kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

শেষ পর্যন্ত ভারতীয় জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী মিলিয়ে দিলেন পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুটি বিরোধী দলকে। মহাত্মা গান্ধীর জন্মের সার্ধশতবর্ষ পালন উপলক্ষে সিপিএমের নেতৃত্বে চারটি বিরোধী দল ১ অক্টোবর কংগ্রেসের সদর দপ্তর বিধান ভবনে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র ও অন্য কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে। এই বৈঠকে স্থির হয়েছে লক্ষ্মীপূজার পর থেকেই জাতি বিভাজনের জন্য সচেষ্ট শত্রুদের চিহ্নিত করে ব্যাপক ও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে পশ্চিমবঙ্গে। বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান সিপিএম নেতা বিমান বসু স্বীকার করে নেন, গত মে মাসে লোকসভা নির্বাচনের সময় কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হওয়ার ফলেই তাদের পরাজয় হয়েছে। এটা তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। উত্তরের সোমেন মিত্র একটু মুচকি হেসে বলেন, ‘বিমানদা সেই ১৯৪২ সালে গান্ধীজির ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় আপনারা ব্রিটিশের পক্ষে গিয়েছিলেন। আর ১৯৯৬ সালে জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দিয়ে আরেকটি ঐতিহাসিক ভুল করেছেন। আরেকটা ভুল করেছেন বিগত নির্বাচনে বামপন্থীরা বাম নেতা ছেড়ে কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।’ বিমানবাবু মাথা নেড়ে স্বীকার করেন, ‘রাজনীতিতে একবার ভুল হয়ে গেলে তা ফেরানো খুব মুশকিল। আমরা আজ শপথ নিচ্ছি আর ভুল করব না। রাজ্যবাসীর কল্যাণের জন্যই আমাদের এই শপথ।’

উভয় দলের নেতাই স্থির করেন তাঁদের আগামী কর্মসূচি হবে কেন্দ্রের গেরুয়া বাহিনীর সরকারের লোকপঞ্জি এবং আমেরিকানদের দালালি করার বিরুদ্ধে জনগণকে অবহিত করা এবং এর বিরুদ্ধে দলগতভাবে সোচ্চার হওয়া, আর রাজ্যে তৃণমূলের আকাশ ছোঁয়া দুর্নীতির মুখোশ খুলে দেওয়া। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁর দলের মন্ত্রী, এমএলএ, এমপি, এমনকি পঞ্চায়েত পর্যায়েও সবাই দুর্নীতগ্রস্ত। এঁরা সাধারণ মানুষের জন্য কাজ না করে দলকে বিত্তশালী করে তুলেছেন।

এখন মুখে মুখে রটে গেছে, দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে গত ৯ বছরে ব্যানার্জি পরিবার ৩২টি প্লট ও বাড়ি কিনেছেন। এই টাকা তাঁরা কোথা থেকে পেলেন, মমতার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ—গত চার বছরে নির্বাচিত কংগ্রেস দলের ১৬ জন এবং বামপন্থী দলের আটজন বিধায়ককে মমতা কোটি কোটি টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছেন। এরই মধ্যে সারদা, নারদা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছেন তৃণমূলের ১৭ জন বিধায়ক ও মন্ত্রী, সিবিআই তাঁদের ডেকে ডেকে জেরা করছে। কেউ কেউ আবার জেলেও গেছেন। সুতরাং জনগণের টাকায় তাঁরা বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন।

তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করে, আসন্ন দুর্গাপূজার ছুটি শেষ হওয়ার পরেই তাঁরা রাস্তায় নামবেন। কলকাতা থেকে ২৩টি জেলার সর্বত্র আন্দোলন করে মমতার অসততার কথা জনগণের সামনে ফাঁস করবেন। বঙ্গেশ্বরী মমতা যে সৎ নন, তা তাঁরা প্রমাণ করবেন এবং সততার মুখোশটি খুলে দেবেন। বিধানসভায় সিপিএম দলের নেতা সুজন চক্রবর্তী অভিযোগ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাঁরা কিভাবে, কী কায়দায় বিধায়ক কেনাবেচা করেছেন। সুজনবাবুর অভিযোগ, বিধায়কদের বিরুদ্ধে প্রথমে ভুয়া মামলা দায়ের করে স্থানীয় থানার দারোগাবাবুকে বিধায়কের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে তাঁকে জেলার এসপির কাছে ধরে নিয়ে আসা হয়। এসপি নিজে গাড়ি চালিয়ে ওই বিধায়ককে সোজা দিয়ে আসেন কালীঘাটে মমতার বাড়িতে। মমতা বিক্রি হওয়া বিধায়কদের বলেন, ‘তোমার নামে এই এই কেস আছে। আমার দলে যোগ দাও, এই নাও টাকা।’ বান্ডিলের পর বান্ডিল টাকা ছুড়ে দেন ওই বিধায়কের দিকে। বিধানসভার স্পিকার এঁদের দলছুট বলে ঘোষণা করছেন না, ভারতের সংবিধানে আছে, কোনো বিধায়ক বা এমপি যদি ভিন্ন দলে যোগ দেন, তবে তাঁকে বিধানসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিতে হবে, সে ক্ষেত্রে তাঁদের সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাবে। দলছুট বিধায়কদের বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান কলকাতার হাইকোর্টে একটি মামলা রুজু করেছেন। সেই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিধায়করা তৃণমূলেই থেকে যাবেন।

এ তো গেল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বেকার সমস্যা পশ্চিমবঙ্গে ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে, তাই যুবকদের ঘুষ দিয়ে তাদের তৃণমূলে রাখার জন্য রাজ্যের প্রায় দুই হাজার ক্লাবের যুবকদের বছরে প্রায় দুই লাখ করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। এবারই প্রথম সরকার ২৫ হাজার পুজো কমিটিকে ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ করে টাকা দিয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—ভোটব্যাংক ধরে রাখা। মমতার বিরুদ্ধে আরো মারাত্মক অভিযোগ হলো, উন্নয়নের নাম করে গোলাবাজির শিল্প চালু করা। তাঁর যে শিক্ষাদীক্ষার কত অভাব তা তিনি বারবার প্রমাণ করছেন। তিনি একবার গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষে বেলেঘাটায় গান্ধী আশ্রমে গিয়ে বলেই ফেললেন, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার দিনে গান্ধীজি ওই আশ্রমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে অনশন করেছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজিকে এক গ্লাস ফলের রস দিয়ে অনশন ভঙ্গ করান।

বঙ্গেশ্বরী জানার চেষ্টাও করেননি যে রবীন্দ্রনাথ মারা যান ১৯৪১ সালে, আর গান্ধীজি অনশন করেন ১৯৪৭ সালে। এসপ্লানেড এলাকায় একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে সাঁওতাল কবি সিধু কানুর নামে। এঁরা বৃহত্তর সাঁওতাল আন্দোলন করেছিলেন। মমতা সেই সভায় দাঁড়িয়ে বলেন, সিধু কানুর নাম তো বললাম, ডহর কোথায়? পাশে দাঁড়ানো তৃণমূলের শিক্ষিত সংসদ সদস্য, যিনি নারদ কাণ্ডের আসামি তিনি বললেন, ডহর নামে কোনো লোক ছিল না, সাঁওতাল ভাষায় রাস্তার নামই ডহর। এই শিক্ষা নিয়েই বঙ্গেশ্বরী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন যে নিজের রাজ্যের ইতিহাসটুকু পর্যন্ত জানেন না।

বাম ও কংগ্রেসের অভিযোগ, বিগত লোকসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে একটি গোপন আঁতাত হয়েছিল। যার জন্য বিজেপি নেতারা আগাম বলেছিলেন, তাঁরা ৪২টির মধ্যে ২২টি আসন পাবেন। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি দুটি আসন পেয়েছিল, আর ২০১৯ সালে তারা ১৮টি আসন পেল। পশ্চিমবঙ্গে এখন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, কূটনীতিবিদ—সবার কাছে এখন এটাই মূল চর্চার বিষয়। বিজেপির হাত ধরেই তাঁর সর্বভারতীয় রাজনীতিতে উত্থান, ইতিহাসবিদরা মনে করেন, কোথাও বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে একটা গোপন আঁতাত রয়েছে। রাজ্য কংগ্রেস ও বাম তাঁর মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য জোরকদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ক্ষমতায় আসার আগে বঙ্গেশ্বরী সিঙ্গুরে টাটাদের মোটর কারখানা তৈরির বিরোধিতার সময় জঙ্গল মহল ও দার্জিলিংয়ে মাওবাদীদের সঙ্গে তাঁর গোপন আঁতাত প্রায় প্রকাশ্যে এসে যায়। সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা হলে কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হতো। গত কয়েক মাস ধরে দেখা যাচ্ছে, সিঙ্গুরবাসী ‘সিঙ্গুরে কারখানা চাই’—এই স্লোগান দিয়ে নবান্নে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, মিডিয়ায় মমতা যে সিঙ্গুরে কারখানা বন্ধ করে দিয়ে বাঙালির সর্বনাশ করেছেন—তা ফলাও করে ছাপা হচ্ছে।

সিঙ্গুরবাসী সাংবাদিকদের দেখলেই বলে, ‘আপনারা লিখুন, আমাদের কারখানা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আমরা কাজ চাই, আমাদের কৃষি জমিতে আর কাজ করা যাচ্ছে না।’ আর সিঙ্গুরে যাতে কারখানা না হয় সে জন্য মমতা সেখানে বেশ কিছুদিন ধরনাও দিয়েছিলেন। এই ধরনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অবাঙালি কিছু লোক এসে মমতাকে সমর্থন জানিয়ে গিয়েছিল। কংগ্রেস বামপন্থীদের আসন্ন যৌথ আন্দোলনে সিঙ্গুরকে প্রাধান্য দিচ্ছে। সেই সময় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন ভারতী ঘোষ। ভারতী ঘোষের নির্দেশেই জঙ্গল মহল এলাকায় কয়েক শ সাঁওতালকে হত্যা করা হয়। সেই সময় মমতার একটি সভায় দাঁড়িয়ে ভারতী ঘোষ বলেছিলেন, মমতা হলেন জঙ্গল মহলের ‘মা’। আর ভারতীর দাপটে সেদিন গোটা জঙ্গল মহলে হত্যার পর হত্যালীলা চলে। সেই ভারতী ঘোষ এখন কোথায়? বিগত নির্বাচনের আগে তিনি পুলিশের চাকরি ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। নির্বাচনে লড়াই করে তিনি হেরে যান। ভারতী এখন বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্বের চোখের মণি।

তাই বাম ও কংগ্রেস জোট গান্ধীজির আদর্শে অহিংসার নীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে গান্ধীজির জন্মের এক দিন আগে। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ এতই তিতিবিরক্ত হয়েছে যে তাদের সঙ্গে কথা বললেই তারা উত্তেজিত হয়ে ওঠে বলে, ‘কালীঘাট আমাদের মিথ্যা বলে ডুবিয়েছে।’

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা