kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দেশ ও জনকল্যাণের রাজনীতি দেখতে চাই

লে. জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান (অব.)

১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশ ও জনকল্যাণের রাজনীতি দেখতে চাই

বাংলাদেশ এখন যে সময় ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেই সময়টা যে ভালো নয়—এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এখনকার পরিস্থিতিটা সুখকর কোনো পরিস্থিতি নয়। একটা অস্থির সময় চলছে। এখন এমন সময়, যখন মানুষ মানুষকে সন্দেহ করে। মানুষের মনে সন্দেহ ও সংশয় বিরাজ করছে। পরস্পরে অনাস্থা আছে। আছে নিরাপত্তার অভাব। শিক্ষা ও দুর্নীতি নিয়ে যা কিছু দেখতে পাচ্ছি তাতে বলা যায়, জাতীয় জীবনে এখন স্বাভাবিক অবস্থা নেই। মানুষ ভালো নেই। চারপাশে এক ধরনের অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।

দেশ নানাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন রকম উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে। উন্নয়ন সত্যি হচ্ছে; কিন্তু সরকারের যে বিশাল উন্নয়নযজ্ঞ, তাতে অনেক ফাঁক আছে। সরকার ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে অব্যবস্থাপনা আছে। দুর্নীতি তো আছেই। এসব আমরা এড়াতে চাইলেও সত্যটা অস্বীকার করা যায় না। দেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু নানা ভালো কিছুর মধ্যেও সবচেয়ে বড় পরিসরে যেটা কাঁটার মতো জিইয়ে আছে, সেটা হচ্ছে দুর্নীতি। এই দুর্নীতি সরকারের উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছে।

১৯৭১ সালে বহু সাধনার মাধ্যমে, রক্ত ঝরিয়ে আমরা একটা স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ লাভ করেছি। এটা এখন ভাবলে বেশ অসম্ভব মনে হয়। দল-মত-ব্যক্তি-নির্বিশেষে সবাই ঐকমত্য হয়ে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ স্বাধীন করা সম্ভব হয়েছে। তখন কিন্তু কোনো আলাদা মত ছিল না, দেশ স্বাধীন করতে হবে—এটাই একমাত্র লক্ষ্য ছিল। সে লক্ষ্যে সবাই ঐকমত্য হয়ে লড়াই করেছে। কাজেই সব কিছুর বিনিময়ে আমরা স্বাধীন দেশ লাভ করেছি। এটাকে আমি বলি যে আমাদের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল অর্জন। স্বাধীনতার পর দেশ নানা ধরনের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে গেছে। যে সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো যেত বা বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, সেসব সম্ভাবনা বিকশিত হতে পারলে দেশ আরো এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু সেগুলোর অনেকই বাস্তবায়ন করা যায়নি। এখন নানা ধরনের সমস্যায় দেশ চলছে। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। এখানে শৃঙ্খলা নেই। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে এসব কেন হচ্ছে?

সরকার দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে। দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু সরকারও যে নানাভাবে ব্যর্থ হচ্ছে, সেসব নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ নেই। কথা নেই। এখন যেটা হয়েছে—রাজনীতি চলছে দলমুখী ভাবনা থেকে। জনমুখী রাজনীতি নেই। এখন যে সরকারব্যবস্থা চলছে, তা দলমুখী সরকার। অথচ উচিত ছিল জনমুখী সরকার ব্যবস্থার। সেটা এখানে নেই। মহৎ রাষ্ট্র ও কল্যাণমূলক রাজনীতির অভাব তীব্রভাবে আমরা অনুভব করছি।

শিক্ষাঙ্গনগুলো এখন অস্থির। কোনো শৃঙ্খলা নেই। ক্যাম্পাসে পড়াশোনার পরিবেশ কেমন, সেটা সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা থেকেই উপলব্ধি করা যায়। কিছুদিন আগে আবরার ফাহাদ নামে বুয়েটের এক ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এটা কিভাবে সম্ভব? আমি নিজেও বুয়েটের ছাত্র ছিলাম। আমাদের সময় অবশ্য বুয়েট হয়নি, তখন ওটা ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। তখন ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ছিল। পড়াশোনার সুন্দর পরিবেশ ছিল। কেউ কারো ওপর এভাবে আক্রমণ করত না। কোনো বিষয়ে মতানৈক্য ছিল না, তা তো নয়। তাই বলে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো ব্যাপার ছিল না। ভাবতে অবাক লাগে, ভিন্নমতের কারণে একজন ছাত্রকে তারই সহপাঠীরা পিটিয়ে মেরে ফেলবে? এসব ভাবা যায় না। এখন রাজনীতি নানাভাবে কলুষিত হচ্ছে। এর থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি অবশ্যই থাকবে; কিন্তু সেই রাজনীতি হবে ছাত্রকল্যাণে। ক্যাম্পাসের রাজনীতির আদর্শ যেন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সেভাবে রাজনীতি করতে হবে। মহৎ রাজনীতির দৃষ্টান্ত তারাই উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? এসব দেখে ও শুনে আমাদের গা শিউরে ওঠে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা জরুরিভাবে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে হয়। একসময় আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। এটা তো এমনিতে হয়নি। সেই সময়টা এখন মনে হয়, দূর-অতীত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তখনো রাজনীতি ছিল। কিন্তু সেই ছাত্ররাজনীতিতে শুভ ভাবনার প্রকাশ ছিল। ভিন্নমতের ছেলে-মেয়েরাও নিজেদের মতো করে তাদের মত প্রকাশ করতে পারত। তারা কোনো কোনো বিষয়ে আলাদা হলেও সার্বিকভাবে সবার জন্য যা কিছু ভালো এবং কল্যাণকর, সেসব বিষয়ে কিন্তু একমত ছিল। এখন সেসব ব্যাপার ভাবাই যায় না। তখনকার ছাত্ররাজনীতি শুভবোধে সক্রিয় এবং কল্যাণমুখী ছিল। এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি, সব জায়গায় দলীয় রাজনীতির প্রভাব। ক্যাডারসর্বস্ব রাজনীতি। অনেক নেতার চেয়েও ছাত্ররাজনীতির কোনো কোনো জায়গায় ছাত্ররাই যেন বড় শক্তিমান ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে।

এ অবস্থায় দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির কী হবে—ভেবে পাই না। দেশে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, সেসব উন্নয়নের সুবিধা যে সবাই পাচ্ছে না—এসব সত্যতাও রয়েছে। উন্নয়নের ধারণা ও সুবিধা সীমাবদ্ধ। সার্বিকভাবে উন্নয়নের যে ব্যবস্থা, তাতে জনকল্যাণ কতটুকু আছে, তা ভেবে দেখতে হবে।

এক হিসাবে বলা যায়, দেশে এখন একমুখী রাজনীতি ও একদলীয় শাসন চলছে। এখানে জনসম্পৃক্তি এবং জনকল্যাণে রাজনীতি বা সরকার ব্যবস্থা কতটুকু আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। আবার রাজনীতির চর্চাও এখন বেশ কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। বিএনপি একটা বড় রাজনৈতিক দল। এখন তারা বিরোধী দল। কিন্তু এত বড় একটা দল, বিরোধী দল হিসেবে যে একটা অবস্থান নিয়ে থাকা দরকার ছিল তাদের, সেটা কিন্তু নেই। বিএনপির মধ্যে অনেক ঘাটতি আছে। তাদের দল এখন নেতাশূন্য। রাজনীতি করবে, নেতৃত্ব দেবে, কিন্তু বিদেশে গিয়ে বসে থাকবে—তাহলে তো কাজ হবে না। রাজনীতি করতে হলে মানুষের পাশে থাকতে হবে। দেশের মাটিতে পা থাকতে হবে। মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে রাজনীতি করতে হবে। বিএনপির মধ্যে এখন হতাশা ও উদাসীনতা চেপে বসেছে। তারা তাদের নেত্রীকে এত দিনেও মুক্ত করতে পারল না। দলের মধ্যে রাজনীতিচর্চার অভাব আছে। সাংগঠনিক ঐক্যে ঘাটতি আছে। এসব থেকে বেরিয়ে এসে বিপুলভাবে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষের পাশে থাকতে হবে। এটা তো তারা করতে পারছে না।

রাজনীতি তো ব্যক্তির জন্য নয়, দলের জন্য নয়, রাজনীতি হতে হবে দেশের জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতি হবে। সেই ভাবনা ও আদর্শ থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি।

এখন দেশের জন্য একজন বড় দিকনির্দেশক জরুরি। তেমন কোনো বিশেষ ব্যক্তি তো দেখছি না। দেশ ও জনগণের কল্যাণে এখন উপযুক্ত নেতৃত্ব আসতে হবে। যাঁরা দেশের কল্যাণে কাজ করবেন। দলীয় স্বার্থ এবং দলমুখী রাজনীতি না করে দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত থেকে যাঁরা রাজনীতি করবেন—এমন নেতৃত্ব জরুরি। এখন যে দেশে রাজনীতি নেই, তা নয়। রাজনীতি আছে, উন্নয়ন আছে, কিন্তু সার্বিকভাবে দেশ ও জনকল্যাণের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে না।

আমাদের এই মাটিতে রাজনীতি করে গেছেন মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সেই রাজনীতি তো আর নেই। এখন সময় বদলে গেছে না বলে বলা যায়, দিন উল্টে গেছে। বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমানের মতো মানুষ এখন আর দেখি না। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী থেকে এসে মানুষের কল্যাণে পথে নেমেছিলেন। এখন সেসব মাটির মানুষ আর কোথায় আছে?

এখন দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা দুর্নীতি। দুর্নীতি দেশের সব ভালো অর্জনকে শেষ করে ফেলছে। সমাজের যত অন্যায়, পাপ এবং অনাচার—সবই দুর্নীতির কারণে হচ্ছে। যেকোনো উপায়ে দুর্নীতি দূর করতে হবে। আর দলীয় রাজনীতি ও দলীয় সরকার ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করতে হবে। তবেই দেশ এগিয়ে যাবে, সমাজ ভালো থাকবে এবং মানুষ ভালো থাকবে। দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। জনকল্যাণমুখী রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকলে সেই দেশে ভালো কিছু আশা করা যায় না।

 

লেখক : সাবেক সেনাপ্রধান

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা