kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও তুরস্কের সিরিয়া অভিযান

গাজীউল হাসান খান

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও তুরস্কের সিরিয়া অভিযান

বাইরে থেকে বিষয়টিকে যেভাবেই দেখা যাক না কেন, কিংবা তা নিয়ে যত নাটকই সংঘটিত হোক না কেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মতৈক্য বা সমঝোতা ছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ৯ অক্টোবর থেকে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় সামরিক অভিযানে বের হননি। উত্তর সিরিয়ায় অবস্থানরত এক হাজার মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা আসার পরপরই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তাঁর দেশ ও সিরীয় কুর্দি সন্ত্রাসীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ থেকে তুরস্ককে রক্ষার জন্য সিরিয়ার সঙ্গে উত্তর সীমান্তজুড়ে একটি নিরাপদ অঞ্চল (সেফ জোন) সৃষ্টি করার অভিযানে নেমে পড়েন। সীমান্তের পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি ৩০ কিলোমিটারব্যাপী প্রস্তাবিত নিরাপদ অঞ্চল সৃষ্টি করার দাবি ছিল এরদোয়ানের বহু দিনের। কিন্তু ঠিক সেই অঞ্চলেই ছিল যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সিরীয় ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) কুর্দি যোদ্ধারা। তুরস্কের অভিযোগ, এদের বেশির ভাগই কুর্দি সন্ত্রাসবাদী ওয়াইপিজির সদস্য। ওয়াইপিজি (দ্য পিপলস প্রটেকশন ইউনিট) কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন পিকেকের (কুর্দিশ ওয়ার্কার্স পার্টি) অনুসারী। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র হিসেবে তাদের এত দিন সন্ত্রাসবাদী হিসেবে পরিপূর্ণভাবে ত্যাগ করতে পারেননি। কারণ এসডিএফের সবাই পিকেকে সমর্থক কুর্দি নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের সিরিয়া ত্যাগের ঘোষণা সন্ত্রাসবাদী কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কের বহু আকাঙ্ক্ষিত সামরিক অভিযানের সুযোগ এনে দেয়। এ বিষয় নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের বোঝাপড়া চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে তাদের সিরিয়ায় অবস্থানরত অবশিষ্ট সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে এসডিএফের কিংবা ওয়াইপিজির কুর্দি যোদ্ধাদের জন্য যে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে তাকে তারা তাদের পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাতের সঙ্গে তুলনা করেছে। এ অভিযোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বহু হুমকি দিয়েছেন, বিশেষ করে নিরাপদ অঞ্চল সৃষ্টি করার সামরিক অভিযানে তুরস্ক বাড়াবাড়ি করলে তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারির হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু মার্কিন ট্রেজারি বিভাগকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিলেও ট্রাম্প তাত্ক্ষণিকভাবে তা কার্যকর করেননি।

বিগত কয়েক দিনের অভিযানে অর্থাৎ ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ‘অপারেশন পিস স্প্রিং’ নামক অভিযানে একটি নগরী এবং ৫৬টি গ্রাম দখল করে নিতে সমর্থ হয় তুরস্ক ও সিরিয়ার জাতীয় সামরিক বাহিনী। তুর্কি সৈন্যরা পাঁচ শতাধিক ওয়াইপিজি ও অন্য সন্ত্রাসবাদী কুর্দিদের হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে। সেই চলতি অভিযানে ১৮ জন সাধারণ সিরীয় নাগরিকও নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। তুর্কি বাহিনী এরই মধ্যে প্রস্তাবিত নিরাপদ অঞ্চল বরাবর নিকটবর্তী ‘এম৪ হাইওয়ে’তে অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অবস্থা বেগতিক দেখে ওয়াইপিজি সন্ত্রাসবাদীরা তুরস্কের অভ্যন্তরে মারদিন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তুরস্ক বাহিনী সিরিয়ার উত্তর সীমান্তে রাস আল আইন নামক গুরুত্বপূর্ণ নগরটি প্রথমে দখল করে নিয়েছে। তার পশ্চিমে রয়েছে মানবিজ ও তাল আবাইদ নামক আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি (শহর), যা দখল করতে পারলে তুরস্ক তার বহু প্রত্যাশিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ স্থাপনের অনেকটাই এগিয়ে যাবে বলে গণমাধ্যমের ধারণা। কিন্তু এর মধ্যে অবস্থা বেগতিক দেখে সিরিয়ার উত্তর সীমান্তে অবস্থানরত বৈরী কুর্দিরা সিরীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। ওয়াইপিজি ও অন্য সন্ত্রাসবাদী কুর্দিরা দাবি করেছে যে চুক্তির ফলে উত্তর সীমান্তে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী বসানো হচ্ছে। এতে সীমান্ত অঞ্চলে তুরস্কের প্রস্তাবিত নিরাপদ জোন থেকে স্থানীয় কুর্দিদের সরিয়ে দেওয়া আর সম্ভব না-ও হতে পারে। কুর্দি বাহিনী তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সমর্থ হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো সিরীয় সরকারের কোনো অবস্থান বা প্রতিক্রিয়া নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরীয় ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) এ ধরনের বক্তব্য আসার আগেই তুর্কি বাহিনী উত্তর সীমান্তে প্রবল বোমাবর্ষণের মাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে নিয়েছে। কুর্দি কর্মকর্তারা বলেছেন, উত্তর সীমান্তের আইন ঈসা ক্যাম্প থেকে এরই মধ্যে প্রায় ৮০০ বন্দি পালিয়ে গেছে, যারা আইএস সদস্য এবং তাদের বিদেশি আত্মীয় কিংবা সমর্থক। আইএস বন্দি কিংবা তাদের আটককৃত আত্মীয় ও সমর্থকদের দায়িত্ব নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে তুরস্ক সরকার ও তার অভিযানরত বাহিনী। কিন্তু আইএস বন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ওয়াইপিজি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নিরাপত্তার জন্য আবার জড়াতে চাচ্ছে। তা ছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, শান্তিপ্রিয় কুর্দিরা তাদের ভাই। তুরস্কে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ কুর্দিদের বসবাস। সিরিয়ার উত্তর সীমান্তে কিংবা মূল তুরস্কে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে তুর্কি সরকারের কোনো দ্বন্দ্ব বা সংঘাত নেই। সব দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসবাদী কুর্দিরা, যারা তুরস্ক ও সিরিয়াকে ভেঙে দিতে চায়। রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতে চায়।

সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত, তুরস্কের অভ্যন্তরে একটি বিশাল অঞ্চল এবং অন্যদিকে নিকটবর্তী ইরাক ও ইরানে রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কুর্দির বসবাস। কুর্দিরা হচ্ছে বর্তমান বিশ্বে একটি বিশাল সম্প্রদায় (সম্ভবত সর্ববৃহৎ), যাদের কোনো নির্দিষ্ট স্বাধীন রাষ্ট্র নেই। সিরিয়ার রাজনৈতিক অসন্তোষ বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা স্বাধীনতাকামী কুর্দিদের মধ্যে সেই সুপ্ত বাসনাকে আবার জাগিয়ে তুলেছে বলে তুরস্কের নেতাদের ধারণা। বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন কিংবা উন্নতি না ঘটলে শেষ পর্যন্ত কুর্দি জাতীয়তাবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘর্ষের ফলে তুরস্কের অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে অনেকের ধারণা। অথচ তুরস্ক পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি। বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, তুরস্কের বিরাট নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। আর সেটি আসতে পারে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসবাদী কুর্দিদের দিক থেকে। এ ব্যাপারে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান কয়েক দিন ধরে বারবার বলে চলেছেন যে একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্কের নিরাপত্তা বিধান করা অন্য ন্যাটো জোটভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর বিশেষ সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর সিরীয় এসডিএফ মিত্রদের এবং অন্য কুর্দিদের এরই মধ্যে কয়েকবার এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তবু তিনি তুরস্কের চলমান সামরিক অভিযানের রাশ টেনে ধরা এবং সিরিয়ার সীমান্তে অবস্থানরত কিংবা সেখানে বসবাসকারী কুর্দিদের নিশ্চিহ্ন করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হুমকি-ধমকি দিয়েছেন তুরস্কের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা নিষেধাজ্ঞা জারি করার। এবং শেষ পর্যন্ত তুরস্কের বিরুদ্ধে শক্তিশালী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। বিগত আট বছর ধরে সিরিয়ায় যে গণযুদ্ধ চলছে তাতে ৩০ লক্ষাধিক সিরীয় শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে তুরস্কে। সিরিয়ার প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যার বেশির ভাগই এখন বাস্তুহারা ও শরণার্থী। নিহত হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখের মতো নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষ। সিরিয়ার জনসংখ্যার ৮৭ শতাংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী ও ৭৪ শতাংশ সুন্নি মতাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদ তাঁর দেশে গত ১৯ বছরে কোনো গণতান্ত্রিক কিংবা অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করতে পারেননি। ২০০০ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাশার আল আসাদ শুধু তাঁর ১৩ শতাংশ আলাওয়াইট ও শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রশাসন থেকে বিভিন্ন উচ্চ সামরিক পদে বসিয়েছেন। অর্থনৈতিক দিক থেকে নজিরবিহীন বৈষম্যের শিকারে পরিণত হয়েছে ব্যাপক সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী। দেশে গড়ে ওঠেনি কোনো গণতান্ত্রিক বিরোধী দল। ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে সূচিত আরব বসন্তের প্রভাবে সিরিয়ায় গণবিক্ষোভ ও আন্দোলন গণযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। তাতেও কোনো পরিবর্তন আসেনি সিরিয়ার জনপ্রশাসন, অর্থনীতি ও সমাজজীবনে।

আরব বসন্তের প্রভাবে সিরিয়াব্যাপী সর্বত্র গণবিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও শেষ পর্যন্ত খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রায় সব কিছুই হারিয়ে ফেলেছিলেন স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদ। বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল সামরিক বাহিনীতে, গঠিত হয়েছিল ফ্রি সিরিয়ান আর্মি, সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস থেকে শুরু করে ধর্মীয় জঙ্গিবাদী আল-নুসরা ও অন্যান্য উগ্রবাদী সংগঠন। আসাদ সব দিক থেকেই প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। হারিয়ে ফেলেছিলেন রাজধানী দামেস্ক ও নিকটবর্তী কয়েকটি শহর ছাড়া প্রায় সব কিছুই। কিন্তু অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস না করলেও নেহাত ভাগ্যক্রমে ২০১৫ সাল থেকে ইরান ও রাশিয়ার সামরিক সাহায্যে আবার হারানো রাজত্বের প্রায় ৬০ শতাংশ তিনি পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু তাতেও শান্তি, স্বস্তি কিংবা স্থিতিশীলতার লেশমাত্রও ফিরে আসেনি। দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘর্ষ ও বিপর্যয়ের কারণে সিরিয়ার বিধ্বস্ত অর্থনীতি ও তার বিপন্ন জনগণের চাপে প্রতিবেশী লেবানন ও জর্দান ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তা ছাড়া সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক চাপ পড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র তুরস্কের ওপর। মারাত্মকভাবে চাপের সম্মুখীন হয়েছিল তুরস্ক, যার ফলে তার উচ্চ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি ক্রমে ক্রমে মন্দার শিকারে পরিণত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সিরিয়ার বিক্ষোভ-সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছিল কুর্দি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে। কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীরা তুরস্ককে ভেঙে দিতে তৎপর হয়ে উঠেছিল, যার অবসান এখনো ঘটেনি। সে জন্যই প্রতিবেশী সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে তুরস্কের এই সামরিক অভিযান।

‘উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ও আধুনিক তুরস্ক’ নিয়ে গবেষণাভিত্তিক একটি স্টাডি সার্কেলের কার্যক্রমে যোগ দিতে ১১ সেপ্টেম্বর দুই সপ্তাহের জন্য আমি ইস্তাম্বুল পৌঁছেই আভাস পেয়েছিলাম উত্তর সিরিয়া সীমান্তে একটি তুর্কি সামরিক অভিযান অত্যাসন্ন। এর আগে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রে মিলিত হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। তুরস্কের এই রাষ্ট্রপ্রধান আগামী মাসে আবার মিলিত হবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে। এর মধ্যে সিরিয়া অভিযানকে কেন্দ্র করে ন্যাটোর দুটি মিত্র দেশের মধ্যে অনেক নাটকীয় ঘটনা ঘটবে, তাতে থেমে যাবে না তুরস্ক। তা ছাড়া সিরিয়ায় যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘর্ষের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের নেতৃত্বে গত মাসে গঠিত হয়েছে ১৫০ সদস্যের একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি। এতে সিরীয় সরকারের দিক থেকে এক-তৃতীয়াংশ, বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এক-তৃতীয়াংশ এবং বাকি সদস্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। আগামী ৩০ অক্টোবর জেনেভায় এই সংবিধান রচনা কমিটির প্রথম সভা বসবে। তাতে রাশিয়া, ইরান ও তুরস্ক পূর্ণ সম্মতি প্রদান করেছে। গণতান্ত্রিক অধিকারের দিকে বিশেষভাবে লক্ষ রেখে এ প্রস্তাবিত সংবিধানটি প্রণীত হওয়ার কথা রয়েছে। তাতে জনগণ, বিরোধী দল কিংবা সরকারের ন্যায়সংগত গণতান্ত্রিক অধিকার ও দায়-দায়িত্বের প্রতিফলন ঘটানো হবে বলে আভাস দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস। গত আট বছর স্থায়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে এ সংবিধান রচনার মূল উদ্দেশ্য।  আগে বছরব্যাপী আলোচনা করেও এ সংবিধান প্রণয়ন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের মতানৈক্যের ফলে বিভিন্ন পর্যায়ে থেমে গিয়েছিল তার অগ্রগতি। এবার জাতিসংঘের মহাসচিব সরকার, বিরোধী দলগুলো এবং বিভিন্ন অঞ্চলের দখলদারদের প্রতিনিধি ছাড়াও রাশিয়া, ইরান ও তুরস্ককে সংবিধান রচনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে বাস্তবে রূপদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আশা প্রকাশ করেছেন, সবার সম্মিলিত শান্তি প্রচেষ্টা এবার ফলপ্রসূ হবে।

ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান সমর্থিত হুতি গেরিলাদের সংঘর্ষে নতুন করে আবার বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। এ অবস্থায় সিরিয়ায় যদি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলে একদিকে যেমন বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের অবসান ঘটবে, তেমনি অন্যদিকে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান হয়ে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করবে বলে অনেকের বিশ্বাস। সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে স্বস্তি ফিরে আসবে প্রতিবেশী তুরস্ক, লেবানন, জর্দান ও ইরাকে। দায়মুক্তি ঘটবে তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার। অন্যদের কথা বাদ দিলেও তুরস্কের জন্য এ বোঝা এখন দুর্বহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাত-আট বছর ধরে তুরস্ককে প্রায় ৩০ লাখ আশ্রিত প্রতিবেশীর ভরণ-পোষণ জোগাতে হচ্ছে এবং সীমান্ত প্রহরায়ও ব্যয় হচ্ছে বিশাল অঙ্কের অর্থ। সিরিয়ার উত্তরাংশের সীমান্ত সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপতৎপরতা থেকে মুক্ত হোক তুরস্ক ও সিরিয়ার শান্তিপ্রিয় মানুষ, অতি শিগগির শান্তি ও স্বস্তি ফিরে পাক—এটা এখন সবার কাম্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার জন্য তুরস্কের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তা ছাড়া আংকারা আসছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। কিন্তু অভীষ্ট নিরাপদ জোন প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া থামবেন না প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। দেখা যাক কী হয়।

 

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা