kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

আবরার হত্যাকাণ্ড এবং দেশবাসীর কান্না

মো. নুরুল আনোয়ার

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আবরার হত্যাকাণ্ড এবং দেশবাসীর কান্না

পাঁচ দিন ধরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সোচ্চার, ক্ষুব্ধ এবং উত্তপ্ত! পত্রিকাগুলোও সেই ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় এবং বিক্ষুব্ধ। টিভিগুলোর সংবাদের একটা বড় অংশজুড়ে আছে সেই ঘটনা। টক শোগুলোও ঘটনাটিকেন্দ্রিক। বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও এটি বেশ দৃষ্টিকাড়া সংবাদ। নৃশংস এ ঘটনা দেশবাসীর হৃিপণ্ড দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত করে দিয়েছে এর গতি। বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র, আবরার ফাহাদের জলজ্যান্ত টগবগে যুবক থেকে লাশে পরিণত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই দেশবাসী মেনে নিতে পারছে না। প্রশ্ন জেগেছে, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো শৃঙ্খলা বা নিয়ন্ত্রণ আছে কি না? বিশেষ করে, সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ও যুবসংগঠনগুলো এবং সেই সঙ্গে পরিবহন সেক্টরে।

এরই মধ্যে গণমাধ্যমে ঘটনাটির হেতু বিবরণ, কার্যকারণ এবং আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক তথ্য মানুষ জানতে পেরেছে। মূল আলোচনার আগে আবরারের পরিচিতি এবং ঘটনার বিবরণীর দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার রায়ডাঙ্গা গ্রামের বরকত উল্লাহ ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির স্নেহের সন্তান নিহত আবরার বরাবরই মেধাবী ছাত্র ছিল। মেডিক্যালেও ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল সে। বড় আদর ও যত্নে বড় হয়েছিল কুষ্টিয়া শহরের বাড়িতে। ঢাকায় থাকত শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে। আর নিষ্ঠুর-নৃশংস নির্যাতনে প্রাণ বলি হয় একই হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে। হলটি নিয়ন্ত্রিত হতো বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের কর্তৃত্বে। নিহত আবরারের বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগ সে শিবিরকর্মী। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় স্বাক্ষরকৃত চুক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রতিবাদী স্ট্যাটাস দিয়েছিল। শোনা যায় ঘটনার তিন-চার দিন আগেই তার শাস্তির পরিকল্পনা হয়। কিন্তু হঠাৎ পূজার বন্ধে আবরার কুষ্টিয়া চলে যাওয়ায় সেটি সম্ভব হয়নি। রবিবার সকালে মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কুষ্টিয়া ছেড়ে ঢাকায় এসে মাকে জানায়। আর রাত ৮টায় চারজন ‘আজদাহা’ (চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভয়ংকর আকৃতির মানুষকে বলা হয়) তাকে মৃত্যুকূপে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকে প্রস্তুত এবং পরবর্তীকালে যোগ দেওয়া হায়েনারা পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কী নিদারুণ ভয়ংকর আঘাতের পর আঘাত করেছিল, যাতে একরকমের সুঠামদেহের অধিকারী যুবকও প্রাণ সমর্পণে বাধ্য হয়। আবরার বেঁচে থাকলে হয়তো তার বিবরণী থেকে বিস্তারিত জানা যেত। পরবর্তীকালে এই টর্চার সেলের প্রাপ্ত আলামত থেকে বোঝা যায়, তাকে চড়-থাপ্পড়, লাঠি ও হকি স্টিক—সব কিছু সহযোগেই আঘাত করা হয়। দুটি হকি স্টিক পেটানোর সময় ভেঙে যায়। পিটিয়ে দুটি হকি স্টিক ভাঙা প্রায় অসম্ভব, যাঁরা হকি স্টিক দেখেছেন তাঁরা জানেন। আবরারের পুরো শরীর আঘাতে আঘাতে জর্জরিত ছিল। টর্চার বাড়িয়ে হত্যা দ্রুততর করতে খুনি সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও সহসভাপতি মুহতাসিম ফুহাদের আগমন এবং ভয়ানক আঘাত। সিসি ফুটেজ মোতাবেক হত্যার পর খুনিরা চাদরে পেঁচিয়ে তার লাশ সিঁড়িতে ফেলে রাখে, পরবর্তী সময়ে অন্যত্র অপসারণ করার নিমিত্তে। আবরারের মমতাময়ী মা ছেলের লাশ দেখে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বাবা, ওরা তোমায় কোথায় মেরেছিল।’ এর চেয়ে প্রাণবিদারক কথা কী আর আছে?

বুয়েটের হল কর্তৃপক্ষ এবং উপাচার্যের নাটকীয় আচরণ মানুষকে ব্যথিত করেছে। ছাত্র হলগুলোতে যে এ ধরনের থেরাপি মাঝেমধ্যে দেওয়া হয়, এর জন্য তিনটি হলে সাতটি টর্চার সেল আছে—এটি বুয়েট কর্তৃপক্ষ ভালোভাবেই জানে। ছাত্রলীগের কিছুসংখ্যক দানব এ ধরনের কাজ করে থাকে জেনেও তারা সংঘাত এড়ানোর জন্য দৃষ্টি অন্ধের ভূমিকা নিয়ে নিজের পদ টিকিয়ে রাখে। কেননা তারাও তো একই দরে কেনা, দেনদরবার করে পদগুলো পেয়েছে। আবরারকে আটক করা, প্রচণ্ড মারধর করা—সব খবরই তারা যথাসময়ে পেয়েছিল। তাদের হয়তো ধারণা ছিল, অন্যদের মতো একেও শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দেবে। রাতে যখন চকবাজার থানা থেকে এসআই দেলওয়ার ফোন পেয়ে হলে আসেন তখনো আবরার জীবিত, পুলিশ আসার সংবাদ পেয়ে যদি তারা নিজেরা দেখতে আসত, তাহলে হয়তো আবরার প্রাণে বেঁচে যেত। তারাও বেঁচে যেত। দেশবাসী তথা সরকারও বেঁচে যেত।

এই অত্যাচারে তাদের নীরব সম্মতি ছিল। হত্যাকাণ্ডের পরও বুয়েট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে আসতে অগ্রহণযোগ্য বিলম্ব করে একটা কেলেঙ্কারি করেছে। উপাচার্য ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পর পদধূলি দেন। থাকেন নিজ বাসা লালবাগে। অফিসে আসেন ১২টার পর। দুই বছরে বিদেশে গেছেন ২২ বার। তিনি দক্ষ শিক্ষক, অদক্ষ প্রশাসক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ক্ষোভ এবং বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি কেমন উপাচার্য। একজন ছাত্র মারা গেল আর এতটা সময় ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন। মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে এসব কথা বলেন। বুয়েট কর্তৃপক্ষ অবশেষে সোমবার ৭ অক্টোবর এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, ‘আবরার ফাহাদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে থানায় জিডি করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড বলতে লজ্জা পান মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নাম মুখে না নেওয়ার মতো।’

এবার দেখা যাক পুলিশের ভূমিকা কী ও কেমন ছিল। সেই রাতে পুলিশের আচরণ ছিল মিশ্র। ঘটনার রাতে ফোনে সংবাদ পেয়ে চকবাজার থানা থেকে রাত ১টা ৩০ মিনিটে এসআই দেলওয়ার হলে যান। তাঁকে খুনিদের একজন মেহেদী হাসান রাসেল ঢুকতে না দিয়ে অভ্যর্থনা কক্ষে বসিয়ে রাখে। এক ঘণ্টা বসে থেকে এসআই দেলওয়ার ফিরে আসেন। ফৌজদারি কার্যবিধিতে এ ধরনের ক্ষেত্রে অকুস্থলে প্রবেশের ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া আছে। এ ছাড়া দণ্ডবিধির ৯৭ ধারায়ও ব্যবস্থা নিতে পারতেন, বাধা পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সাহায্য চাইতে পারতেন। এসআই দেলওয়ারের নিষ্ক্রিয়তা সারা দেশকে অস্থির করে তুলেছে। একটি ছেলেকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনুমান করি, দেলওয়ার এ অবস্থা তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। তারা বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়নি। এটি তদন্ত করে দেখা যেতে পারে। তবে মৃতের বাবার দেওয়া এজাহার পুলিশ নিয়েছে। ১৯ জন এজাহার নামীয় আসামির মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অমিত সাহা নামের এক ছাত্রকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ আঘাতজনিত রক্তক্ষরণ উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, ২৩ থেকে ২৫ জন খুনি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল।

ছাত্রলীগের কিছু সদস্য অনিয়ন্ত্রিত, কেন খুনখারাবিতে জড়িত হয়, তার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টজনরা মনে করেন এর আগে সংঘটিত কিছু হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার না হওয়া। যেমন—২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এ এফ রহমান হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্র আবু বক্কর নিহত হন। সেই মামলার ১০ আসামি ২০১৭ সালের ৭ মে খালাস পায়। অজুুহাত, পুলিশের দুর্বল তদন্ত। এটি খোঁড়া যুক্তি। ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের ২২৫ নম্বর কক্ষের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আরিফ রায়হান দ্বীপ নিহত হন। সে মামলার কোনো ফলাফলও নেই। বহুল আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় সব সাজাপ্রাপ্ত আসামির খালাস ছাত্রলীগকে বেপরোয়া করে তোলে। ছাত্রলীগ প্রয়োজনে নিজ কর্মীদের হত্যা করতে কুণ্ঠিত হয় না। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের নিজ কোন্দলে ৩৯ জন নিহত হয়। অন্য সংগঠনের ১৫ জন নিহত হয় ওই সময়ে। ওই সব হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার হলে ছাত্রলীগ হত্যা থেকে বিরত হতো।

ছাত্রলীগের কিছুসংখ্যক নেতা ও সদস্যের তস্করবৃত্তির কারণে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে, ছাত্রলীগ ভেঙে দেওয়া হোক এবং ছাত্ররাজনীতি দেশে নিষিদ্ধ করা হোক। কেননা এখনকার দলীয় ছাত্রনেতারা লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়ে বরং লুটপাট এবং তস্করবৃত্তিতে জড়িয়ে গেছে। কোনোভাবেই কারো নিয়ন্ত্রণেই থাকছে না।

আবরার হত্যাকাণ্ড মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিচলিত এবং ব্যথিত করেছে। একজন মা হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। শাস্তি পেতেই হবে। সবার সর্বোচ্চ শাস্তির নির্দেশ দিয়েছি।’ ছাত্রলীগ, যুবলীগ কয়েক বছর ধরে টেন্ডার, চাঁদাবাজি, দখল, মাদক, জুয়া, মদ, দুর্নীতি, ক্যাসিনো এবং নারী ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েছে। এসব বন্ধের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের ওপরের দুজনকে উচ্ছেদ করেছেন সম্প্রতি। যুবলীগের উঁচু দরের নেতাদের কী অবস্থা হয়েছে, এই খুনিরা তা দেখে ও জানা সত্ত্বেও সংযত হয়নি, বরং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে মনে হয়।

হত্যার কথিত কারণের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলা যায়, এবারকার ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার চুক্তির ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সারা দেশে সর্বমহলে হচ্ছে। এটি সরকারের জন্য ভালো এ জন্য যে জনমতের কথা বলে সরকার চুক্তির বাইরে দৃশ্যমান কিছু দেওয়ার জন্য ভারতকে বলতে পারবে, যেটি মানুষকে স্বস্তি দেবে। মতপার্থক্যের ভিন্নতার জন্য হত্যা করা হলে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষকে হত্যা করার দরকার হবে।

হত্যার ক্ষতিকর দিকগুলোর দিকে নজর দিতে পারি আমরা—১. সরকারের উন্নয়নের ইমেজকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২. দেশের দলনিরপেক্ষ মানুষকে সরকারের বিপরীতে নিয়ে গেছে। ৩. সারা দেশে একটা অস্থিরতা, অজানা আতঙ্ক ও গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। ৪. সব  বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত করেছে। ৫. বুয়েটের ছাত্রদের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। ৬. আবরারের পরিবার-পরিজন, নিকটজন সারা জীবন ছাত্রলীগকে অভিশাপ দেবে। ৭. খুনি এবং তাদের পরিবারও স্থায়ীভাবে ধিক্কৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মনের ভেতর থেকে আসা প্রাণান্তকর বেদনাবোধ নিয়ে সমাপ্তি টানছি।

লেখক : সাবেক আইজিপি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা