kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ছাত্ররাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে

ইসহাক খান

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছাত্ররাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে

আবরার ফাহাদের হত্যার পর বুয়েটের ছাত্ররা ছাত্ররাজনীতি বন্ধসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। সেই সময়ে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, তাঁর বিদেশ সফরের অর্জন নিয়ে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত বক্তব্যের পর একজন সাংবাদিক বুয়েটের ছাত্র আন্দোলন বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জবাবে প্রধানমন্ত্রী বললেন, এটা বুয়েট কর্তৃপক্ষের ব্যাপার। তারা যদি মনে করে ছাত্ররাজনীতির দরকার নেই, বন্ধ করে দেবে।

অনেক নাটকের পর বুয়েটের ভিসি ছাত্রদের মুখোমুখি হলেন। ছাত্রদের চাপের মুখে তিনি বাধ্য হলেন দাবি মানতে। এর আগে তিনি আবরার হত্যার পর লুকিয়ে ছিলেন দুই দিন। প্রকাশ্যে এসে অজুহাত হিসেবে যা বলেছেন তা শুধু তাঁর অযোগ্যতাকেই প্রমাণ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে রাতেই তাঁর সেখানে উপস্থিত হওয়ার কথা। তাঁর নেতৃত্বেই আবরারকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা। অথচ তিনি হাস্যকর যুক্তি দিয়ে পার পেতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। অনেক সমালোচনা মাথায় নিয়ে ঘাড় গুঁজে সব মেনে নিলেন। একই সঙ্গে নিজেকে হাসির পাত্র বানালেন।

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পর এখন শুরু হয়েছে তার পোস্টমর্টেম। পক্ষে-বিপক্ষে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা চলছে। বুয়েটের প্রাক্তন এক ছাত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্তটি আত্মঘাতী।

আরেকজন লিখেছেন, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা মানে মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা। এটা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন রয়েছে। এ দেশে গর্ব করার মতো যা কিছু অর্জন, সবই ছাত্রদের আন্দোলনের ফসল। তিনি সন-তারিখ উল্লেখ করে লিখেছেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচার, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—এসব আন্দোলনই ছাত্রদের হাত ধরে এসেছে। বললাম, আপনার যুক্তি অকাট্য। দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ১৯৯১ সালের গণতন্ত্র কায়েমের পর আর কী অর্জন করেছেন ছাত্ররা?

১৯৯০ সালের আন্দোলনের পর থেকে তাঁদের শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প। সেটা নির্দিষ্ট কোনো ছাত্রসংগঠনের দিকে অঙুলি হেলনের ব্যাপার নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে সেই দলের সোনার ছেলেরা যা ইচ্ছা তাই করেছেন। পাল্টা তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ফলটা অচিরেই পেয়ে যাবেন। যখন দেখবেন, দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। তাঁরা নিঃশব্দে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ঠিকই চালিয়ে যাবেন। তাঁদের কোনো সমস্যা হবে না। একদিন সব কিছু তাঁরা দখলে নিয়ে নেবেন। এটা তারই নীলনকশা।

তাঁকে বললাম, ছাত্ররাজনীতি থাকা অবস্থায় বুয়েটে দীপকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন জঙ্গিরা। কিছুদিন আগে বুয়েট থেকে জঙ্গি গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ১৪ অক্টোবর দুজন জঙ্গিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে; তাঁরা খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্র। তাঁরা যখন অধ্যয়ন করেছেন, তখন কিন্তু ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল না। তাহলে এই ভাইজানরা জঙ্গি হলেন কিভাবে?

যাঁরা জঙ্গি হবেন, শত বাধার মধ্যেও তাঁরা জঙ্গি হবেন। তাঁরা হাসতে হাসতে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁদের কোনো আইন দিয়ে, কোনো রাজনীতি দিয়ে, কোনো ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত করা যাবে না। শুধু শুধু সেই কারণে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হবেন কেন?

প্রশ্ন হলো, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা কি ছাত্ররাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হন? এই কথার সহজ জবাব, হ্যাঁ পিষ্ট হন। বহুভাবে পিষ্ট হন। যাঁরা র‌্যাগিং কী জানেন না, তাঁরা বুঝবেন না র‌্যাগিংয়ের অত্যাচার কাকে বলে। র‌্যাগিংয়ের জাঁতাকলে পড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত একজন ছাত্র মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে গেছে। অনেক নিরীহ ছেলে একা একা চোখের পানি ফেলেন র‌্যাগিংয়ের কারণে। ভিডিওতে একটি র‌্যাগিংয়ের দৃশ্য দেখে আমি নিজেই শিউরে উঠেছি। নিরীহ সাদামাটা একটি ছেলে। সদ্য তিনি শহরে এসে ভর্তি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বড় ভাইদের সঙ্গে পরিচয়ের পর্বটি কতটা নির্মম তা আমার এই বর্ণনায় বুঝতে পারবেন। ছেলেটি সামনে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোর নাম কী? ছেলেটি ভয়ে ভয়ে জবাব দিলেন। একজন বললেন, কান ধর। ছেলেটি বুঝতে পারছেন না, কেন তিনি কান ধরবেন। তাঁর আপত্তি-আপত্তি ভাব। সঙ্গে সঙ্গে চড়-থাপ্পড় শুরু হয়ে গেল। থাপ্পড় খেয়ে ছেলেটি নিচে পড়ে গেলেন, তাঁকে তুলে ধরে যে কয়েকজন বড় ভাই সেখানে ছিলেন তাঁদের সবার ব্যাগ তাঁর মাথায় দিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে রাখা হলো।

একজন সদ্য কিশোর, যার শরীর থেকে মফস্বলের গন্ধ এখনো যায়নি, তার কিনা উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে জীবনের শুরুতে এই নির্মম অভিজ্ঞতা। তাই বলতে চাই, এই নির্মম সিস্টেমটি সারা জীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া দরকার। যাঁরা বলছেন, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার জন্য আবরারকে পিটিয়েছেন ছাত্রলীগের নেতারা। কথাটা ঠিক নয়। আবরারের ওপর তাঁদের আগে থেকেই রাগ ছিল। কী কারণে সেই রাগ? যতটুকু জানতে পেরেছি, রাতে যে হলে মিছিল হয় সেই মিছিলে রাজনীতি না করলেও সাধারণ ছাত্রদের যেতে বাধ্য করা হয়। যে বা যাঁরা সেই মিছিলে যাবেন না, রাজনীতির বড় ভাইদের কাছে তিনি বিরোধী মতের লোক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন। নানাভাবে তাঁকে ভোগান্তিতে পড়তে হয় এবং হবে। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নিয়ন্ত্রণ হল অফিসের হাতে নেই। হল অফিস শুধু কাগজে-কলমে। বাকি কাজ করেন হলের ছাত্রনেতারা। একজন সাধারণ ছাত্র হলে সিট পেলেই উঠতে পারবেন না। তাঁকে এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। মিছিলে ডাকলে মিছিলে যেতে হয়। টাকা দিতে হয়। বড় ভাইদের কথামতো চলতে হয়। না চললেই নেমে আসবে দুর্ভোগ। শুধু দুর্ভোগ নয়, হলেই তিনি থাকতে পারবেন না। চোখের সামনে লাথি দিয়ে বিছানাপত্র নিচে ফেলে দেবেন। তাঁর সিটে উঠবেন অন্য কোনো বহিরাগত মাস্তান। আর তাঁকে গেস্টরুমে গাদাগাদি করে অমানবিকভাবে বাস করতে হবে। এটা এখন সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম হয়ে গেছে।

একজন অভিভাবক একটি অকাট্য যুক্তি তুলে বলেছেন, ধরুন, পাশাপাশি দুটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়। একটিতে রাজনীতি নিষিদ্ধ, অন্যটিতে ছাত্ররাজনীতি বহাল। দেখবেন আজ যাঁরা ছাত্ররাজনীতির পক্ষে জোরালো যুক্তি দিচ্ছেন, তাঁরাই তাঁর সন্তানকে ভর্তি করতে অরাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আগে ছুটছেন। তাঁরা ছাত্ররাজনীতি সমর্থন করলেও তাঁদের সন্তানকে অরাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করবেন।

মোদ্দা কথা, যেটা বলতে চাই। ছাত্ররাজনীতি থাকবে। কিন্তু কোনো শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি চলবে না। তাঁরা তাঁদের জায়গায় লেজুড়বৃত্তি করুন। কেউ কোনো কথা বলবে না।

বড় কথা হলো, অছাত্ররা ছাত্ররাজনীতি করেন। পড়াশোনা নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই। সম্প্রতি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তাদের নতুন কমিটি গঠন করেই এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল করতে। তাঁদের বেশির ভাগই অছাত্র। একজন অছাত্র কোনোভাবেই ছাত্রদের ওপর খবরদারি করতে পারবেন না। ছাত্রদের সমস্যা ছাত্ররাই সমাধান করবেন। বাইরের কোনো অছাত্র শিক্ষাঙ্গনে এসে ছাত্রদের ব্যাপারে মাথা ঘামাবেন কেন?         

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা