেছনে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশকারার বিষয়টি অগ্রাহ্য করা যায় না। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সমীহ করে চলে। এমনকি আবাসিক হলে সিট বরাদ্দে, টেন্ডার গ্রহণে, প্রশাসনিক পদে নিয়োগে সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সক্রিয় হস্তক্ষেপ থাকে। বরাদ্দ ছাড়াও তাঁরা নিজেদের অনুগতদের আবাসন দিয়ে নিজেদের বলয় শক্তিশালী করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের কেন এত তোয়াজ করেন? কেন তাঁদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে পারেন না? কেন তাঁদের কুকর্ম ও অপকর্মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন না? কেন র‌্যাগিংয়ের মাধ্যমে ছাত্রদের নির্যাতনের ঘটনা জেনেও না জানার ভান করেন? এসব প্রশ্নের জবাব একটাই—সেটা হলো নিজের অবস্থান ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে আরো ভালো অবস্থানে যাওয়ার আশা। সম্পূর্ণ আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। লোকে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বা শিক্ষক হতে হলে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের সমর্থন ও তাদের তদবির লাগে। অঙ্গসংগঠন প্রত্যয়ন করে কে সরকারি দলের আদর্শের এবং কে ভিন্নমতের। তাই ভিসি পদপ্রত্যাশী শিক্ষকরা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের কাছে তদবির করেন এবং তাঁদের নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকেন। ফলে ওই সংগঠনের ছাত্ররা নিজেদের অনেক ক্ষমতাসীন মনে করেন। তাঁরা স্থানীয় থানা-পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গেও সখ্য গড়ে তোলেন। সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের সদস্য হওয়ায় থানা-পুলিশও তাঁদের প্রতি নমনীয় থাকে। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয় না, যা অনুচিত। এভাবেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কিছু কিছু নেতাকর্মী বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং নানা রকম অপকর্মে লিপ্ত হন।

শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার আলো দান করে তাঁদের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করবেন। নৈতিকতা, মানবতা ও দেশপ্রেমে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করবেন। এ জন্য তাঁরা নিজেরা হবেন নৈতিকতার আদর্শ, মানবতার আদর্শ ও ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ। শত বাধা-বিপত্তি ও ঝুঁকি এলেও তাঁরা অন্যায়ের কাছে মাথানত করবেন না। এ রকম আদর্শ শিক্ষকই হবেন শিক্ষার্থীদের অনুকরণ ও অনুপ্রেরণার উৎস। কিন্তু শিক্ষকদের সেই নৈতিকতা, মানবতা ও সাহস কদাচিৎ দেখা যায়। সব ক্ষেত্রেই মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র মর্মান্তিক ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও ভাইস চ্যান্সেলর মৃতদেহের কাছেও আসেন না। জানাজায় অংশগ্রহণ করেন না। ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে শোক প্রকাশ করেন না। বিচার চান না। এটা কোনো যুক্তিতেই মানা যায় না। তাঁর অবশ্য কর্তব্য ছিল সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলম্ব না করে ঘটনাস্থলে আসা। মৃতদেহ দেখা। ছাত্র ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা। প্রাথমিকভাবে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই সুরে খুনিদের কঠোর সাজা চাওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁদের বহিষ্কারের আশ্বাস দেওয়া। একই সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া। এসব তিনি কিছুই করেননি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেননি। তাঁর কথা ও আচরণে দুর্বল প্রশাসনিক কর্মকর্তার লক্ষণ ও দায়িত্বহীনতার স্বাক্ষর প্রস্ফুটিত হয়েছে। এটা দুঃখজনক এবং শিক্ষক হিসেবে লজ্জার বিষয়। তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছেও তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। যদিও তিনি পরে যথাসময়ে না আসার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। আর এসব দুর্বল প্রশাসনের কারণেই ছাত্ররা বিপথে চলে যান।

সাধারণ ছাত্র এবং কোনো কোনো মহল থেকে দাবি উঠেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নেই। ইচ্ছা করলে বুয়েট কর্তৃপক্ষ ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর মধ্যে বুয়েটে শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ঘোষণাও এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির কোনো প্রয়োজন নেই। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট শিক্ষকরাই ছাত্রদের অপকর্মে সায় দিয়ে তাঁদের বিপথে নিয়ে যান। কিন্তু আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। সেই ছাত্ররাজনীতি আজ এক শ্রেণির ছাত্র, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার ভ্রান্তনীতি, আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের অভাবে কলুষিত হয়ে পড়েছে। ছাত্ররাজনীতির আদর্শিক স্থান দখল করেছে বাণিজ্য। ছাত্ররাজনীতির প্রতি সাধারণ ছাত্র এবং বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয়েছে। মূল  রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতির সংস্কার এখন সময়ের দাবি। কিন্তু জাতীয়ভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে কোনো সুফল আসবে তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। বরং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই নিষিদ্ধ না করে সংস্কার প্রয়োজন। ছাত্ররাজনীতিতে যাঁরা যোগদান করবেন তাঁদের জন্য আচরণ বিধিমালা, কর্তব্য সম্পাদন নীতিমালা, প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি থাকা আবশ্যক। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করার লক্ষ্যে তাঁদের দেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্র ও সরকার, বহির্বিশ্বের গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাসহ দেশের ও বিশ্বের সফল খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক, সমাজ সংস্কারকদের জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য প্রশিক্ষণ ও পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি উন্নত দেশে ছাত্ররাজনীতি আছে। কিন্তু তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হিসেবে ব্যবহৃত হন না। রাজনৈতিক দলের Affiliated হলেও তাঁরা ইস্যুভিত্তিক যেমন শিক্ষার্থীদের সমস্যা, দাবি-দাওয়া, সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ, নাগরিকদের সিভিল রাইট বা মানবাধিকার, গণতন্ত্র, শ্রমিক-কৃষকের ন্যায্য দাবি, সন্ত্রাস-জঙ্গি ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ন্যায্য দাবি-দাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম বা কর্মসূচি গ্রহণ করেন। আমাদের দেশেও দাবি উঠেছে যে ছাত্রসংগঠনগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে পারবে না। ছাত্র ও যুব রাজনীতি সংস্কার শুধু রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা দ্বারাই সম্ভব। এ ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের প্রয়োজন হবে।

আবরার হত্যার দায় অংশগ্রহণকারী ছাত্র ও সাহায্যকারী ছাত্রদের, যাঁরা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ করেছেন। পাশাপাশি ভ্রান্ত রাজনীতি বা রাজনীতির অপসংস্কৃতি, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা এবং সর্বোপরি বুয়েটের কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদেরও দায়বদ্ধতার মধ্যে আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনকে এ দায় থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাঁদের নিষ্ক্রিয়তা, দুর্বলতা ও প্রশ্রয়ে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী ধারাবাহিকভাবে অপরাধ ও সন্ত্রাসমূলক ঘটনা ঘটিয়ে দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি কঠোর হতো এবং স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তৎপর হয়ে ছাত্রদের এ অপকর্মের বিরুদ্ধে সক্রিয় হলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস পেতেন না বা পরিবেশ সৃষ্টি হতো না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। তিনি নিজ দল থেকেই শুরু করেছেন। অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই সর্বমহলে সতর্কবার্তা চলে গেছে যে অপরাধ ও দুর্নীতি করে কেউ ছাড় পাবে না। জনগণ প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগে আশার আলো দেখার প্রত্যাশা করছে।

লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা